আলোকিত মানুষদের স্মরণে

এম ডি মাসুদ খান

মানুষের জীবনপটে কিছু মুখ থাকে— যারা সময়ের সীমানা পেরিয়ে অনন্তের অংশ হয়ে যান। তারা নিছক শিক্ষক নন, তারা এক একটি জীবন্ত দর্শন; তাদের চলন, বলন, চিন্তা ও আদর্শ এক একটি পাঠশালা, যেখানে বইয়ের অক্ষরের বাইরেও শেখা যায় মানবতার মহাগ্রন্থ। তাদের স্পর্শে মানুষ কেবল শিক্ষিত হয় না, আলোকিত হয়— চরিত্রে, বিবেকে, মূল্যবোধে। আমার জীবনের এমনই কয়েকজন মহীয়ান ব্যক্তিত্ব ও প্রিয় শিক্ষককে গভীর শ্রদ্ধা, কৃতজ্ঞতা ও আবেগের সঙ্গে স্মরণ করছি।

শ্রদ্ধার সর্বোচ্চ আসনে অধিষ্ঠিত আছেন খান মো. আমিন উদ্দীন স্যার— প্রধান শিক্ষক, গুড়দহ মাধ্যমিক বিদ্যালয়, মহেশপুর, ঝিনাইদহ। তিনি যেন এক অনড় পর্বতশৃঙ্গ, যার দৃঢ়তা আমাদের শিখিয়েছে অবিচল থাকতে; আবার তিনি এক বিস্তৃত বটবৃক্ষ, যার ছায়ায় আশ্রয় নিয়ে অসংখ্য জীবন বিকশিত হয়েছে। তার কণ্ঠের প্রতিটি উচ্চারণ ছিল নীতির অমোঘ বাণী, তার শাসন ছিল স্নেহের আবরণে আবদ্ধ এক নির্মোহ সত্য।

তিনি শিক্ষা দিয়েছেন— মানুষ হওয়াটাই সবচেয়ে বড় অর্জন, আর সেই মানুষ হওয়ার পথে সততা, ন্যায়বোধ ও আত্মমর্যাদা হলো প্রধান পাথেয়। তার বিবেক ছিল দীপ্ত আগুনের মতো নির্মল, তার নৈতিকতা ছিল অবিচল শিলাস্তম্ভের মতো অটল। তিনি কেবল একজন শিক্ষক নন— তিনি এক জীবন্ত প্রতিষ্ঠান, এক নীরব বিপ্লব, যিনি প্রজন্মের পর প্রজন্মকে গড়ে তুলেছেন আলোর সন্তান হিসেবে। আমার জীবনগঠনের প্রতিটি স্তরে তার প্রভাব এতটাই গভীর যে, তিনি যেন আমার অস্তিত্বের অবিচ্ছেদ্য অংশ।

স্মরণ করছি জয়নুল আবেদীন স্যারকে— স্বরূপ-কুসুম সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক, মহেশপুর, ঝিনাইদহ; যিনি আমার শিক্ষাজীবনের প্রথম প্রভাতের আলো। শিশুমনের অনাবিল আকাশে তিনি যে স্বপ্নের রঙ ছড়িয়ে দিয়েছিলেন, তা আজও ম্লান হয়নি। তার স্নেহ ছিল মায়ের মতো কোমল, তার ধৈর্য ছিল নদীর মতো দীর্ঘ ও সহিষ্ণু। তিনি জানতেন— শিক্ষা কেবল মস্তিষ্কে নয়, হৃদয়ে প্রোথিত করতে হয়। তার প্রতিটি আচরণে ফুটে উঠত এক নির্মল মানবিকতা, যা আমাকে শিখিয়েছে মানুষকে ভালোবাসতে, সম্মান করতে এবং নিজের ভেতরের শুভবোধকে জাগিয়ে রাখতে। তিনি যেন এক নিরবচ্ছিন্ন স্নিগ্ধ বাতাস, যার স্পর্শে শৈশব হয়ে উঠেছিল আলোকময় ও অর্থবহ।

দীপংকর রায় স্যার— পদ্মপুকুর সরকারি কলেজের রসায়ন বিভাগের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র, মহেশপুর, ঝিনাইদহ। তিনি ছিলেন চিন্তার দিগন্ত উন্মোচনের এক নিরলস সাধক। তার শ্রেণিকক্ষ শুধুই পাঠদানের পরিসর ছিল না; বরং তা ছিল বুদ্ধিবৃত্তিক জাগরণ ও মুক্তচিন্তার এক প্রাণবন্ত অঙ্গন। তিনি আমাদের শিখিয়েছেন প্রশ্ন করতে, যুক্তির গভীরে প্রবেশ করতে এবং অজানার পথে নির্ভয়ে এগিয়ে যেতে। তার মনন ছিল সমুদ্রের মতো গভীর, আর তার দৃষ্টিভঙ্গি ছিল আকাশের মতো অসীম বিস্তৃত।

