আজ বাংলাদেশের জন্মদিন

প্রতিবেদক, রাজনীতি ডটকম
মহান স্বাধীনতা দিবস। ফাইল ছবি

আজ ২৬ মার্চ, ৫৬তম মহান স্বাধীনতা দিবস। বাঙালি জাতির জন্য এটি অন্যতম গৌরবময় দিন, কারণ এই দিনেই জন্ম নেয় স্বাধীন বাংলাদেশ। ব্রিটিশদের পর পশ্চিম পাকিস্তানিদের পরাধীনতার শৃঙ্খল ভেঙে জাতির মাথা উঁচু করে দাঁড়ানোর চূড়ান্ত পদক্ষেপটি নেওয়ার দিন আজ।

দুই শ বছরের ব্রিটিশ শাসনের অবসানে যখন গঠিত হলো দুটি রাষ্ট্র ভারত ও পাকিস্তান, মানুষের মনে তখন স্বাধীনতার উল্লাস। তবে ১৯৪৭ সালে দেশভাগের পর পাকিস্তানের পূর্বাঞ্চলের মানুষের মনের সে উল্লাস বিষাদে রূপ নিতে সময় লাগেনি। কারণ তারা বুঝতে পারেন, স্বাধীনতার নামে তারা পরাধীনতার নতুন শেকলে বাঁধা পড়েছেন। পার্থক্য হলো— আগে তাদের শাসক ছিল ব্রিটিশরা, এখন পশ্চিম পাকিস্তানিরা।

ক্রমেই স্পষ্ট হলো— পাকিস্তান রাষ্ট্রটি কৃত্রিমভাবে গড়ে তোলা। হাজার মাইল দূরে অবস্থিত দুটি ভূখণ্ডকে এভাবে এক দেশ হিসেবে বাস্তবায়ন করা সম্ভব না। এর মধ্যেই পশ্চিম পাকিস্তানিদের শোষণ অব্যাহত থাকল, দীর্ঘায়িত হতে থাকল পূর্ব-পাকিস্তানিদের বঞ্চনার ইতিহাস।

প্রথম বারুদটা জ্বলল ১৯৫২ সালে। বুকের রক্ত দিয়ে মাতৃভাষার অধিকার আদায় করল বাঙালি। ওদিকে শোষণ-বঞ্চনার ইতিহাস যত দীর্ঘায়িত হয়, এদিকে স্বাধিকার, স্বায়ত্তশাসন পেরিয়ে ততই দানা বাঁধতে থাকে স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা। ছেষট্টির ছয়-দফা আন্দোলনের পর উনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান স্পষ্ট বার্তা ছড়িয়ে দেয়— পশ্চিম পাকিস্তানিদের সঙ্গে সম্পর্ক ধরে রাখা সম্ভব না।

সত্তরের নির্বাচনে ব্যালটেই প্রমাণ মেলে পূর্ব-পাকিস্তানিদের স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষার। নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা তারা তুলে দেয় আওয়ামী লীগের হাতে। কিন্তু পশ্চিম পাকিস্তানিরা ষড়যন্ত্র অব্যাহত রাখে, গঠন করতে দেয় না সরকার। ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ তাই ঐতিহাসিক রেসকোর্স ময়দানে সরকার গঠনের ম্যান্ডেট পাওয়া শেখ মুজিবের কণ্ঠে ধ্বনিত হয় কৌশলগত স্বাধীনতার ঘোষণা— এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।

পশ্চিম পাকিস্তানিরা সে ঘোষণাকে পাত্তা দেয়নি, কিংবা পূর্ব-পাকিস্তানিদের রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষাকে বুঝতে ব্যর্থ হয়। বরং তারা গ্রহণ করে পোড়ামাটি নীতি। ২৫ মার্চ রাতে নিরস্ত্র বাঙালির ওপর লেলিয়ে দেয় সামরিক বাহিনী। পিলখানা থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, রাজারবাগ থেকে কমলাপুর— রক্তের স্রোত বেয়ে যায় ঢাকা নগরী জুড়ে।

এরপর পাকিস্তানিদের সঙ্গে সম্পর্ক ধরে রাখার সব পথ বন্ধ হয়ে যায়। যে স্বাধীন বাংলাদেশ ১৯৪৭ সালের পরপরই ছিল অবশ্যম্ভাবী, সেই স্বাধীন বাংলাদেশের চূড়ান্ত ঘোষণা এলো নিরস্ত্র বাঙালির রক্তের স্রোত বেয়ে ২৫ মার্চ কালরাত পেরিয়ে ২৬ মার্চের প্রথম প্রহরে।

