এইচএমপিভি নিয়ে নির্দেশনা দিলো স্বাস্থ্য অধিদফতর, আরও যা জানা প্রয়োজন

ডেস্ক, রাজনীতি ডটকম
এইচএসপিভি ভাইরাস। প্রতীকী ছীব

কোভিড-১৯ তথা করোনাভাইরাসের তাণ্ডবের পর চোখ রাঙাচ্ছে হিউম্যান মেটানিউমোভাইরাস (এইচএমপিভি)। কোভিডের মতোই এই ভাইরাস নিয়েও আতঙ্কের সূত্রপাত চীনে। দেশটির উত্তর অঞ্চলে এই ভাইরাসে আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা বাড়তে থাকায় নতুন করে উদ্বেগ দেখা দেয়।

চীনের উর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের উদ্ধৃত করে বলা হয়, ১৪ বছর ও তার কম বয়েসীদের মধ্যে সংক্রমণ বাড়ছে। সম্প্রতি ভারতের অন্তত ছয়জনের শরীরে এই ভাইরাস শনাক্ত হয়েছে। তবে চীন ও ভারত দুই দেশই বলছে, এই ভাইরাস সাধারণ ফ্লুয়ের মতো। এ নিয়ে আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই।

এইচএমপিভি কী?

চলতি মৌসুমে এইচএমপিভি আলোচনায় এলেও যুক্তরাষ্ট্রের সেন্টার ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশন (সিডিসি) বলছে, ২০০১ সালে প্রথম এই ভাইরাস শনাক্ত হয়। ওই বছর নেদারল্যান্ডসের একদল গবেষক এইচএমপিভিকে চিহ্নিত করেন।

তবে আরও অনেক বিশেষজ্ঞই বলেছেন, পৃথিবীতে এ ভাইরাসের অস্তিত্ব সম্ভবত কয়েক দশকের। শুধু তাই নয়, প্রায় সব মানুষই তাদের জীবনে অন্তত একবার এই ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন বলেও জানিয়েছেন তারা।

চীনের সরকার বা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) এখন পর্যন্ত এ ভাইরাস নিয়ে কোনো সতর্কতা জারি করেনি। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরাও তাই এ নিয়ে এখনই আতঙ্কে ভুগতে না করছেন। তবে এই ভাইরাসে যেন আক্রান্ত হতে না হয়, সে বিষয়ে সতর্ক থাকতেও বলেছেন তারা।

অস্ট্রেলিয়ার ফ্লিনডারস বিশ্ববিদ্যালয়ের রোগ বিশেষজ্ঞ জ্যাকলিন স্টিফেন্স বলেছেন, শীতের সময় এই সংক্রমণ খুবই সাধারণ ঘটনা। শিশুরা যে বেশি করে এই ভাইরাসে আক্রান্ত হচ্ছে, সেটাও নতুন কোনো ঘটনা নয়। সাধারণত এই ভাইরাসে সংক্রমণের ফলেই শিশুদের শ্বাসকষ্টজনিত রোগ হয়।

ফ্লিনডারস বিশ্ববিদ্যালয়ের আরেক বিশেষজ্ঞ জিন কার বলেন, ‘করোনার তুলনায় চীনে এইচএমপিভির প্রাদুর্ভাব একেবারেই আলাদা ঘটনা। করোনাভাইরাস একেবারেই নতুন ভাইরাস ছিল। মানুষের শরীরে তার প্রতিরোধ ক্ষমতা ছিল না।’

যেসব উপসর্গ দেখা দেয় এইচএমপিভি শনাক্ত হলে

এইচএমপিভিকেও বিশেষজ্ঞরা মূলত একটি ফ্লু হিসেবে দেখছেন। এতে আক্রান্ত হলেও উপসর্গগুলো সাধারণ জ্বর, সর্দি-কাশি বা ফ্লুয়ের মতো হবে। বিশেষ করে কাশি ও জ্বর থাকতে পারে। নাক বন্ধ হয়ে যেতে পারে। শ্বাসকষ্টও হতে পারে। সঙ্গে চামড়ায় দেখা দিতে পারে র‍্যাশ বা দানা দানা চিহ্ন।

