রাজনীতিতে ৩৩% নারী প্রতিনিধিত্ব এখনো ‘কাগজে-কলমে’, বাস্তবে প্রতিফলন ‘সীমিত’

প্রতিবেদক, রাজনীতি ডটকম
সোমবার ওয়েভ ফাউন্ডেশন ও একশনএইড বাংলাদেশের আয়োজিত সংলাপে ‘রাজনৈতিক দলগুলোর গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ সম্পর্কিত অবস্থান’ শীর্ষক গবেষণার ফলাফল উপস্থাপন করা হয়। ছবি: সংগৃহীত

রাজনৈতিক দলগুলোর সব স্তরের কমিটিতে ২০৩০ সালের মধ্যে ৩৩ শতাংশ নারী প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করার আইনি বাধ্যবাধকতা থাকলেও বাস্তবে এর প্রতিফলন এখনও ‘সীমিত’ বলে এক গবেষণায় উঠে এসেছে। গবেষণায় বলা হয়েছে, রাজনৈতিক দলগুলো বিধানটি আনুষ্ঠানিকভাবে মেনে নিলেও নীতি নির্ধারণ ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে নারীদের কার্যকর অংশগ্রহণ শুধু ‘কাগজে-কলমে’। ফলে দলের নীতি নির্ধারণ ও সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় নারীদের গুণগত ও অর্থবহ প্রভাব প্রত্যাশিত মাত্রায় দৃশ্যমান হচ্ছে না।

সোমবার (৮ জুন) রাজধানীর একটি হোটেলে আয়োজিত বিভাগীয় সংলাপে ‘রাজনৈতিক দলগুলোর গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (আরপিও) সম্পর্কিত অবস্থান’ শীর্ষক গবেষণার ফলাফল উপস্থাপনকালে এ তথ্য জানানো হয়। নাগরিক সংগঠন ওয়েভ ফাউন্ডেশন ও একশনএইড বাংলাদেশ যৌথভাবে এ সংলাপের আয়োজন করে।

ওয়েভ ফাউন্ডেশন ও একশনএইড বাংলাদেশের পক্ষ থেকে বলা হয়, নারীর রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বকে শুধু সংরক্ষিত আসন বা কোটার মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে সিদ্ধান্ত গ্রহণের সকল স্তরে তাদের কার্যকর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। এ লক্ষ্যে রাজনৈতিক সদিচ্ছা, সামাজিক সচেতনতা এবং প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারকে সমানভাবে গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানানো হয়।

গবেষণাটি দেশের ছয় বিভাগের ১১ জেলার ১৯১ জন অংশীজনের মতামতের ভিত্তিতে পরিচালিত হয়। জাতিসংঘের নির্বাচনি সহায়তা প্রকল্পের (ব্যালট এবং ড্রিপ) অধীনে বাস্তবায়িত বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক সংস্কারের জন্য জেন্ডার-সংবেদনশীল ও অন্তর্ভুক্তিমূলক সিদ্ধান্তগ্রহণ কাঠামো শক্তিশালীকরণ ‘গ্রিপ’ প্রকল্পের আওতায় এই গবেষণাটি পরিচালনা করেন সানাইয়া ফাহিম আনসারি। এর সারসংক্ষেপ উপস্থাপন করেন কনসালট্যান্ট মানসুরা আখতার।

সচেতনতা বেশি, বাস্তবায়ন কম

গবেষণায় অংশ নেওয়া ৮৭ দশমিক ৩ শতাংশ উত্তরদাতা রাজনৈতিক দলগুলোতে ‘৩৩ শতাংশ নারী প্রতিনিধিত্বের বিধান’ সম্পর্কে সচেতন। কিন্তু এর বড় অংশই মনে করেন, দলগুলো এই শর্ত পূরণে কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় সক্রিয় নয়। জরিপে অংশ নেওয়া ৭২ শতাংশ মানুষ জানিয়েছেন, রাজনৈতিক দলগুলোতে ৩৩ শতাংশ নারী প্রতিনিধিত্বের এই বিধান কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হচ্ছে না। একই সঙ্গে আরপিও (গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ) পর্যবেক্ষণ ও বাস্তবায়নে দেশের নির্বাচন কমিশনের (ইসি) ভূমিকা ও কাঠামোগত সক্ষমতা নিয়েও অংশীজনদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। মাত্র ১ দশমিক ৪ শতাংশ উত্তরদাতা মনে করেন, এই আইন বাস্তবায়নে নির্বাচন কমিশনের যথেষ্ট সক্ষমতা রয়েছে এবং ৯ দশমিক ৯ শতাংশ মনে করেন কমিশনের আংশিক সক্ষমতা রয়েছে।