সে দিন স্বাধীনতার ঘোষণা দেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তার পক্ষে মেজর জিয়াউর রহমান (পরবর্তী সময়ে সেনাপ্রধান ও রাষ্ট্রপতি) সে ঘোষণা পাঠ করলে তা আপামর জনসাধারণের মধ্যে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে। বিশ্ব মানচিত্রে জন্ম নেয় নতুন দেশ— বাংলাদেশ।

এরপরই দেশের সর্বস্তরের মানুষ পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলে। গোটা জাতি ঐক্যবদ্ধ হয়ে মুক্তিসংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়ে। চাষাভুষা ভেতো বাঙালির স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষার কাছে পরাভূত হয় পাকিস্তানের মহাশক্তিধর সশস্ত্র বাহিনী। দীর্ঘ ৯ মাসের যুদ্ধে ৩০ লাখ শহিদের রক্ত আর দুই লাখ নারীর ধর্ষণ-যৌন নির্যাতনের ক্ষত বুকে নিয়ে চূড়ান্ত বিজয় অর্জিত হয় ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর।

প্রতি বছর উৎসাহ-উদ্দীপনার সঙ্গে জাঁকজমকপূর্ণ আয়োজনে পালন করা হয়ে থাকে বাংলাদেশের এই জন্মদিন তথা মহান স্বাধীনতা দিবস। এবারও ঢাকাসহ সারা দেশে ৩১ বার তোপধ্বনির মাধ্যমে দিবসটির সূচনা করা হবে। দেশের সব সরকারি, আধাসরকারি, স্বায়ত্তশাসিত ও বেসরকারি ভবনে সূর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গে উত্তোলন করা হবে জাতীয় পতাকা।

ভোরে সাভারে জাতীয় স্মৃতিসৌধে জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান মুক্তিযুদ্ধের বীর শহিদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাবেন রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী। মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রীর নেতৃত্বে বীরশ্রেষ্ঠ পরিবার, যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা ও বীর মুক্তিযোদ্ধারা শহিদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাবেন। পরে সর্বসাধারণের শ্রদ্ধার জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হবে স্মৃতিসৌধ।

দেশের অন্যান্য জেলা-উপজেলাতেও বিভিন্ন স্মৃতিসৌধ ও শহিদ মিনারে পুষ্পস্তবক অর্পণ করা হবে। এ ছাড়া কুচকাওয়াজ, মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক আলোচনা সভা, চলচ্চিত্র প্রদর্শনী ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হবে সারা দেশে।

স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবস উপলক্ষ্যে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান পৃথক বাণীতে দেশবাসীকে শুভেচ্ছা জানিয়েছেন। রাষ্ট্রপতি তার বাণীতে স্বাধীনতাকে জাতির সর্বশ্রেষ্ঠ অর্জন বলে উল্লেখ করেছেন। প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, স্বাধীনতার মূল লক্ষ্য ছিল একটি বৈষম্যহীন, গণতান্ত্রিক, শান্তিপূর্ণ ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করা।

রাষ্ট্রপতি তার বাণীতে বলেন, স্বাধীনতা জাতি হিসেবে আমাদের সর্বশ্রেষ্ঠ অর্জন। আজকের এই দিনে আমি সশ্রদ্ধচিত্তে ও কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করি মহান মুক্তিযুদ্ধে আত্মোৎসর্গকারী বীর শহিদদের, যাদের সর্বোচ্চ ত্যাগের বিনিময়ে আমরা পেয়েছি স্বাধীনতা।

দীর্ঘদিনের অপশাসন, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি ও জ্বালানি সংকটের বিরূপ প্রভাবের কথা উল্লেখ করে রাষ্ট্রপতি বলেন, সরকার সর্বোচ্চ আন্তরিকতা ও দক্ষতার সঙ্গে এসব পরিস্থিতি মোকাবিলা করে একটি স্বনির্ভর ও গতিশীল বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার পথে এগিয়ে চলছে। এ সময় দৃঢ় জাতীয় ঐক্য, সহমর্মিতা ও দেশপ্রেম খুব জরুরি।

