
সৈকত ভৌমিক

কিশোর গ্যাং শব্দটা দেশের প্রায় সব স্থানেই খুব শোনা যায়, তাই না? কিন্তু কখনো কি ভেবে দেখেছেন, এই নামটার ওপর সব দায় চাপিয়ে দিয়ে আমরা মা-বাবারা নিজেদের কোনো বড় ভুল আড়াল করে ফেলছি না তো? অজান্তেই আমরা নিজেদের বাচ্চাদের বিপথে ঠেলে দিচ্ছি না তো?
কেন বলছি এ কথা? কারণ, বাস্তবতা হচ্ছে— নাগরিক জীবনে সবাই ব্যস্ত। পরিবারের জন্য, সন্তানের ভবিষ্যতের জন্য সবাই ছুটে বেড়াচ্ছে। আর এই ছুটে বেড়ানোর পেছনে হারিয়ে যাচ্ছে সময়।
সন্তানের ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করা জরুরি। কিন্তু সেই ভবিষ্যত নিশ্চিত করায় ব্যস্ত থাকার অজুহাতে সময়ের অভাবে যদি সন্তানকেই বিপথে ঠেলে দেওয়া হয়, তবে সে দায় কি এড়ানো যায়?
সন্তানদের নিয়ে এই যে এ চিন্তা, এ ক্ষেত্রে প্রকৃত অর্থে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টিই বেশির ভাগ সময় আলোচনার বা— শিশু-কিশোরদের মনস্তত্ব। হ্যাঁ, সমাজবিজ্ঞান থেকে শুরু করে অপরাধবিজ্ঞান পর্যন্ত সব শাস্ত্রই কিন্তু বলছে, সন্তান লালন-পালনে শিশু-কিশোরদের মনস্তত্ব বোঝাটাই সবচেয়ে বেশি জরুরি।
মনোবিজ্ঞানের ভাষায়, প্রতিটি শিশুর সুস্থ মানসিক বিকাশের প্রথম শর্ত একটি নিরাপদ আশ্রয় বা সিকিউর বেইজ। শিশুর বেড়ে ওঠার প্রতিটি পর্যায়েই তার জন্য এমন নিরাপদ একটি আশ্রয় প্রয়োজন। এই প্রয়োজনটা আরও বেশি হয়ে দাঁড়ায় যখন সেই শিশুটি শৈশব শেষ করে কৈশোরে পা দিতে চলেছে, অর্থাৎ বয়ঃসন্ধির সময়টা, ঠিক যে সময়টিতে তার শরীর আর মন রীতিমতো একটি ঝড়ের মধ্য দিয়ে অতিক্রান্ত হয়।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘ছুটি’ গল্পটি অন্তত আমাদের বয়সীদের মোটামুটি সবারই পড়া, যেহেতু এটি আমাদের পাঠ্যবইয়েই ছিল। মনে আছে কারও?
রবি ঠাকুর লিখেছিলেন, ‘... তেরো-চৌদ্দ বছরের ছেলের মতো এমন বালাই আর নাই। রূপেও না, গুণে ও না। স্নেহও পাওয়া যায় না, পাত্তাও পাওয়া যায় না; কথাবার্তাও সর্বদা কেমন একরকম জবুথবু হইয়া আসে। ... এই বয়সে তাহার নিজের মনে একটা বিশ্বগ্রাসী প্রেমের আকাঙ্ক্ষা জন্মিতে থাকে, কিন্তু তাহার বিনিময়ে লাঞ্ছনা ব্যতীত আর কিছুই পাওয়া যায় না, তাহা সে ভালো করিয়াই বোঝে। আর এই স্নেহের কাঙালপনাটাই তাহার পক্ষে সবচেয়ে বড়ো লজ্জার বিষয় হইয়া দাঁড়ায়।’
এই ‘স্নেহের কাঙালপনা’টা বুঝতে পারাটাই আসলে খুব জরুরি। কারণএই সময় তাদের সবচেয়ে বেশি যেটা দরকার হয়, সেটা হলো নিজের অস্তিত্বের স্বীকৃতি, যাকে মনোবিজ্ঞানের ভাষায় বলে ভ্যালিডেশন বা সেন্স অব বিলঙ্গিং।
শব্দগুলো একটু খটমটে লাগছে? আচ্ছা, আরেকটু সহজ করে বলি।
ধরুন, আপনি অফিসে দিনরাত এক করে খাটছেন, কিন্তু বস কোনো পাত্তা দিচ্ছে না। আবার নিজের করা কাজের কোনো ক্রেডিটও পাচ্ছেন না। আপনার ভেতরে তখন যে ফ্রাস্ট্রেশনটা কাজ করবে, ঠিক একই জিনিস ঘটে একটি শিশু বা কিশোরের মনোজগতেও।