সিডিসি বলছে, এ ভাইরাসে আক্রান্ত হলে যেকোনো বয়সী মানুষের ব্রংকাইটিস বা নিউমোনিয়ার মতো অসুখ হতে পারে। কারও কারও জন্য এসব উপসর্গ মারাত্মক হয়ে উঠতে পারে। তবে এখন পর্যন্ত শিশু, বয়স্ক ও যাদের ইমিউন সিস্টেম বা রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল তাদের মধ্যেই এই ভাইরাসের প্রভাব বেশি দেখা গেছে।

চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, আক্রান্ত হওয়ার পর লক্ষণ প্রকাশ পেতে তিন থেকে ছয় দিন সময় লাগে এই ভাইরাসের। কিন্তু আক্রান্ত হলে ঠিক কতদিন ভুগতে হবে, তা সংক্রমণের তীব্রতা ও আক্রান্ত ব্যক্তির শারীরিক সক্ষমতার ওপর নির্ভর করবে।

ফ্লু বা ইনফ্লুয়েঞ্জা বা করোনভাইরাসের মতো এই ভাইরাসও সংক্রামক। আক্রান্ত মানুষের হাঁচি বা কাশি থেকে বাতাসে বাহিত হয়ে এই ভাইরাস অন্যদের সংক্রমিত করতে পারে। তাছাড়া শারীরিক সংযোগ বা স্পর্শের মাধ্যমেও এই ভাইরাস অন্যদের আক্রান্ত করতে পারে।

শিশু ও বয়স্করা ঝুঁকিতে

শিশু ও বয়স্কদের মধ্যে এই ভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বেশি। কারণ তাদের শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা তুলনামূলকভাবে দুর্বল। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রথমবার এই ভাইরাসের সংক্রমণের তীব্রতা বেশি থাকে। তবে একজন ব্যক্তি এই ভাইরাসে একাধিকবার আক্রান্ত হতে পারেন।

রোমানিয়ার ইরাসমাস মেডিক্যাল ইউনিভার্সিটির অ্য়ালবার্ট ওস্তাহাউস ও তার সহকর্মীরা গবেষণা করে দেখেছেন, এইচএমপিভি কয়েক শ বছর ধরে আছে। তিনি বলেন, ‘পাঁচ বছরের বেশি বয়সীদের শরীরে সাধারণত এইচএমপিভির অ্যান্টিবডি থাকে।’

গবেষকরা বলছেন, করোনাভাইরাস ও ইনফ্লুয়েঞ্জার তুলনায় এইচএমপিভি তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল। এ কারণে এর মিউটেশন খুব তাড়াতাড়ি হয় না। যখন শরীরে প্রতিরোধ ব্যবস্থা কমে যায়, তখন এর সংক্রমণ বাড়ে।

অ্যালবার্ট বলেন, ‘ইনফ্লুয়েঞ্জা ভাইরাসের মিউটেশন খুব বেশি। এইচএমপিভি সে তুলনায় স্থিতিশীল। আমরা আরএসভি ও এইচএমপিভিকে ১০-১৫ বছর ধরে দেখছি। তাদের খুব সামান্য পরিবর্তন হয়েছে। কোনো বড় ধরনের পরিবর্তন এই ভাইরাসের মধ্যে দেখা যায়নি।’

এইচএমপিভিতে আতঙ্ক কতটুকু

স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ, গবেষক ও ভাইরোলজিস্টরা এইচএমপিভি নিয়ে এখনই আতঙ্কিত হওয়ার কোনো কারণ নেই বলেই মত দিচ্ছেন। কারণ হিসেবে তারা বলছেন, এটি কোভিডের মতো নতুন কোনো ভাইরাস নয়। এমনকি বাংলাদেশেও ২০১৬ বা ২০১৭ সালের দিকে এই ভাইরাসের অস্তিত্ব পাওয়া গিয়েছিল বলে জানিয়েছেন তারা।

গবেষকরা বলছেন, ভারত ও চীনসহ বিভিন্ন দেশে ইনফ্লুয়েঞ্জার মতো এই ভাইরাসে আগেও মানুষ আক্রান্ত হয়েছে। এ কারণে মানুষের মধ্যে কিছুটা হলেও এই ভাইরাসের বিরুদ্ধে ইমিউনিটি বা প্রতিরোধব্যবস্থা গড়ে উঠেছে।