প্রধানমন্ত্রী তার বার্তায় জাতির শ্রেষ্ঠ সূর্যসন্তান, বীর মুক্তিযোদ্ধা, নির্যাতনের শিকার মা-বোন ও স্বাধীনতা সংগ্রামে আত্মনিবেদিত সবাইকে গভীর কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করেন এবং সব শহিদের বিদেহী আত্মার মাগফিরাত কামনা করেন।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, মহান স্বাধীনতা দিবস আমাদের জীবনে সাহস, আত্মত্যাগ ও দেশপ্রেমের চেতনাকে নতুন করে উজ্জীবিত করে। স্বাধীনতার মূল লক্ষ্য ছিল একটি বৈষম্যহীন, গণতান্ত্রিক, শান্তিপূর্ণ ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করা। সেই লক্ষ্য সামনে রেখে আমাদের সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে হবে এবং দেশকে সামনের দিকে এগিয়ে নিতে হবে।

মাতৃভূমির অগ্রগতি ও উন্নয়নের ধারাকে আরও বেগবান করতে জাতীয় ঐক্য, পারস্পরিক সহনশীলতা ও দেশপ্রেমের চেতনাকে হৃদয়ে ধারণ করার আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আসুন, মহান স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবসের তাৎপর্য থেকে শিক্ষা নিয়ে আমরা সবাই নিজ নিজ অবস্থান থেকে দেশের কল্যাণে আত্মনিয়োগ করি। একটি উন্নত, সমৃদ্ধ ও মর্যাদাশীল বাংলাদেশ গড়ে তুলতে আমরা সম্মিলিতভাবে কাজ করি।

মহান স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষ্যে ক্ষমতাসীন বিএনপি ও অন্যান্য রাজনৈতিক দল বিশেষ কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। বিএনপির পক্ষ থেকে ২৫ মার্চ ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশনে আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। ২৬ মার্চ ভোর ৫টায় জাতীয় স্মৃতিসৌধে মহান মুক্তিযুদ্ধে শহিদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। দলের পক্ষ থেকেও জানানো হবে শ্রদ্ধা। একই সঙ্গে কেন্দ্রীয় ও সারা দেশের কার্যালয়ে পতাকা উত্তোলন করা হবে।

বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীও দুই দিনের কর্মসূচিতে ২৫ মার্চ জাতীয় প্রেসক্লাবে এক আলোচনা সভা করেছে। সেখানে প্রধান অতিথি ছিলেন দলের আমির ও জাতীয় সংসদের বিরোধী দলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান। ২৬ মার্চ ভোরে কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে পতাকা উত্তোলন, সাভারে পুষ্পস্তবক অর্পণ এবং দেশব্যাপী দোয়া মাহফিলের মাধ্যমে শহিদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাবে দলটি।

ad
ad

খবরাখবর থেকে আরও পড়ুন

স্বাধীনতা দিবসে বাংলাদেশের জনগণকে ভারতের রাষ্ট্রপতির শুভেচ্ছা

মহান স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবস সামনে রেখে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনসহ বাংলাদেশের জনগণকে শুভেচ্ছা জানিয়েছেন ভারতের রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মু। একই সঙ্গে তিনি দুই দেশের সম্পর্ক আরও জোরদার এবং আঞ্চলিক শান্তি, স্থিতিশীলতা ও সমৃদ্ধি এগিয়ে নেওয়ার প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করেছেন।

৬ ঘণ্টা আগে

স্যাবিন অ্যাওয়ার্ডে ‘রাইজিং স্টার’ সেঁজুতি সাহা, গোল্ড মেডেল পাচ্ছেন শাহিন-তুরেচি

জিনোমিকস ব্যবহার করে বিশ্বের বৃহত্তম টাইফয়েড টিকাদান কর্মসূচি বাস্তবায়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার জন্য সেঁজুতি সাহাকে এ সম্মাননা দেওয়া হচ্ছে। বাংলাদেশের ২০২৫ সালের টাইফয়েড কনজুগেট ভ্যাকসিন কর্মসূচিতে তার গবেষণা ও তথ্যভিত্তিক কাজ এরই মধ্যে চার কোটির বেশি শিশুকে সুরক্ষার আওতায় আনতে সহায়তা করেছে।

৮ ঘণ্টা আগে

জ্বালানি সংকটে স্পট মার্কেট থেকে আরও ২ কার্গো এলএনজি কিনছে সরকার

ইরান যুদ্ধের প্রভাবে মধ্যপ্রাচ্যে অস্থিতিশীলতা তৈরি হওয়ায় জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় জরুরি ভিত্তিতে স্পট মার্কেট থেকে আরও দুই কার্গো তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানির সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার।

৯ ঘণ্টা আগে

জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ বৈঠক

ইরান যুদ্ধের প্রভাবে সৃষ্ট জ্বালানি তেলের সরবরাহ সংকট মোকাবিলায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে একটি বিশেষ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে।

৯ ঘণ্টা আগে