বিজ্ঞান

কাঁচা মরিচের উপকারিতা

ডেস্ক, রাজনীতি ডটকম

রান্নাঘরের কোণে পড়ে থাকা ছোট্ট সবুজ কাঁচা মরিচকে আমরা অনেক সময় অবহেলা করি। ঝাল খেতে না পারলে তো একেবারেই এড়িয়ে যাই। অথচ এই ছোট্ট মরিচেই লুকিয়ে রয়েছে অসাধারণ কিছু স্বাস্থ্য উপকারিতা। শুধু স্বাদ বাড়ানো নয়, শরীরের নানা রোগ প্রতিরোধে কাঁচা মরিচ নিঃশব্দে কাজ করে যায়। প্রাচীন আয়ুর্বেদ থেকে শুরু করে আধুনিক বিজ্ঞান—সব জায়গাতেই কাঁচা মরিচের গুণাগুণ নিয়ে গবেষণা হয়েছে, এখনো হচ্ছে। বিদেশি গবেষকরাও এর কার্যকারিতা নিয়ে বিস্ময় প্রকাশ করেছেন।

কাঁচা মরিচের প্রধান উপাদান ‘ক্যাপসেইসিন’ (Capsaicin)। এটি একটি প্রাকৃতিক রাসায়নিক যা মরিচের ঝালভাবের জন্য দায়ী। তবে ঝালের পাশাপাশি এই উপাদানটি আমাদের শরীরের জন্য একাধিকভাবে উপকারী। আমেরিকার ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া, লস অ্যাঞ্জেলেস (UCLA)-এর নিউরোবায়োলজিস্ট ড. স্টিফেন লরেন্স এক গবেষণায় বলেন, “ক্যাপসেইসিন শরীরের ব্যথানাশক প্রক্রিয়াকে উদ্দীপিত করে। এটি মস্তিষ্কে ‘অ্যান্ডরফিন’ নামক হরমোন নিঃসরণে সাহায্য করে, যা আমাদের স্বাভাবিকভাবেই ভালো লাগা তৈরি করে।” তাঁর মতে, নিয়মিত স্বল্প পরিমাণে কাঁচা মরিচ খাওয়ার অভ্যাস ডিপ্রেশন বা হতাশার প্রভাব অনেকটাই কমাতে পারে।

এই মরিচে রয়েছে প্রচুর ভিটামিন সি, যা রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে বিশেষভাবে কার্যকর। যুক্তরাজ্যের ‘ইম্পেরিয়াল কলেজ লন্ডন’-এর গবেষক ড. মার্থা ব্রাউন বলেন, “একটি মাঝারি আকারের কাঁচা মরিচে প্রায় একটি কমলার সমান ভিটামিন সি থাকতে পারে। এই ভিটামিন ত্বক সুস্থ রাখতে, ক্ষত দ্রুত সারাতে এবং ঠান্ডা-জ্বরের বিরুদ্ধে লড়তে সাহায্য করে।” ফলে শীতকাল বা ভাইরাস সংক্রমণের সময় কাঁচা মরিচ খাওয়া কার্যকর হতে পারে।

পাকস্থলীর হজমপ্রক্রিয়ায় কাঁচা মরিচ সহায়ক ভূমিকা রাখে। ক্যাপসেইসিন অন্ত্রে রক্ত চলাচল বাড়ায়, যা হজমের সমস্যা দূর করতে সাহায্য করে। আমেরিকার টাফটস ইউনিভার্সিটির গবেষক ড. রেমন্ড লি বলেন, “ক্যাপসেইসিন অন্ত্রের ব্যাকটেরিয়ার ভারসাম্য রক্ষা করে। এটি পেট ফাঁপা বা বদহজম কমাতে সহায়ক।” তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, যাঁদের আলসার বা গ্যাস্ট্রিক সমস্যা আছে, তাঁদের অতিরিক্ত ঝাল খাওয়া উচিত নয়।

কাঁচা মরিচ শরীরের মেটাবলিজম বা বিপাক প্রক্রিয়া বাড়াতেও সহায়তা করে। এতে থাকা থার্মোজেনিক উপাদান শরীরে তাপ উৎপাদন বাড়ায়, ফলে ক্যালরি ক্ষয় দ্রুত হয়। কানাডার ইউনিভার্সিটি অব ব্রিটিশ কলাম্বিয়া-র গবেষক ড. এলেনা ফ্রস্ট এক গবেষণায় দেখিয়েছেন, “প্রতিদিন এক-দু’টি কাঁচা মরিচ খেলে ওজন কমার প্রক্রিয়া কিছুটা ত্বরান্বিত হতে পারে।” যদিও একে একমাত্র ‘ওজন কমানোর খাদ্য’ হিসেবে ভাবা ঠিক নয়, তবে স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাসের অংশ হিসেবে কাঁচা মরিচ গুরুত্বপূর্ণ।

বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, কাঁচা মরিচ হৃদযন্ত্রের জন্যও উপকারী। এটি শরীরে খারাপ কোলেস্টেরলের মাত্রা কমায় এবং রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখতে সাহায্য করে। চীনের হুয়াঝং ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজির গবেষক ড. ঝ্যাং ওয়েই জানান, “নিয়মিত ক্যাপসেইসিন গ্রহণ করলে ধমনীর কার্যকারিতা ভালো থাকে, যা স্ট্রোক ও হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি কমাতে পারে।” তবে যাঁদের উচ্চ রক্তচাপ আছে, তাঁদের ক্ষেত্রে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।