বাংলাদেশের জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের ভাইরোলজিস্ট মাহবুবা জামিল বিবিসি বাংলাকে বলেছেন, কোভিড ফুসফুসের যতটা ক্ষতিগ্রস্ত করে, এইচএমপিভিতে ততটা ক্ষতি হয় না।

বিশেষ বিশেষ মানুষদের সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়ে এই ভাইরাস বিশেষজ্ঞ বলেন, শিশু, বয়স্ক, অন্তঃসত্ত্বা বা কঠিন কোনো রোগে আক্রান্তদের মধ্যে এই ভাইরাসের সংক্রমণ তীব্র হতে পারে। কেননা তাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা অপেক্ষাকৃত দুর্বল থাকে। সেক্ষেত্রে সবসময় সতর্ক থাকতে হবে।

স্বাস্থ্য অধিদফতরের ৭ নির্দেশনা

এইচএমপিভির প্রাদুর্ভাব ও তীব্রতা বাড়তে থাকায় বাংলাদেশে এই ভাইরাস সংক্রমণ প্রতিরোধে দেশের সব স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠান ও বন্দরগুলোর স্বাস্থ্য কর্মকর্তাদের সাতটি সচেতনতামূলক নির্দেশনা দিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদফতর। বুধবার (৮ জানুয়ারি) প্রতিষ্ঠানটির রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার লাইন ডিরেক্টর অধ্যাপক ডা. মো. হালিমুর রশিদ এক চিঠিতে নির্দেশনাগুলো পাঠান।

চিঠিতে বলা হয়, ১৪ বছরের কম বয়সী শিশু ও ৬৫ বছর বা তার বেশি বয়সী ব্যক্তিদের মধ্যে এইচএমপিভির সংক্রমণ বেশি। সেই সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্য সমস্যা, যেমন— হাঁপানি বা ক্রনিক অবস্ট্রাকটিভ পালমোনারি ডিজিজ (সিওপিডি), অন্তঃসত্ত্বা নারী এবং দুর্বল রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাসম্পন্ন ব্যক্তিদের জন্য উচ্চ ঝুঁকি হতে পারে।

চিঠিতে আরও বলা হয়, সম্প্রতি চীন ও অন্যান্য দেশে এইচএমপিভির প্রার্দুভাব দেখা দেওয়ায় বাংলাদেশে এর সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে রাখা আবশ্যক। এর জন্য সব স্বাস্থ্য সেবাকেন্দ্র এবং প্রবেশ পথে (পয়েন্টস অব এন্ট্রি) স্বাস্থ্যবিধি জোরদার করা প্রয়োজন।

স্বাস্থ্য অধিদফতর যে সাতটি নির্দেশনা দিয়েছে সেগুলো হলো—

  • শীতকালীন শ্বসনতন্ত্রের রোগগুলো থেকে নিজেকে রক্ষার জন্য মাস্ক ব্যবহার;
  • হাঁচি বা কাশির সময় বাহু বা টিস্যু দিয়ে নাক মুখ ঢেকে রাখা;
  • ব্যবহৃত টিস্যু অবিলম্বে ঢাকনাযুক্ত ময়লা ফেলার ঝুড়িতে ফেলা এবং হ্যান্ড স্যানিটাইজার অথবা সাবান পানি দিয়ে হাত ধুয়ে ফেলা;
  • আক্রান্ত হয়েছেন— এমন ব্যক্তিদের এড়িয়ে চলা এবং কমপক্ষে তিন ফুট দূরত্ব বজায় রাখা;
  • ঘনঘন সাবান ও পানি কিংবা হ্যান্ড স্যানিটাইজার দিয়ে হাত পরিষ্কার করা (অন্তত ২০ সেকেন্ড);
  • অপরিষ্কার হাতে চোখ, নাক, মুখ না ধরা; এবং
  • জ্বর, কাশি ও শ্বাসকষ্ট আক্রান্ত হলে সুস্থ না হওয়া পর্যন্ত বাড়িতে থাকা। প্রয়োজনে কাছের হাসপাতালে যোগাযোগ করা।

এদিকে স্বাস্থ্য অধিদফতর এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানায়, সিডিসি পরিস্থিতির ওপর সর্তক দৃষ্টি রাখছে। হিউম্যান মেটানিউমো ভাইরাস শ্বসনতন্ত্রের অন্যান্য রোগ ও ফ্লুয়ের মতো উপসর্গ তৈরি করে। এগুলো সাধারণত দুই থেকে পাঁচ ৫ দিনের মধ্যে ভালো হয়ে যায়। তাই আতঙ্কিত হওয়ার দরকার নেই। সবাইকে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার জন্য অনুরোধ করা হলো।

এইচএমপিভির চিকিৎসা কী?