তার ব্যবহার ছিল অত্যন্ত বিনয়ী, আন্তরিক ও মমতাপূর্ণ। শিক্ষার্থীদের সঙ্গে তার সম্পর্ক নিছক শিক্ষক-শিক্ষার্থীর গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ ছিল না; বরং তিনি ছিলেন একজন সত্যিকারের পথপ্রদর্শক ও বন্ধুসুলভ অভিভাবক। তার সহজ-সরল ও উষ্ণ আচরণ আমাদের মনে সাহস জুগিয়েছে, আত্মবিশ্বাস বাড়িয়েছে এবং শেখার প্রতি এক গভীর ভালোবাসা সৃষ্টি করেছে।

তিনি বিশ্বাস করতেন— জ্ঞান তখনই প্রকৃত অর্থে পূর্ণতা লাভ করে, যখন তা সত্য, ন্যায় এবং মানবকল্যাণের পথে পরিচালিত হয়। তিনি যেন এক অনির্বাণ অগ্নিশিখা— যিনি অজ্ঞতার অন্ধকার ভেদ করে আমাদের সামনে আলোর দিগন্ত উন্মোচন করেছেন।

গভীর শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করছি প্রফেসর ড. আসাদুজ্জামান (মাসুম) স্যারকে, ফরেস্ট্রি অ্যান্ড উড টেকনোলজি ডিসিপ্লিন, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়— যার সান্নিধ্য আমার মতো অসংখ্য শিক্ষার্থীর জীবনে আজও এক অমূল্য সম্পদ।

আমি একজন প্রাক্তন ছাত্র হিসেবে দৃঢ়ভাবে বলতে পারি, স্যারের সবচেয়ে বড় গুণ হলো তার অসাধারণ সরলতা ও অটুট নৈতিকতা। তিনি কখনো জটিলতার আড়ালে নিজেকে লুকাননি; বরং সহজ, স্বচ্ছ ও সৎ জীবনযাপনই তার পরিচয়। তার কথাবার্তা ও আচরণ— সবকিছুতেই ছিল এক ধরনের স্বাভাবিক আন্তরিকতা, যা আমার হৃদয়ে গভীর ছাপ ফেলেছে।

স্যার শিখিয়েছেন— জীবনে বড় হওয়ার আগে মানুষ হতে হয়। আর সেই মানুষ হওয়ার মূল ভিত্তি হলো নৈতিকতা। তিনি নিজের জীবন দিয়েই দেখিয়েছেন কীভাবে সততা, ন্যায়বোধ এবং দায়িত্বশীলতা ধরে রেখে পথ চলতে হয়। তার এই গুণগুলো শুধু আমাকে মুগ্ধ করেনি, বরং আমার ভেতরেও সেই মূল্যবোধ গড়ে তুলতে সাহায্য করেছে।

তার সরলতা ছিল তার শক্তি। তিনি সবসময় শিক্ষার্থীদের খুব সহজভাবে বুঝাতেন, কখনো অহংকার বা জটিলতা তৈরি করতেন না। তার কাছে গেলে মনে হতো— তিনি শুধু একজন শিক্ষক নন, বরং একজন অভিভাবক, একজন পথপ্রদর্শক। তার এই সহজ-সাবলীল ব্যবহারই তাকে এত প্রিয় করে তুলেছে।

তিনি বিশ্বাস করতেন— জীবনে সাফল্য তখনই অর্থবহ হয়, যখন তা সততা ও নৈতিকতার ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে থাকে। এই শিক্ষা আমার জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে পথ দেখায়।

আজ একজন ছাত্র হিসেবে গর্বের সঙ্গে বলতে পারি, স্যারের কাছ থেকে পাওয়া এই সরলতা ও নৈতিকতার শিক্ষা আমার জীবনের সবচেয়ে বড় অর্জনগুলোর একটি। তার মতো একজন মানুষ ও শিক্ষক আমার জীবনে থাকা সত্যিই এক পরম সৌভাগ্য।

গভীর অনুভূতির সঙ্গে স্মরণ করছি এক ভিন্নধর্মী প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব— মি. রহমান। তিনি আমার শিক্ষক নন, প্রচলিত অর্থে কোনো আদর্শিক নায়কও নন; কিন্তু জীবনের পাঠশালায় তিনি আমার সবচেয়ে শক্তিশালী প্রেরণার উৎস।

তিনি যেন নীরব সমুদ্র— বাহিরে শান্ত, অথচ অন্তরে অসীম গভীরতা। তাঁর জীবনের প্রতিটি আচরণ আমাকে শিখিয়েছে ধৈর্যের প্রকৃত অর্থ কী, সংযমের প্রকৃত সৌন্দর্য কোথায়।