কাঁচা মরিচ অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট সমৃদ্ধ, যা কোষের ক্ষয় প্রতিরোধ করে এবং বার্ধক্য কমাতে সাহায্য করে। এই মরিচে থাকা বিটা-ক্যারোটিন, লুটিন, এবং জিঙ্কের মতো উপাদান চোখের দৃষ্টিশক্তি ভালো রাখতে সহায়তা করে। যুক্তরাষ্ট্রের হার্ভার্ড মেডিকেল স্কুলের ড. রেবেকা স্টোন বলেন, “কাঁচা মরিচের অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট উপাদান চোখ ও ত্বকের জন্য অত্যন্ত উপকারী। এটি বয়সজনিত চোখের সমস্যার সম্ভাবনা কমাতে সাহায্য করতে পারে।”

শুধু শারীরিক নয়, মানসিক স্বাস্থ্যেও কাঁচা মরিচের রয়েছে ইতিবাচক প্রভাব। ‘ইউনিভার্সিটি অব কেমব্রিজ’-এর মনোবিজ্ঞানী ড. হেনরি কোলম্যান বলেন, “ক্যাপসেইসিন মস্তিষ্কে ডোপামিন নিঃসরণে সাহায্য করে, যা মনকে চনমনে রাখতে সহায়ক।” তাঁর মতে, ছোট পরিমাণে ঝাল খাওয়া মন ভালো রাখার এক প্রাকৃতিক উপায় হতে পারে।

তবে কাঁচা মরিচের উপকারিতা যতই থাকুক, কিছু সতর্কতাও জরুরি। অতিরিক্ত মরিচ খাওয়ায় গ্যাস্ট্রিক, মুখের ঘা, এমনকি অর্শ বা পাইলসের মতো সমস্যাও দেখা দিতে পারে। যাঁদের হজমশক্তি দুর্বল, তাঁদের অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে মরিচ খাওয়া উচিত। বিশেষ করে ছোট শিশু ও বয়স্কদের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত ঝাল এড়িয়ে চলাই ভালো।

সবশেষে বলা যায়, রান্নায় ঝাল বাড়ানো বা শুধু ভর্তার পাশে কামড়ে খাওয়ার জন্য নয়—কাঁচা মরিচ আসলে এক উপকারি প্রাকৃতিক উপাদান। এটি যেমন খাবারে স্বাদ আনে, তেমনি শরীর-মন দুইয়েরই উপকারে আসে। তবে প্রতিটি ভালো জিনিসের মতো, এটি খেতে হবে পরিমিতভাবে, বুঝে শুনে। তখনই এই ছোট্ট সবুজ মরিচ আমাদের দৈনন্দিন খাদ্যাভ্যাসে হয়ে উঠতে পারে এক অনন্য ও স্বাস্থ্যকর সঙ্গী।

ad
ad

খবরাখবর থেকে আরও পড়ুন

চিকিৎসক সমাবেশের উদ্বোধন করলেন প্রধানমন্ত্রী

এসময় অন্যান্যের মধ্যে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, প্রধানমন্ত্রীর সহধর্মিণী ডা. জুবাইদা রহমান, ড্যাব সভাপতি অধ্যাপক ডা. হারুন আল রশীদ, মহাসচিব ডা. মো. জহিরুল ইসলাম শাকিল প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।

৪ ঘণ্টা আগে

বৃষ্টির আভাস, বাড়বে দিনের তাপমাত্রা

আজ সকাল ৬টায় ঢাকায় তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে ২৭ দশমিক ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস এবং বাতাসের আপেক্ষিক আর্দ্রতা ছিল ৯০ শতাংশ। ঢাকায় আজকের সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ছিল ২৭ দশমিক ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস। এর আগে শুক্রবার ঢাকার সর্বোচ্চ তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছিল ৩২ দশমিক ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস। গত ২৪ ঘণ্টায় রাজধানীতে

৫ ঘণ্টা আগে

উচ্চশিক্ষা ও গবেষণায় জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়কে সহযোগিতার আশ্বাস সার্কের

বৈঠকে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় এবং সার্ক সচিবালয়ের মধ্যে ভবিষ্যতে সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) স্বাক্ষর, যৌথ গবেষণা উদ্যোগ, আন্তর্জাতিক সেমিনার আয়োজন এবং দক্ষতা উন্নয়নমূলক কর্মসূচি বাস্তবায়নের সম্ভাবনা নিয়েও আলোচনা হয়।

১৬ ঘণ্টা আগে

প্রধানমন্ত্রীকে বরণে প্রস্তুত চট্টগ্রাম, নেতাকর্মীরা উজ্জীবিত

প্রধানমন্ত্রীকে স্বাগত জানাতে দলীয়ভাবে ব্যাপক প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। ইতোমধ্যে চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা বিএনপির নেতৃবৃন্দ প্রধানমন্ত্রীকে কোথায় কীভাবে স্বাগত ও শুভেচ্ছা জানানো হবে তার কর্মপরিকল্পনা নির্ধারণ করেছেন। প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর দলের চেয়ারপারসন তারেক রহমান চট্টগ্রামে সাংগঠনিক সভার কর্মসূচি রাখা

২১ ঘণ্টা আগে