নতুন আলোচনায় আসা এই ভাইরাসের জন্য এখন পর্যন্ত অ্যান্টিভাইরাল কোনো ওষুধ তৈরি হয়নি, নেই বিশেষ কোনো চিকিৎসা পদ্ধতিও। অ্যান্টিভাইরাল ওষুধ ব্যবহারের করার বিরুদ্ধে সতর্ক করেছেন সাংহাই হাসপাতালের চিকিৎসকরাও।

এ ক্ষেত্রে করোনাভাইরাসের মতো চিকিৎসকরা সাধারণত উপসর্গ ও লক্ষণগুলো কমানোর জন্য ওষুধ ব্যবহার করে থাকেন। যেমন— জ্বর হলে শরীরের তাপমাত্রা কমানোর ওষুধ দেন। কিংবা সর্দি-কাশি হলে সেগুলো উপশমের জন্য ওষুধ দিয়ে থাকেন।

চিকিৎসকরা বেশির ভাগ ক্ষেত্রে রোগীকে বিশ্রাম নেওয়া, পুষ্টিকর খাবার খাওয়া ও পর্যাপ্ত পানি জাতীয় খাবার খাওয়ার পরামর্শ দিয়ে থাকেন। ইমিউন সিস্টেমকে শক্তিশালী করবে, এমন খাবার গ্রহণের পরামর্শ দেন তারা।

[তথ্য সহায়তা: বিবিসি বাংলা ও ডয়েচে ভেলে বাংলা]

ad
ad

খবরাখবর থেকে আরও পড়ুন

সরকার ‘দৃঢ়প্রতিজ্ঞ’, সচেতনভাবে ভোট দেওয়ার আহ্বান প্রধান উপদেষ্টার

সবার সম্মিলিত অংশগ্রহণের আহ্বান জানিয়ে অধ্যাপক ইউনূস বলেন, ‘গণতন্ত্রের এ ঐতিহাসিক অভিযাত্রায় আপনাদের সক্রিয় অংশগ্রহণ একটি শান্তিপূর্ণ, স্থিতিশীল, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও গণতান্ত্রিক বাংলাদেশের পথে আমাদের সম্মিলিতভাবে এগিয়ে যেতে সহায়তা করবে।’

৩ ঘণ্টা আগে

গুলশান মডেল স্কুলে ভোট দেবেন প্রধান উপদেষ্টা

অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও জুলাই জাতীয় সনদের ওপর অনুষ্ঠেয় গণভোটে ভোট দেবেন রাজধানীর গুলশান মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজ কেন্দ্রে।

৪ ঘণ্টা আগে

ভোটের পরিবেশ খুব ভালো: ইসি মাছউদ

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটের পরিবেশ খুব ভালো। উৎসবমুখর পরিবেশ বিরাজ করছে বলে জানিয়েছেন নির্বাচন কমিশনার আবদুর রহমানেল মাছউদ।

৪ ঘণ্টা আগে

৫০ লাখ নয়, বৈধ খাত দেখাতে পারলে ৫ কোটি টাকা বহনেও বাধা নেই: ইসি সচিব

ভোটের সময় টাকা বহনের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট কোনো সীমা নেই বলে জানিয়েছেন নির্বাচন কমিশন (ইসি) সচিবালয়ের সিনিয়র সচিব আখতার আহমেদ। তিনি বলেন, অর্থের উৎস ও ব্যবহারের বৈধতা দেখাতে পারলে ৫০ লাখ নয়, প্রয়োজনে ৫ কোটি টাকা বহনেও সমস্যা নেই।

৫ ঘণ্টা আগে