বাস্তবতা বলছে, জীবনের দৌড়ঝাঁপের চক্করে আমাদের অনেকেই দিনের পর দিন সন্তানকে ‘কোয়ালিটি টাইম’ দিতে পারি না। অনেক সময় সন্তান কিছু বলার চেষ্টা করলেও সেদিকে শতভাগ মনোযোগ দিতে পারি না। আর এটাই ওদের অবচেতন মনে তৈরি করে এক ভয়ংকর শূন্যতা। এক ধরনের ‘অ্যাটাচমেন্ট ইস্যু’ গ্রাস করে ফেলে। ওরা ভাবতে শুরু করে, পরিবারে হয়তো আমার কোনো দামই নেই, আমার কথা শোনার মতো কেউ নেই।
এই যে সেন্স অব বিলঙ্গিংয়ের শূন্যতা, সেই শূন্যতা তখন সে পূরণের জায়গা খুঁজতে শুরু করে। তখন তারা মনোযোগটা অন্য জায়গা থেকে পাওয়ার চেষ্টা করে। এটা না সেটা টাইপ বায়না ধরে। কিন্তু আসলে তাদের মূল চাওয়া থাকে একটাই— কেউ অন্তত একটু সময় দিক, তাদের কথাগুলো মন দিয়ে শুনুক।
সন্তানের মনোজগতে যখন এমন ওলট-পালট অবস্থা, তখন মা-বাবাদের অনেকের রেসপন্সই কিন্তু প্রয়োজনের ঠিক বিপরীত। ব্যস্ততার দোহাই দিয়ে কেউ হয়তো সন্তানের হাতে দামি একটা ফোন ধরিয়ে দিচ্ছে, কেউ আবার অঢেল পকেট মানি দিয়ে দিচ্ছে। সেই সময় বাচ্চার মুখের হাসি দেখে হয়তো তারা ভেবে বসেন, বাচ্চা তো মহাখুশি। দায়িত্ব পালনের সন্তুষ্টিও হয়তো ভর করে।
কিন্তু প্রকৃতপক্ষে মোবাইল ফোন, ট্যাব, ল্যাপটপ বা টাকা কি সন্তানের সেই সঙ্গী, যা তার বয়ঃসন্ধির সময়টায় সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন? হ্যাঁ, মোবাইল ফোন বা ট্যাব কিংবা ল্যাপটপ হয়তো সন্তানকে উচ্ছ্বসিতও করে। কিন্তু বয়ঃসন্ধিতে থাকা এক কিশোরের যে মানসিক সঙ্গের আকাঙ্ক্ষা, সেটি কি যন্ত্র পূরণ করতে পারে?
আর সে কারণেই একটা সময় পর্যন্ত যন্ত্রে ডুব দিয়ে সবকিছু ভুলে থাকলেও কোনো একসময় ঠিকই সেই কিশোর বা কিশোরীকে গ্রাস করে সেই শূন্যতা, যার উৎপত্তি শারীরিক ও মানসিক সহচর্যের আকাঙ্ক্ষা থেকে। সেই সময় তার মধ্যে ভাবনার উদয় হয়, মা-বাবার কাছে আমার জন্য টাকা-পয়সা ছাড়া আর কিছুই বরাদ্দ নেই। আবার তাকে পেয়ে বসে একাকিত্ব বা বিচ্ছিন্নতার ভাবনা।
যাদের সন্তানদের ডিভাইস বা আর্থিক সচ্ছলতা দিয়ে ‘ভুলিয়ে রাখা’র চেষ্টা করার সামর্থ্য নেই, তাদের চিত্র কিছুটা ভিন্ন হলেও হতাশাটা একই রকম। আবার অনেক মা-বাবাকে হয়তো বাস্তবতার কারণেই ন্যূনতম উপার্জনের জন্য এমন কষ্ট করতে হয় যে তাদের পক্ষেও সন্তানকে সেই সময়টুকু দেওয়া হয় না। পরিস্থিতি যাই হোক, সন্তানদের মনস্তত্বে প্রভাবটা কিন্তু একই রকম থেকে যায়।
পরিবারের সঙ্গে এই বিচ্ছিন্নতার বোধ আর একাকিত্ব থেকে বাঁচতেই শিশু-কিশোররা বাইরের দুনিয়ায় আশ্রয় খোঁজে। এমন কোনো জায়গা, যেখানে তারা নিজেদের ‘স্পেশাল’ বা ‘গুরুত্বপূর্ণ’ অন্তত ভাবতে পারে, যেখানে তারা অন্তত অন্যের মনোযোগটা পায়। আর ঠিক এই দুর্বলতার সুযোগটাই নেয় রাস্তার মোড়ে আড্ডা দেওয়া ওই সমবয়সী বা একটু বেশি বয়সীদের দল, যাদের আমরা বলি ‘কিশোর গ্যাং’।
বিভিন্ন সময় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে আটক কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যদের ভাষ্য এসেছে পত্রপত্রিকায়। সেগুলো থেকে দেখা যায়, কখনো মোবাইল গেম দিয়ে শুরু হয় বয়ঃসন্ধিতে মনোযোগ পাওয়া কিশোরদের সঙ্গে সখ্য গড়ে তোলা, কখনো স্নেহ করার ছলে।
এরপর?