তিনি এমন এক মানুষ, যিনি মানুষের মুখ ও মুখোশের ফারাক বুঝেও কখনো তিক্ত হন না। যারা প্রতিনিয়ত তার প্রতি অন্যায় করে, অবিচার করে, আঘাত হানে— তাদের প্রতিও তিনি ধারণ করেন এক অদ্ভুত সহনশীলতা, এক অনির্বচনীয় মানবিকতা। তার নীরবতা কখনো দুর্বলতার প্রতীক নয়; বরং তা এক সুদৃঢ় আত্মনিয়ন্ত্রণের দীপ্ত নিদর্শন। তার মধ্যে আমি দেখেছি— ক্ষমা কেবল একটি গুণ নয়, এটি এক মহত্তম শক্তি।

নিজের যথেষ্ট শক্তি ও সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও তিনি কখনো প্রতিশোধের পথে হাঁটেন না। তার অন্তর যেন আকাশের মতো বিস্তৃত— যেখানে ক্ষুদ্রতা স্থান পায় না, বিদ্বেষের কোনো ছায়া পড়ে না। তিনি শিখিয়েছেন— প্রকৃত শক্তি প্রতিহিংসায় নয়, সংযমে; প্রকৃত বিজয় প্রতিপক্ষকে পরাজিত করায় নয়, নিজের অহংকে জয় করায়। এমনকি পরম শত্রুর প্রতিও তার আচরণ থাকে সদাচারপূর্ণ— যেন অগ্নির মাঝেও তিনি ধারণ করে আছেন শীতল চন্দ্রালোকের স্পর্শ।

তিনি আমার কাছে এক জীবন্ত উপমা— সহনশীলতার, আত্মনিয়ন্ত্রণের এবং মহানুভবতার। তার জীবন আমাকে প্রতিনিয়ত স্মরণ করিয়ে দেয়— মানুষের শ্রেষ্ঠত্ব তার প্রতিক্রিয়ায় নয়, তার সংযমে; তার ক্ষমতায় নয়, তার ক্ষমাশীলতায়।

এই সকল মহান মানুষের কাছে আমি চিরঋণী। তারা কেবল আমার শিক্ষাজীবনের পথপ্রদর্শক নন, তারা আমার চিন্তার ভিত্তি, আমার আদর্শের স্তম্ভ, আমার বিবেকের দিশারী। তাদের জীবন ও শিক্ষা আমাকে বারবার স্মরণ করিয়ে দেয়— মানুষ হওয়াটাই সর্বশ্রেষ্ঠ সাফল্য।

আজকের এই স্মরণ শুধু ব্যক্তিগত আবেগ নয়; এটি এক প্রজন্মের প্রতি আরেক প্রজন্মের ঋণস্বীকার। এমন মানুষ আছেন বলেই আমাদের সমাজে এখনো আলোর সম্ভাবনা বেঁচে আছে, মানবতার দীপ এখনো নিভে যায়নি।

এই শ্রদ্ধাঞ্জলি তাদের প্রতি আমার হৃদয়ের গভীরতম প্রণতি— যারা নিঃশব্দে মানুষ গড়ে তোলেন, আর সেই মানুষদের মাধ্যমেই গড়ে ওঠে একটি আলোকিত জাতি।

লেখক: কলামিস্ট ও বনবিদ

ad
ad

খবরাখবর থেকে আরও পড়ুন

পুলিশের পোশাকে আবারও পরিবর্তন আসছে: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

পুলিশ বাহিনীর বর্তমান পোশাক ও লোগো পরিবর্তনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাউদ্দিন আহমদ। তিনি বলেন, আগের ধাঁচের পোশাকে ফেরার বিষয়টি বিবেচনায় রয়েছে, যেখানে প্যান্টের রং খাকি রাখা হবে।

২ ঘণ্টা আগে

বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত বোরো চাষিদের তিন মাস টাকা দেবে সরকার: কৃষিমন্ত্রী

বন্যায় ক্ষতির মুখে পড়া বোরো চাষিদের জন্য সরকার ক্ষতিপূরণ সহায়তা ঘোষণা করেছে। কৃষি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ জানিয়েছেন, ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের আগামী তিন মাসের জন্য ৭ হাজার ৫০০ টাকা করে আর্থিক সহায়তা দেওয়া হবে।

২ ঘণ্টা আগে

লিমন-বৃষ্টির পরিবার ন্যায়বিচার পাবে: পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী

পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘সরকারের পক্ষ থেকে সব ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। এ ছাড়া, নিহত অপর শিক্ষার্থী নাহিদা সুলতানা বৃষ্টির মরদেহ দ্রুত সময়ের মধ্যে ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করছে সরকার।’

২ ঘণ্টা আগে

সন্ত্রাসবিরোধী আইনের আরেক মামলায় গ্রেপ্তার সাবেক এমপি বুবলী

ঝটিকা মিছিলে ককটেল বিস্ফোরণের অভিযোগে দায়ের করা সন্ত্রাসবিরোধী আইনের আরেক মামলায় সংরক্ষিত নারী আসনের সাবেক সংসদ সদস্য ও নরসিংদী পৌরসভার সাবেক মেয়র লোকমান হোসেনের স্ত্রী তামান্না নুসরাত বুবলীকে গ্রেপ্তার দেখানোর নির্দেশ দিয়েছেন আদালত।

৩ ঘণ্টা আগে