রোহিঙ্গাদের জন্য ৯৪ কোটি ডলার সহায়তা চেয়েছে জাতিসংঘ

কূটনৈতিক প্রতিবেদক, রাজনীতি ডটকম
কক্সবাজারের কুতুপালংয়ে রোহিঙ্গা ক্যাম্প। ছবি: ইউএনএইচসিআর

বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া মিয়ানমার থেকে বলপূর্বক বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর জন্য সহায়তা বাড়াতে জাতিসংঘ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে এই জনগোষ্ঠীর জন্য তহবিল সংকটের পরিপ্রেক্ষিতে জাতিসংঘ এ আহ্বান জানিয়েছে। রোহিঙ্গাদের সহায়তা করতে ২০২৫-২০২৬ জয়েন্ট রেসপন্স প্ল্যান (জেআরপি) নামে প্রথম দুই বছর মেয়াদি একটি প্রকল্পও শুরু করা হয়েছে।

রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী ও তাদের আশ্রয় দেওয়া বাংলাদেশের জন্য প্রয়োজনীয়তা নিরূপণ এবং সে অনুযায়ী টেকসই পদক্ষেপ নিতে তহবিল তৈরির জন্য জেআরপি প্রকল্প শুরু হয়েছে। সোমবার (২৪ মার্চ) জেনেভায় ছিল এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে জানানো হয়, এতদিন জেআরপি এক বছরের জন্য করা হলেও এবারই প্রথম দুই বছরের জন্য জেআরপি পরিকল্পনা করা হয়েছে।

বাংলাদেশ সরকারের নেতৃত্বে এই প্রকল্পে আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা ও শরণার্থী সংস্থার পাশাপাশি ১১৩টি সহযোগী সংস্থা অংশ নিচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে ৫৬টি বাংলাদেশি এনজিও, ৩৩টি আন্তর্জাতিক এনজিও, ১১টি জাতিসংঘের সংস্থা এবং ১৩টি অন্যান্য জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সংস্থা। এসব সংস্থার পক্ষ থেকে প্রথম বছর রোহিঙ্গা ও স্থানীয় কমিউনিটির সদস্যদের সহায়তা করতে প্রায় ৯৪ কোটি ডলার সহায়তার আবেদন জানানো হয়েছে।

এই ইভেন্টে বাংলাদেশ সরকারের পক্ষে নেতৃত্ব দেন রোহিঙ্গা সমস্যা ও অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত বিষয়াবলির জন্য প্রধান উপদেষ্টার হাইরিপ্রেজেনটেটিভ ড. খলিলুর রহমান। তিনিসহ জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক হাইকমিশনার ফিলিপ্পো গ্র্যান্ডি ও আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার (আইওএম) মহাপরিচালক অ্যামি পোপ জেনেভায় দাতা সংস্থাগুলোর সামনে জেআরপি প্রকল্পের বিস্তারিত তুলে ধরেন।

২০১৭ সালে শুরু করে পরবর্তী বছর দুয়েক সময়ে মিয়ানমারের সহিংসতা থেকে পালিয়ে বাংলাদেশে এসে আশ্রয় নেয় প্রায় ১০ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা। কক্সবাজারের বিভিন্ন শরণার্থী শিবিরে আশ্রয় হয় তাদের। দেশে রোহিঙ্গা ঢলের আট বছর পর এসে রোহিঙ্গাদের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে প্রায় ১৫ লাখ।

বিপুল পরিমাণ এই রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী খাবারের জন্য সাহায্য সংস্থাগুলোর দেওয়া মানবিক সহায়তার ওপর নির্ভরশীল। চলতি মার্চ পর্যন্তও তারা খাদ্য বাবদ মাসে সাড়ে ১২ ডলার করে ভাউচার পাচ্ছিল বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচির (ডাব্লিউএফপি) পক্ষ থেকে। তকেব সংস্থাটি জানিয়েছে, তহবিল সংকটের কারণে এই বরাদ্দ এপ্রিল থেকে কমে ৬ ডলারে নামিয়ে আনতে বাধ্য হচ্ছে তারা।

এর মধ্যে জাতিসংঘ মহাসচিব অ্যান্তোনিও গুতেরেস বাংলাদেশ সফর করে গেছেন। রোহিঙ্গা ক্যাম্প পরিদর্শনের পাশাপাশি লাখো রোহিঙ্গার সঙ্গে ইফতারও করেছেন তিনি। এই সফরে তার সামনেও রোহিঙ্গাদের খাদ্য সহায়তায় সংকটের কথা তুলে ধরা হয়। তিনি বাংলাদেশ সফরের সময় দেওয়া বক্তব্যেও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি রোহিঙ্গাদের জন্য তহবিল বাড়ানোর আহ্বান জানান।