এই গ্যাং কালচার আসলে ঘরে উপেক্ষিত সন্দানদের মেকি দুনিয়ার ‘হিরো’ ভাবতে শেখায়। যে কিশোর নিজের ঘরে ‘পাত্তা পাচ্ছে না’ বলে হতাশায় ভুগতে শুরু করেছিল তাকেই যখন গ্যাংয়ের সদস্যরা ‘বড় ভাই’ বা ‘বস’ বা ‘ইউ আর দ্য বেস্ট’ টাইপ কিছু বলে সমীহ করে, তখন তার অপরিপক্ব মন একে জীবনের সবচেয়ে বড় অর্জন না ভাবার কোনো কারণই দেখে না।
মনোবিজ্ঞানও তাদের এমন আচরণকে খুব অস্বাভাবিক বলছে না। কারণ এই বয়সে মস্তিষ্কের ডোপামিন কাজ করে রকেটের গতিতে। সমবয়সী বা বড় ভাইদের এই স্বীকৃতি তাদের কাছে দুনিয়ার অন্য সবকিছুর চেয়ে বেশি আকর্ষণীয় মনে হয়। এভাবেই টুকটাক করে অপরাধ জগতে জড়িয়ে পড়াও শুরু হয়। আর একটা সময় সেগুলো অপরাধ না মনে হয়ে নিজেকে প্রমাণের হাতিয়ার হয়ে দাঁড়ায়।
মনে হতে পারে কথাগুলো একটু বেশিই তাত্ত্বিক হয়ে যাচ্ছে। আসলে কিন্তু তা না। এসব নিয়ে অনেক দেশেই বিভিন্ন সময়ে বহু গবেষণা হয়েছে। আর সেসব গবেষণাতেও উঠে এসেছে এসব কথা।
‘জার্নাল অব অ্যাবনরমাল চাইল্ড সাইকোলজি’তে ‘দ্য রিলেশনশিপ বিটুইন প্যারেন্টিং অ্যান্ড ডেলিকুয়েন্সি’ শিরোনামের একটা গবেষণা আছে। নেদারল্যান্ডসের আমস্টারডাম বিশ্ববিদ্যালয় আর ক্রাইম অ্যান্ড ল এনফোর্সমেন্ট ইনস্টিটিউটের গবেষক মাখটেল্ড হোভে ও তার দল সারা বিশ্বের ১৬১টি ভিন্ন ভিন্ন রিসার্চের ডেটা নিয়ে কাজ করেছিলেন সে গবেষণায়।
মাখটেল্ড ও তার দলের গবেষণার ফলাফল ছিল একেবারে সুস্পষ্ট। গবেষণা প্রতিবেদন অনুযায়ী, কিশোর অপরাধের পেছনে সবচেয়ে বড় প্রভাবক হলো ‘প্যারেন্টাল মনিটরিং’য়ের অভাব, সেই সঙ্গে মা-বাবার উদাসীনতা।
গবেষণায় খুব পরিষ্কারভাবে বলা হয়েছে, পরিবার যখন সন্তানকে প্রয়োজনীয় পরিমাণে আবেগীয় সমর্থন (ইমোশনাল সাপোর্ট) দিতে ব্যর্থ হয়, তখনই একটি কিশোর সমবয়সী বিপথগামীদের দিকে তীব্রভাবে ঝুঁকে পড়ে। অর্থাৎ হিসাব খুবই সহজ— পরিবার যে সময়টুকু দেয় না, রাস্তার গ্যাং এসে ঠিক সেই শূন্যস্থানটাই পূরণ করে দেয়।
আমাদের মধ্যে অনেকের আবার একটা অদ্ভুত ধারণা আছে। আমরা ভাবি, আরে, আমার বাচ্চা তো আমার চোখের সামনে নিজের ঘরেই বসে আছে, ও আবার গ্যাংয়ে জড়াবে কীভাবে?