প্রাতিষ্ঠানিক ও সামাজিক বাধা

গবেষণায় রাজনৈতিক দল ও পরিবার পর্যায়ে নারীদের সক্রিয় রাজনীতি ও নেতৃত্বে আসার পেছনে বেশ কিছু প্রধান প্রতিবন্ধকতা চিহ্নিত করা হয়েছে। এর মধ্যে ৬০ দশমিক ৬ শতাংশ উত্তরদাতা পিতৃতান্ত্রিক দলীয় সংস্কৃতি এবং ৫৬ দশমিক ৩ শতাংশ উত্তরদাতা রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাবকে প্রধান বাধা হিসেবে উল্লেখ করেছেন। পাশাপাশি পারিবারিক ও সামাজিক চাপকে ৪৯ দশমিক ৩ শতাংশ এবং দলগুলোর ভেতরে সুনির্দিষ্ট গণতান্ত্রিক চর্চা না থাকাকে ৪৫ দশমিক ১ শতাংশ উত্তরদাতা অন্যতম কারণ হিসেবে দেখছেন। নির্বাচন কমিশনের তদারকি ও পুনঃযাচাইয়ের (ফলো আপ) সীমাবদ্ধতাকে কারণ মনে করেন ৩৯ দশমিক ৪ শতাংশ উত্তরদাতা।

তরুণ নারীদের রাজনীতিতে যুক্ত হওয়ার ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতাগুলো আরও বেশি চ্যালেঞ্জিং। জরিপ বলছে, তরুণীদের রাজনীতিতে আসার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় বাধা নিরাপত্তা ও অনলাইন সহিংসতার ভয়, এছাড়া পুরুষ-প্রধান রাজনৈতিক সংস্কৃতি, সামাজিক নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি, দলীয় সুযোগের অভাব এবং অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতা তরুণীদের মূলধারার রাজনীতিতে সম্পৃক্ত হওয়ার পথকে জটিল করে তুলছে বলে উত্তরদাতারা উল্লেখ করেছেন।

অন্তর্ভুক্তিমূলক সংস্কারের সুপারিশসমূহ

গবেষণার তথ্য ও প্রাতিষ্ঠানিক বিশ্লেষণের ভিত্তিতে সংলাপে জেন্ডার-সংবেদনশীল ও অন্তর্ভুক্তিমূলক গণতান্ত্রিক সংস্কার জোরদার করতে বেশ কিছু সুনির্দিষ্ট ও কাঠামোগত সুপারিশ তুলে ধরা হয়। প্রথমত, বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশন কর্তৃক নিয়মিত অডিটের মাধ্যমে রাজনৈতিক দলগুলোর জেন্ডার-সংক্রান্ত বিধান বাস্তবায়ন যাচাই করা এবং জেন্ডার-ভিত্তিক তথ্য বিশ্লেষণসহ নারী প্রতিনিধিত্ব ও প্রার্থী মনোনয়ন বিষয়ে বাধ্যতামূলক বার্ষিক প্রতিবেদন প্রকাশ নিশ্চিত করার তাগিদ দেওয়া হয়েছে।

দ্বিতীয়ত, কেবল সাধারণ কমিটিতে পদ দেওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে, দলের মূল ‘প্রার্থী মনোনয়ন কমিটি’সহ নীতি-নির্ধারণী ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের মূল পদে নারীদের কার্যকর প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক মনোনয়ন প্রক্রিয়া গড়ে তোলার পাশাপাশি যে দলগুলো সরাসরি আসনে অধিক সংখ্যায় নারী প্রার্থী মনোনয়ন দেবে, তাদের জন্য রাষ্ট্রীয় অর্থায়নে বিশেষ প্রণোদনা প্রবর্তন এবং নারী প্রার্থীদের জন্য মনোনয়ন ফি হ্রাস করার প্রস্তাব করা হয়েছে। এ ছাড়া, দলের অভ্যন্তরীণ জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠা এবং নতুন নারী নেতৃত্ব বিকাশের ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে দলগুলোর ভেতরেই বিশেষ রাজনৈতিক মেন্টরশিপ ও প্রাতিষ্ঠানিক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করার ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়।

সংলাপ ও ইতিবাচক প্রত্যয়

সংলাপে ইউএন উইমেন বাংলাদেশের জেন্ডার রেস্পন্সিভ গভারনেন্সের প্রোগ্রাম ম্যানেজার তপতি সাহা উল্লেখ করেন, এই সংলাপে ময়মনসিংহ, জামালপুর, কক্সবাজার এবং ঢাকাসহ বিভিন্ন অঞ্চলের ও বিভিন্ন পর্যায়ের অংশগ্রহণকারীদের উপস্থিতি আলোচনাকে আরও সমৃদ্ধ করেছে এবং এতে একটি বহুমাত্রিক দৃষ্টিভঙ্গি যুক্ত হয়েছে। তিনি জেন্ডার-সংবেদনশীল ও অন্তর্ভুক্তিমূলক গণতান্ত্রিক কাঠামো শক্তিশালী করার লক্ষ্যে ভবিষ্যতেও সকল অংশীজনের সঙ্গে সম্মিলিতভাবে কাজ করার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন।

অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি নির্বাচন কমিশনার জনাব আব্দুর রহমানেল মাছউদ তার বক্তব্যে বলেন, বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশন কেবল নির্বাচন আয়োজন ও পরিচালনার দায়িত্বই পালন করে না; বরং জনগণের ইচ্ছা ও প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তিনি বিশেষভাবে নারী অধিকার ও রাজনৈতিক অংশগ্রহণ নিয়ে কাজ করা সংগঠন ও ব্যক্তিদের হতাশ না হওয়ার আহ্বান জানান এবং একটি আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনৈতিক পরিবেশ গড়ে তুলতে সকলকে যৌথভাবে কাজ চালিয়ে যাওয়ার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।

এর আগে স্বাগত বক্তব্যে একশনএইড বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর ফারাহ্ কবির বলেন, ‘আমাদের উদ্দেশ্য কেবল নির্বাচন কমিশন, রাজনৈতিক দল বা গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশের ত্রুটি বা সীমাবদ্ধতা চিহ্নিত করা নয়; বরং সামনের দিনগুলোতে কীভাবে সবাই নিজ নিজ অবস্থান থেকে ইতিবাচক অবদান রাখতে পারে, সে বিষয়ে একটি টেকসই কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করা।’

এ ছাড়া সংলাপে গ্রিপ প্রকল্প পরিচিতি প্রদান করেন প্রকল্পের জেন্ডার এক্সপার্ট শিউলী আক্তার। ওয়েভ ফাউন্ডেশনের ডেপুটি ডিরেক্টর কানিজ ফাতেমা গবেষণা পরিচালনাকারী দলকে অভিবাদন জানান এবং আলোচনার সারসংক্ষেপ তুলে ধরে বলেন, আমাদের অভিজ্ঞতা হলো, দেশের অন্যান্য অনেক আইনের মতো আরপিওর ক্ষেত্রেও বাস্তবায়নের ঘাটতি রয়ে গেছে। আজকের আলোচনায় নারীদের নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক অংশগ্রহণের পথে বিদ্যমান প্রতিবন্ধকতাগুলো বারবার উঠে এসেছে। রাজনৈতিক দলগুলো যদি তাদের সাংগঠনিক কাঠামো ও সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় আরপিওর বিধানগুলো আন্তরিকভাবে অনুসরণ করে এবং নারীর নিরাপদ ও অর্থবহ অংশগ্রহণ নিশ্চিত করে, তাহলে একটি আরও জেন্ডার-সংবেদনশীল ও অন্তর্ভুক্তিমূলক গণতান্ত্রিক পরিবেশ গড়ে তোলার প্রক্রিয়া অনেক দূর এগিয়ে যাবে।

ad
ad

খবরাখবর থেকে আরও পড়ুন

এসএসসির ফলাফল প্রকাশ ২০ জুলাই: শিক্ষামন্ত্রী

শিক্ষামন্ত্রী বলেন, এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষার ফল ২০ জুলাই প্রকাশের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। এ সময় তিনি জানান, জাতীয় শিক্ষাক্রম পরিমার্জনের কাজ চলমান রয়েছে। আগামী বছর শিক্ষাক্রমে চারটি নতুন বিষয় যুক্ত করা হবে। আর ২০২৮ সাল থেকে সংশোধিত শিক্ষাক্রম বাস্তবায়নের পরিকল্পনা রয়েছে।

৫ ঘণ্টা আগে

দেশে প্রায় সব ধরনের অপরাধ কমেছে, দাবি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর

সোমবার (৮ জুন) সচিবালয়ের সম্মেলনকক্ষে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের পর গত তিন মাসের অপরাধসংক্রান্ত তথ্য ২০২৫ সালের একই সময়ের সঙ্গে তুলনা করে এ চিত্র পাওয়া গেছে।

৬ ঘণ্টা আগে

ড. ইউনূসসহ ৫ জনের বিরুদ্ধে করা মামলার আবেদন খারিজ আদালতের

সোমবার (৮ জুন) ঢাকার অতিরিক্ত চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট জশিতা ইসলামের আদালত মামলা গ্রহণ করার মতো উপাদান না থাকায় এ আদেশ দেন। সংশ্লিষ্ট আদালতের বেঞ্চ সহকারী আশুতোষ বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।

৭ ঘণ্টা আগে

ড. ইউনূসসহ ৫ জনের বিরুদ্ধে মামলার আবেদন এমপি মজিবুরের

সোমবার (৮ জুন) ঢাকার অতিরিক্ত চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট জশিতা ইসলামের আদালতে কিশোরগঞ্জ-৫ (বাজিতপুর-নিকলী) আসনের সংসদ সদস্য শেখ মজিবুর রহমান ইকবাল এ আবেদন করেন।

৮ ঘণ্টা আগে