এমন পরিস্থিতিতে সোমবার জেনেভায় দাতাদের কাছে রোহিঙ্গা সংকটের বর্তমান অবস্থা তুলে ধরে জাতিসংঘ কর্মকর্তারা বলেছেন, আট বছর পরে রোহিঙ্গা সংকট আন্তর্জাতিক পাদপ্রদীপের বাইরে চলে গেলেও তাদের সংকটের সমাধান হয়নি। তাদের খাদ্য সহায়তা কমে গেলে এবং রান্নার জ্বালানি বা মৌলিক আশ্রয় দিতে না পারলে বিশাল ও দুর্বল এই জনগোষ্ঠীর জন্য তা মারাত্মক ক্ষতির কারণ হতে পারে। জেআরপি প্রকল্পও সেখানেই গ্রহণ করা হয়েছে।

অনুষ্ঠানে খলিলুর রহমান বলেন, মিয়ানমারের রাখাইনে (রোহিঙ্গাদের আবাসস্থল) রাজনৈতিক পটভূমিতে বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে। বর্তমানে ওই ভূখণ্ড নিয়ন্ত্রণ করছে আরাকান আর্মি। আমরা মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর পাশাপাশি আরাকান আর্মির সঙ্গেও যোগাযোগ রাখছি। জাতিসংঘ মহাসচিবের বাংলাদেশ সফরের সময়ে রোহিঙ্গারা জানিয়েছেন, তারা নিজ দেশে ফেরত যেতে চান। এ জন্য আমাদের কাজ করতে হবে।

খলিলুর রহমান আরও বলেন, রোহিঙ্গারা বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়ার পর থেকে বছরে প্রায় ৩০ হাজার রোহিঙ্গা শিশু জন্ম নিচ্ছে। বর্তমানে আশ্রয়শিবিরগুলোতে রোহিঙ্গাদের সংখ্যা প্রায় ১২ লাখ (জাতিসংঘের হিসাবে ১৪ কোটি ৮০ লাখ)। এ ছাড়া রাখাইনে সংঘর্ষের কারণে গত কয়েক মাসে আরও ৮০ হাজার রোহিঙ্গা বাংলাদেশে ঢুকেছে।

তহবিল চেয়ে যা বলছে জাতিসংঘ

২০২৫ সালের প্রয়োজনভিত্তিক কার্যক্রমের জন্য মোট ৯৪ কোটি ডলার তহবিল প্রয়োজনের কথা জানিয়েছে জাতিসংঘ। সদস্যরাষ্ট্র ও বেসরকারি দাতাদের কাছ থেকে আসবে এই তহবিল।

জাতিসংঘ আরও বলছে, জেআরপি কোনো অর্থায়ন করা কর্মসূচি নয়, বরং এটি ১১৩টি মানবিক অংশীদারের পক্ষ থেকে একটি মানবিক আবেদন। রোহিঙ্গা শরণার্থীদের জরুরি মানবিক সহায়তার পাশাপাশি তাদের দক্ষতা উন্নয়ন ও ক্ষুদ্র আয়ের সুযোগ তৈরির মাধ্যমে সহনশীলতা বাড়ানোও এই তহবিলের অন্যতম উদ্দেশ্য।

২০২৫ সালের জন্য জেআরপি বরাদ্দের মধ্যে প্রায় ৩৮ কোটি ডলার হিসাব করা হয়েছে কক্সবাজার ও ভাসানচরের রোহিঙ্গাদের জরুরি জীবন রক্ষাকারী কার্যক্রমের জন্য। এর আগে গত বছর ৮৫ কোটি ডলার জেআরপি আবেদন করা হয়েছিল। এর মধ্যে তবহিল সংগ্রহ হয় ৫৬ কোটি ডলার। চাহিদামতো তহবিল সংগ্রহ না হওয়ায় রোহিঙ্গাদের খাদ্য ও অন্যান্য সহায়তা কমাতে হয়। রোহিঙ্গাদের সুরক্ষা, পুষ্টি ও সামগ্রিক কল্যাণে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে।

জেআরপি ২০২৫-২৬ মেয়াদের লক্ষ্য

২০২৫-২৬ মেয়াদে পাঁচটি প্রধান লক্ষ্য অর্জনকে সামনে রেখে জেআরপি শুরু করা হয়েছে। এগুলো হলো—

  • রোহিঙ্গা শরণার্থীদের দ্রুত, স্বেচ্ছায় ও স্থায়ী প্রত্যাবাসনের জন্য কাজ করা;
  • রোহিঙ্গা নারী, পুরুষ, মেয়ে ও ছেলেদের সুরক্ষা ও সহনশীলতা বাড়ানো;
  • ক্ষতিগ্রস্ত জনগোষ্ঠীর জন্য জীবনরক্ষাকারী সহায়তা দেওয়া;
  • স্থানীয় জনগোষ্ঠীর কল্যাণ সাধন; এবং
  • দুর্যোগ ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা জোরদার ও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলা করা।

যে ৮ খাতে তহবিল বরাদ্দে অগ্রাধিকার

উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে জানানো হয়, জেআরপির তহবিলের প্রয়োজনীয়তায় আটটি খাতের অগ্রাধিকারভিত্তিক কার্যক্রমকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এগুলো হলো— খাদ্য নিরাপত্তা, পুষ্টি, স্বাস্থ্য, আশ্রয়ণ, পানি-স্যানিটেশন-স্বাস্থ্যবিধি (ওয়াশ), সুরক্ষা, শিক্ষা এবং জীবিকা ও দক্ষতা উন্নয়ন।