সত্যি বলতে, গ্যাং কালচার এখন আর শুধু রাস্তার মোড়ে আটকে নেই। এটা এখন ঢুকে গেছে স্মার্টফোনের স্ক্রিনে, গেমিং কমিউনিটিতে বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের মেসেঞ্জারের সিক্রেট চ্যাট গ্রুপে। ফলে আপনার সন্তান হয়তো আপনার সামনে শারীরিকভাবে উপস্থিত, কিন্তু একই সময়ে সে হয়তো মানসিকভাবে যুক্ত আপনার থেকে যোজন যোজন দূরে থাকা কোনো বিপথগামী চক্রের সঙ্গে।
ফলে এই ডিভাইসের যুগে সন্তানের শারীরিক উপস্থিতিই তাই যথেষ্ট নয়, সন্তানকে পাশে বসিয়ে রাখাটাই যথেষ্ট নয় তাকে ‘কোয়ালিটি টাইম’ দেওয়ার জন্য; বরং প্রয়োজন সন্তান যখন পাশে বসে রয়েছে তখন তার সঙ্গে মানসিকভাবে যুক্ত হতে পারছেন কি না। সন্তান যাই বলুক না কেন, ‘জাজ’ না করে তার কথা মন দিয়ে শোনাটাই গুরুত্বপূর্ণ। অর্থাৎ সন্তানকে বোঝাতে সক্ষম হওয়া যে সে আপনার পূর্ণ মনোযোগ পাচ্ছে— এটিই প্রকৃত অর্থে কোয়ালিটি টাইম।
মা-বাবারা সন্তানের মঙ্গলের জন্য গাধার খাটুনি খাটছি। নিজেদের আরাম-আয়েশ বিসর্জন দিয়ে তাদের জন্য সম্পদ জমাচ্ছি। আমাদের মা-বাবারাও তাই করেছেন। কিন্তু পার্থক্য হলো— তখন আমরা যারা শিশু-কিশোর ছিলাম, আমাদের জন্য পৃথিবীটা এত উন্মুক্ত ছিল না। এখনকার প্রজন্মের মতো আমাদের সামনে বলার সুযোগ ছিল না— হাতের মুঠোয় পৃথিবী।
আর তাই বাস্তবতা হলো— একটা দামি ফ্ল্যাট বা লেটেস্ট গ্যাজেটের চেয়ে মা-বাবার সঙ্গে কাটানো সন্তানের একটি নির্ভেজাল বিকেল বা সন্ধ্যা অনেক বেশি দামি। সন্তানের জন্য পুরো পৃথিবী জেতার আগে প্রতিদিন একটু সময় বের করে তার নিজস্ব পৃথিবীটা বোঝার চেষ্টা করা জরুরি।
সন্তানের যে ভবিষ্যতের ভাবনা থেকে আজ অভিভাবকরা সময়টাকে বিসর্জন দিচ্ছেন, নিজেদের সুখ-শান্তিকেও পরোয়া করছেন না, তারা একটু থামুন। একটু ভাবুন— সহায়-সম্পদ না হয় করলাম, কিন্তু আমার-আপনার মনোযোগের অভাবে আমাদের সন্তানরাই যদি অন্ধকারে হারিয়ে যেতে থাকে, তাহলে সারা জীবনের হাড়ভাঙা খাটুনি আর সহায়-সম্পদ দিয়ে গড়া ওই ভবিষ্যতের কি বিন্দুমাত্র দাম থাকবে?
লেখক: সাংবাদিক

কিশোর গ্যাং শব্দটা দেশের প্রায় সব স্থানেই খুব শোনা যায়, তাই না? কিন্তু কখনো কি ভেবে দেখেছেন, এই নামটার ওপর সব দায় চাপিয়ে দিয়ে আমরা মা-বাবারা নিজেদের কোনো বড় ভুল আড়াল করে ফেলছি না তো? অজান্তেই আমরা নিজেদের বাচ্চাদের বিপথে ঠেলে দিচ্ছি না তো?
কেন বলছি এ কথা? কারণ, বাস্তবতা হচ্ছে— নাগরিক জীবনে সবাই ব্যস্ত। পরিবারের জন্য, সন্তানের ভবিষ্যতের জন্য সবাই ছুটে বেড়াচ্ছে। আর এই ছুটে বেড়ানোর পেছনে হারিয়ে যাচ্ছে সময়।
সন্তানের ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করা জরুরি। কিন্তু সেই ভবিষ্যত নিশ্চিত করায় ব্যস্ত থাকার অজুহাতে সময়ের অভাবে যদি সন্তানকেই বিপথে ঠেলে দেওয়া হয়, তবে সে দায় কি এড়ানো যায়?
সন্তানদের নিয়ে এই যে এ চিন্তা, এ ক্ষেত্রে প্রকৃত অর্থে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টিই বেশির ভাগ সময় আলোচনার বা— শিশু-কিশোরদের মনস্তত্ব। হ্যাঁ, সমাজবিজ্ঞান থেকে শুরু করে অপরাধবিজ্ঞান পর্যন্ত সব শাস্ত্রই কিন্তু বলছে, সন্তান লালন-পালনে শিশু-কিশোরদের মনস্তত্ব বোঝাটাই সবচেয়ে বেশি জরুরি।
মনোবিজ্ঞানের ভাষায়, প্রতিটি শিশুর সুস্থ মানসিক বিকাশের প্রথম শর্ত একটি নিরাপদ আশ্রয় বা সিকিউর বেইজ। শিশুর বেড়ে ওঠার প্রতিটি পর্যায়েই তার জন্য এমন নিরাপদ একটি আশ্রয় প্রয়োজন। এই প্রয়োজনটা আরও বেশি হয়ে দাঁড়ায় যখন সেই শিশুটি শৈশব শেষ করে কৈশোরে পা দিতে চলেছে, অর্থাৎ বয়ঃসন্ধির সময়টা, ঠিক যে সময়টিতে তার শরীর আর মন রীতিমতো একটি ঝড়ের মধ্য দিয়ে অতিক্রান্ত হয়।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘ছুটি’ গল্পটি অন্তত আমাদের বয়সীদের মোটামুটি সবারই পড়া, যেহেতু এটি আমাদের পাঠ্যবইয়েই ছিল। মনে আছে কারও?
রবি ঠাকুর লিখেছিলেন, ‘... তেরো-চৌদ্দ বছরের ছেলের মতো এমন বালাই আর নাই। রূপেও না, গুণে ও না। স্নেহও পাওয়া যায় না, পাত্তাও পাওয়া যায় না; কথাবার্তাও সর্বদা কেমন একরকম জবুথবু হইয়া আসে। ... এই বয়সে তাহার নিজের মনে একটা বিশ্বগ্রাসী প্রেমের আকাঙ্ক্ষা জন্মিতে থাকে, কিন্তু তাহার বিনিময়ে লাঞ্ছনা ব্যতীত আর কিছুই পাওয়া যায় না, তাহা সে ভালো করিয়াই বোঝে। আর এই স্নেহের কাঙালপনাটাই তাহার পক্ষে সবচেয়ে বড়ো লজ্জার বিষয় হইয়া দাঁড়ায়।’
এই ‘স্নেহের কাঙালপনা’টা বুঝতে পারাটাই আসলে খুব জরুরি। কারণএই সময় তাদের সবচেয়ে বেশি যেটা দরকার হয়, সেটা হলো নিজের অস্তিত্বের স্বীকৃতি, যাকে মনোবিজ্ঞানের ভাষায় বলে ভ্যালিডেশন বা সেন্স অব বিলঙ্গিং।
শব্দগুলো একটু খটমটে লাগছে? আচ্ছা, আরেকটু সহজ করে বলি।
ধরুন, আপনি অফিসে দিনরাত এক করে খাটছেন, কিন্তু বস কোনো পাত্তা দিচ্ছে না। আবার নিজের করা কাজের কোনো ক্রেডিটও পাচ্ছেন না। আপনার ভেতরে তখন যে ফ্রাস্ট্রেশনটা কাজ করবে, ঠিক একই জিনিস ঘটে একটি শিশু বা কিশোরের মনোজগতেও।
বাস্তবতা বলছে, জীবনের দৌড়ঝাঁপের চক্করে আমাদের অনেকেই দিনের পর দিন সন্তানকে ‘কোয়ালিটি টাইম’ দিতে পারি না। অনেক সময় সন্তান কিছু বলার চেষ্টা করলেও সেদিকে শতভাগ মনোযোগ দিতে পারি না। আর এটাই ওদের অবচেতন মনে তৈরি করে এক ভয়ংকর শূন্যতা। এক ধরনের ‘অ্যাটাচমেন্ট ইস্যু’ গ্রাস করে ফেলে। ওরা ভাবতে শুরু করে, পরিবারে হয়তো আমার কোনো দামই নেই, আমার কথা শোনার মতো কেউ নেই।