তবে জাতিসংঘ বলছে, কক্সবাজারের আশ্রয় শিবিরসহ ভাসানচরে বসবাসকারী বিপুল পরিমাণ রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী কিংবা কক্সবাজারের স্থানীয় জনগোষ্ঠীর বিশাল চাহিদা মেটানোর জন্য জেআরপি পুরোপুরি সক্ষম হবে না। এমএসফ, রেড ক্রস/ রেড ক্রিসেন্ট, এএফফডির মতো অন্যান্য বেসরকারি সংস্থা ও অন্যান্য কৌশলগত অংশীদার এই জেআরপি কাঠামোর বাইরে গিয়েও কিছু তহবিল সংগ্রহ করে থাকে এবং করবে। সার্বিক চাহিদাগুলো পূরণের জন্য এসব তহবিল কাজে দেবে।

জেআরপির উপকারভোগী কারা

জেআরপি ২০২৫-২৬-এর অধীনে সরাসরি সুবিধাভোগীদের মধ্যে কক্সবাজার ও ভাসানচরের ক্যাম্পে রয়েছেন বসবাসকারী রোহিঙ্গা শরণার্থীরা। তাদের সংখ্যা প্রায় ১১ লাখ। এ ছাড়া কক্সবাজারের স্থানীয় বাসিন্দাদের প্রায় চার লাখও এই তহবিলের সহায়তার আওতায় আসবেন।

সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, রোহিঙ্গারা এসে আশ্রয় নেওয়ার পর থেকে কক্সবাজারের স্থানীয় পরিবেশ-প্রতিবেশ ব্যাপকভাবে প্রভাবিত হয়েছে। স্থানীয় জনগোষ্ঠীও বিভিন্নভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এসব ক্ষয়ক্ষতির প্রভাব কাটাতে জেআরপির তহবিল ভূমিকা রাখবে।

ad
ad

খবরাখবর থেকে আরও পড়ুন

১৭ মাসে রাজনৈতিক সহিংসতায় নিহত ১৯৫ : এইচআরএসএস

প্রতিবেদন অনুযায়ী, দলীয় আধিপত্য বিস্তার, প্রতিশোধপরায়ণতা, সমাবেশকেন্দ্রিক সংঘর্ষ, নির্বাচন ও চাঁদাবাজিকে ঘিরে ১৪১১টি সহিংস ঘটনায় ১৯৫ জন নিহত ও ১১ হাজার ২২৯ জন আহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে বিএনপির ১৩৪, আওয়ামী লীগের ২৬, জামায়াতের ৫, ইউপিডিএফের ৬ জনসহ বিভিন্ন দলের নেতাকর্মী রয়েছেন।

১৪ ঘণ্টা আগে

শিল্পকলা একাডেমি আইন সংশোধন করে গেজেট প্রকাশ

১৯৮৯ সালের ২২ নং আইনের কিছু শব্দের সংশোধন করে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি আইন, ১৯৮৯ (১৯৮৯ সালের ২২ নং আইন)-এর সংক্ষিপ্ত শিরোনামসহ সর্বত্র উল্লিখিত একাডেমী, ‘একাডেমীর’ ও ‘একাডেমীতে’ শব্দগুলোর পরিবর্তে যথাক্রমে ‘একাডেমি’, ‘একাডেমির’ ও ‘একাডেমিতে’ শব্দগুলো প্রতিস্থাপিত হবে।

১৪ ঘণ্টা আগে

সামাজিক মাধ্যমে নির্বাচনী প্রচারণা নিয়ে ইসির জরুরি নির্দেশ

রিটার্নিং অফিসারকে পাঠানো ওই চিঠিতে বলা হয়েছে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচার-প্রচারণার ক্ষেত্রে রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীর আচরণ বিধিমালা, ২০২৫-এর বিধি ১৬-তে উল্লেখ রয়েছে— ‘সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নির্বাচনী প্রচারণায় কোনো প্রার্থী বা তার নির্বাচনী এজেন্ট বা প্রার্থীর পক্ষে অন্য কোনো ব্যক্তি সামাজিক যোগায

১৫ ঘণ্টা আগে

আ.লীগের ভোটের অর্ধেকই পেতে পারে বিএনপি: জরিপ

আজ বুধবার (৪ ফেব্রুয়ারি) সকালে রাজধানীর জাতীয় প্রেসক্লাবে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে ‘আনকভারিং দ্য পাবলিক পালস: ফাইন্ডিংস ফ্রম আ নেশনওয়াইড সার্ভে’ শীর্ষক এই জনমত জরিপের ফল প্রকাশ করা হয়। সিআরএফ এবং বাংলাদেশ ইলেকশন অ্যান্ড পাবলিক ওপিনিয়ন স্টাডিজ যৌথভাবে এই জরিপ পরিচালনা করেছে।

১৬ ঘণ্টা আগে