এই যে সেন্স অব বিলঙ্গিংয়ের শূন্যতা, সেই শূন্যতা তখন সে পূরণের জায়গা খুঁজতে শুরু করে। তখন তারা মনোযোগটা অন্য জায়গা থেকে পাওয়ার চেষ্টা করে। এটা না সেটা টাইপ বায়না ধরে। কিন্তু আসলে তাদের মূল চাওয়া থাকে একটাই— কেউ অন্তত একটু সময় দিক, তাদের কথাগুলো মন দিয়ে শুনুক।
সন্তানের মনোজগতে যখন এমন ওলট-পালট অবস্থা, তখন মা-বাবাদের অনেকের রেসপন্সই কিন্তু প্রয়োজনের ঠিক বিপরীত। ব্যস্ততার দোহাই দিয়ে কেউ হয়তো সন্তানের হাতে দামি একটা ফোন ধরিয়ে দিচ্ছে, কেউ আবার অঢেল পকেট মানি দিয়ে দিচ্ছে। সেই সময় বাচ্চার মুখের হাসি দেখে হয়তো তারা ভেবে বসেন, বাচ্চা তো মহাখুশি। দায়িত্ব পালনের সন্তুষ্টিও হয়তো ভর করে।
কিন্তু প্রকৃতপক্ষে মোবাইল ফোন, ট্যাব, ল্যাপটপ বা টাকা কি সন্তানের সেই সঙ্গী, যা তার বয়ঃসন্ধির সময়টায় সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন? হ্যাঁ, মোবাইল ফোন বা ট্যাব কিংবা ল্যাপটপ হয়তো সন্তানকে উচ্ছ্বসিতও করে। কিন্তু বয়ঃসন্ধিতে থাকা এক কিশোরের যে মানসিক সঙ্গের আকাঙ্ক্ষা, সেটি কি যন্ত্র পূরণ করতে পারে?
আর সে কারণেই একটা সময় পর্যন্ত যন্ত্রে ডুব দিয়ে সবকিছু ভুলে থাকলেও কোনো একসময় ঠিকই সেই কিশোর বা কিশোরীকে গ্রাস করে সেই শূন্যতা, যার উৎপত্তি শারীরিক ও মানসিক সহচর্যের আকাঙ্ক্ষা থেকে। সেই সময় তার মধ্যে ভাবনার উদয় হয়, মা-বাবার কাছে আমার জন্য টাকা-পয়সা ছাড়া আর কিছুই বরাদ্দ নেই। আবার তাকে পেয়ে বসে একাকিত্ব বা বিচ্ছিন্নতার ভাবনা।
যাদের সন্তানদের ডিভাইস বা আর্থিক সচ্ছলতা দিয়ে ‘ভুলিয়ে রাখা’র চেষ্টা করার সামর্থ্য নেই, তাদের চিত্র কিছুটা ভিন্ন হলেও হতাশাটা একই রকম। আবার অনেক মা-বাবাকে হয়তো বাস্তবতার কারণেই ন্যূনতম উপার্জনের জন্য এমন কষ্ট করতে হয় যে তাদের পক্ষেও সন্তানকে সেই সময়টুকু দেওয়া হয় না। পরিস্থিতি যাই হোক, সন্তানদের মনস্তত্বে প্রভাবটা কিন্তু একই রকম থেকে যায়।
পরিবারের সঙ্গে এই বিচ্ছিন্নতার বোধ আর একাকিত্ব থেকে বাঁচতেই শিশু-কিশোররা বাইরের দুনিয়ায় আশ্রয় খোঁজে। এমন কোনো জায়গা, যেখানে তারা নিজেদের ‘স্পেশাল’ বা ‘গুরুত্বপূর্ণ’ অন্তত ভাবতে পারে, যেখানে তারা অন্তত অন্যের মনোযোগটা পায়। আর ঠিক এই দুর্বলতার সুযোগটাই নেয় রাস্তার মোড়ে আড্ডা দেওয়া ওই সমবয়সী বা একটু বেশি বয়সীদের দল, যাদের আমরা বলি ‘কিশোর গ্যাং’।
বিভিন্ন সময় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে আটক কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যদের ভাষ্য এসেছে পত্রপত্রিকায়। সেগুলো থেকে দেখা যায়, কখনো মোবাইল গেম দিয়ে শুরু হয় বয়ঃসন্ধিতে মনোযোগ পাওয়া কিশোরদের সঙ্গে সখ্য গড়ে তোলা, কখনো স্নেহ করার ছলে।
এরপর?
এই গ্যাং কালচার আসলে ঘরে উপেক্ষিত সন্দানদের মেকি দুনিয়ার ‘হিরো’ ভাবতে শেখায়। যে কিশোর নিজের ঘরে ‘পাত্তা পাচ্ছে না’ বলে হতাশায় ভুগতে শুরু করেছিল তাকেই যখন গ্যাংয়ের সদস্যরা ‘বড় ভাই’ বা ‘বস’ বা ‘ইউ আর দ্য বেস্ট’ টাইপ কিছু বলে সমীহ করে, তখন তার অপরিপক্ব মন একে জীবনের সবচেয়ে বড় অর্জন না ভাবার কোনো কারণই দেখে না।
মনোবিজ্ঞানও তাদের এমন আচরণকে খুব অস্বাভাবিক বলছে না। কারণ এই বয়সে মস্তিষ্কের ডোপামিন কাজ করে রকেটের গতিতে। সমবয়সী বা বড় ভাইদের এই স্বীকৃতি তাদের কাছে দুনিয়ার অন্য সবকিছুর চেয়ে বেশি আকর্ষণীয় মনে হয়। এভাবেই টুকটাক করে অপরাধ জগতে জড়িয়ে পড়াও শুরু হয়। আর একটা সময় সেগুলো অপরাধ না মনে হয়ে নিজেকে প্রমাণের হাতিয়ার হয়ে দাঁড়ায়।
মনে হতে পারে কথাগুলো একটু বেশিই তাত্ত্বিক হয়ে যাচ্ছে। আসলে কিন্তু তা না। এসব নিয়ে অনেক দেশেই বিভিন্ন সময়ে বহু গবেষণা হয়েছে। আর সেসব গবেষণাতেও উঠে এসেছে এসব কথা।
‘জার্নাল অব অ্যাবনরমাল চাইল্ড সাইকোলজি’তে ‘দ্য রিলেশনশিপ বিটুইন প্যারেন্টিং অ্যান্ড ডেলিকুয়েন্সি’ শিরোনামের একটা গবেষণা আছে। নেদারল্যান্ডসের আমস্টারডাম বিশ্ববিদ্যালয় আর ক্রাইম অ্যান্ড ল এনফোর্সমেন্ট ইনস্টিটিউটের গবেষক মাখটেল্ড হোভে ও তার দল সারা বিশ্বের ১৬১টি ভিন্ন ভিন্ন রিসার্চের ডেটা নিয়ে কাজ করেছিলেন সে গবেষণায়।
মাখটেল্ড ও তার দলের গবেষণার ফলাফল ছিল একেবারে সুস্পষ্ট। গবেষণা প্রতিবেদন অনুযায়ী, কিশোর অপরাধের পেছনে সবচেয়ে বড় প্রভাবক হলো ‘প্যারেন্টাল মনিটরিং’য়ের অভাব, সেই সঙ্গে মা-বাবার উদাসীনতা।
গবেষণায় খুব পরিষ্কারভাবে বলা হয়েছে, পরিবার যখন সন্তানকে প্রয়োজনীয় পরিমাণে আবেগীয় সমর্থন (ইমোশনাল সাপোর্ট) দিতে ব্যর্থ হয়, তখনই একটি কিশোর সমবয়সী বিপথগামীদের দিকে তীব্রভাবে ঝুঁকে পড়ে। অর্থাৎ হিসাব খুবই সহজ— পরিবার যে সময়টুকু দেয় না, রাস্তার গ্যাং এসে ঠিক সেই শূন্যস্থানটাই পূরণ করে দেয়।
আমাদের মধ্যে অনেকের আবার একটা অদ্ভুত ধারণা আছে। আমরা ভাবি, আরে, আমার বাচ্চা তো আমার চোখের সামনে নিজের ঘরেই বসে আছে, ও আবার গ্যাংয়ে জড়াবে কীভাবে?
সত্যি বলতে, গ্যাং কালচার এখন আর শুধু রাস্তার মোড়ে আটকে নেই। এটা এখন ঢুকে গেছে স্মার্টফোনের স্ক্রিনে, গেমিং কমিউনিটিতে বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের মেসেঞ্জারের সিক্রেট চ্যাট গ্রুপে। ফলে আপনার সন্তান হয়তো আপনার সামনে শারীরিকভাবে উপস্থিত, কিন্তু একই সময়ে সে হয়তো মানসিকভাবে যুক্ত আপনার থেকে যোজন যোজন দূরে থাকা কোনো বিপথগামী চক্রের সঙ্গে।
ফলে এই ডিভাইসের যুগে সন্তানের শারীরিক উপস্থিতিই তাই যথেষ্ট নয়, সন্তানকে পাশে বসিয়ে রাখাটাই যথেষ্ট নয় তাকে ‘কোয়ালিটি টাইম’ দেওয়ার জন্য; বরং প্রয়োজন সন্তান যখন পাশে বসে রয়েছে তখন তার সঙ্গে মানসিকভাবে যুক্ত হতে পারছেন কি না। সন্তান যাই বলুক না কেন, ‘জাজ’ না করে তার কথা মন দিয়ে শোনাটাই গুরুত্বপূর্ণ। অর্থাৎ সন্তানকে বোঝাতে সক্ষম হওয়া যে সে আপনার পূর্ণ মনোযোগ পাচ্ছে— এটিই প্রকৃত অর্থে কোয়ালিটি টাইম।
মা-বাবারা সন্তানের মঙ্গলের জন্য গাধার খাটুনি খাটছি। নিজেদের আরাম-আয়েশ বিসর্জন দিয়ে তাদের জন্য সম্পদ জমাচ্ছি। আমাদের মা-বাবারাও তাই করেছেন। কিন্তু পার্থক্য হলো— তখন আমরা যারা শিশু-কিশোর ছিলাম, আমাদের জন্য পৃথিবীটা এত উন্মুক্ত ছিল না। এখনকার প্রজন্মের মতো আমাদের সামনে বলার সুযোগ ছিল না— হাতের মুঠোয় পৃথিবী।
আর তাই বাস্তবতা হলো— একটা দামি ফ্ল্যাট বা লেটেস্ট গ্যাজেটের চেয়ে মা-বাবার সঙ্গে কাটানো সন্তানের একটি নির্ভেজাল বিকেল বা সন্ধ্যা অনেক বেশি দামি। সন্তানের জন্য পুরো পৃথিবী জেতার আগে প্রতিদিন একটু সময় বের করে তার নিজস্ব পৃথিবীটা বোঝার চেষ্টা করা জরুরি।
সন্তানের যে ভবিষ্যতের ভাবনা থেকে আজ অভিভাবকরা সময়টাকে বিসর্জন দিচ্ছেন, নিজেদের সুখ-শান্তিকেও পরোয়া করছেন না, তারা একটু থামুন। একটু ভাবুন— সহায়-সম্পদ না হয় করলাম, কিন্তু আমার-আপনার মনোযোগের অভাবে আমাদের সন্তানরাই যদি অন্ধকারে হারিয়ে যেতে থাকে, তাহলে সারা জীবনের হাড়ভাঙা খাটুনি আর সহায়-সম্পদ দিয়ে গড়া ওই ভবিষ্যতের কি বিন্দুমাত্র দাম থাকবে?
লেখক: সাংবাদিক

শুনতে বেশ আকর্ষণীয় মনে হলেও, এই ‘প্রণোদনা’ কি আসলেই ছাদ-মালিকদের আকৃষ্ট করতে পারবে? এর ফলে, ছাদ-মালিকেরা কি রুফটপ সোলার স্থাপনে বাড়তি উৎসাহ বোধ করবেন, নাকি বিদ্যমান নেট মিটারিং ব্যবস্থাকেই বেশি লাভজনক মনে করবেন?
১৪ দিন আগে
বাংলাদেশের জন্য এই সম্মেলনটির গুরুত্ব অনেক বেশি। কারণ ঢাকা একইসঙ্গে ভারত, চীন, যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, রাশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর সঙ্গে অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সম্পর্ক বজায় রাখে। ফলে ব্রিকসকে বাংলাদেশের কাছে কোনো একটি ভূরাজনৈতিক বলয় হিসেবে দেখার চেয়ে বরং বিকল্প অর্থায়ন, বাণিজ্যিক বৈচিত্র্য, জ্
১৪ দিন আগে
একটি নবনির্বাচিত বা নতুন গঠিত সরকারের সামনে রাষ্ট্র পরিচালনার নানাবিধ সংকট ও চ্যালেঞ্জ এসে দাঁড়ায়। তবে বর্তমান প্রেক্ষাপটে নতুন সরকারের পথচলা নিছক রুটিন রাষ্ট্র পরিচালনার বিষয় নয়; বরং এটি একই সঙ্গে রাজনৈতিক সমীকরণ সামলানো, গণআকাঙ্ক্ষা রক্ষা ও অর্থনৈতিক কাঠামোর ধ্বংসস্তূপ থেকে পুনরুত্থানের এক কঠিন পর
২৩ দিন আগে
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ সূক্ষ্মতা স্পষ্ট করা দরকার— আমি রাজনৈতিক প্রতিবাদ বা আন্দোলনকে অন্যায় বলছি না। আমার মূল যুক্তিটি প্রাতিষ্ঠানিক সম্পর্ক নিয়ে— রাজপথকে যদি প্রধান রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে রাখা হয়, তাহলে সংসদীয় গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।
২৬ আগস্ট ২০২৬