পহেলা বৈশাখ: ইতিহাস-ঐতিহ্যে বাঙালির মহামিলন, বর্ষবরণে প্রস্তুত গোটা দেশ

প্রতিবেদক, রাজনীতি ডটকম
পহেলা বৈশাখের মঙ্গল শোভাযাত্রা, যা এ বছর পালন করা হবে ‘বৈশাখী শোভাযাত্রা’ হিসেবে। রাজনীতি ডটকম ফাইল ছবি

আজ পহেলা বৈশাখ। পুরোনো বছরের গ্লানি মুছে নতুন প্রত্যাশা, নতুন স্বপ্ন আর অসাম্প্রদায়িক চেতনার দীপ্ত শপথ নিয়ে বাংলা নববর্ষ ১৪৩৩ বরণে প্রস্তুত গোটা দেশ। রমনার বটমূল থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা, জেলা-উপজেলার বৈশাখী মেলা থেকে গ্রামীণ জনপদের হালখাতা— সবখানেই এখন নতুন সূর্যোদয়ের প্রতীক্ষা।

এবারের বর্ষবরণে ইতিহাস-ঐতিহ্যের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে শোভাযাত্রার নাম পরিবর্তন, চারুকলার নতুন মোটিফ, বিশ্বশান্তির বার্তা ও নজিরবিহীন নিরাপত্তা ব্যবস্থা। ‘নববর্ষের ঐকতান, গণতন্ত্রের পুনরুত্থান’ স্লোগানে বাংলা বর্ষপঞ্জির নতুন অধ্যায়ে রয়েছে নতুন দিনের প্রত্যাশাও। ফলে পহেলা বৈশাখ আবারও হয়ে উঠছে বাঙালির আত্মপরিচয়, সংস্কৃতি ও জাতীয় ঐক্যের এক মহাউৎসব।

আকবরের ফসলি সন থেকে আজকের বঙ্গাব্দ

বাংলা নববর্ষের শেকড় প্রোথিত রয়েছে মুঘল সম্রাট আকবরের প্রশাসনিক সংস্কারে। কৃষিনির্ভর বাংলায় হিজরি চান্দ্রবর্ষের সঙ্গে ফসল কাটার সময়ের অসামঞ্জস্য দূর করতে ১৫৮৪ সালে তিনি রাজজ্যোতির্বিদ সৈয়দ মীর ফতুল্লাহ শিরাজীকে নতুন বর্ষপঞ্জি প্রণয়নের নির্দেশ দেন।

হিন্দু সৌরবর্ষ, হিজরি সন ও আকবরের সিংহাসন আরোহণের বছরকে সমন্বয় করে তৈরি হয় ফসলি সন, যা পরবর্তীকালে বঙ্গাব্দ নামে পরিচিতি পায়।

শুরুতে এটি ছিল রাজস্ব আদায়ের সুবিধাজনক পদ্ধতি। কিন্তু সময়ের প্রবাহে কৃষকের খাজনা, ব্যবসায়ীর হালখাতা, জমিদারের পুণ্যাহ থেকে তা ছড়িয়ে পড়ে বাঙালির লোকজ জীবন ও সংস্কৃতির প্রতিটি স্তরে।

উৎসব থেকে আত্মপরিচয়: প্রতিরোধের সাংস্কৃতিক ভাষা

মুঘল আমল পেরিয়ে ব্রিটিশ যুগে বাংলা সন সাংস্কৃতিক আত্মপরিচয়ের প্রতীক হয়ে ওঠে। কলকাতার জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়িতে উনিশ শতকে আধুনিক পহেলা বৈশাখ উদযাপনের সূচনা নতুন মাত্রা যোগ করে। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘এসো হে বৈশাখ’ আজও নববর্ষের অনিবার্য আহ্বান।

পাকিস্তানি সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের বিরুদ্ধে ১৯৬৭ সালে বাংলা সংস্কৃতির প্রতি নিবেদিত প্রতিষ্ঠান ‘ছায়ানট’ রমনার বটমূলে বর্ষবরণ আয়োজন করে। পরে ১৯৫২-এর ভাষা আন্দোলন ও ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধের চেতনার ধারাবাহিকতায় পহেলা বৈশাখ হয়ে ওঠে অসাম্প্রদায়িক বাঙালি জাতীয়তাবাদের প্রতীক।

‘মঙ্গল’ থেকে ‘বৈশাখী’: নাম বদলে নতুন বিতর্ক

এবারের বর্ষবরণে সবচেয়ে আলোচিত বিষয় ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’র নাম পরিবর্তন। সরকারের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী এবার থেকে এটি ‘বৈশাখী শোভাযাত্রা’ নামে অনুষ্ঠিত হবে।

সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের ভাষ্য, নববর্ষের শোভাযাত্রা সর্বস্তরের মানুষের উৎসব; তাই নামেও সেই সর্বজনীনতা প্রতিফলিত হওয়া প্রয়োজন। তবে চারুকলার ঐতিহ্যবাহী মুখোশ, লোকজ মোটিফ, শিল্পরীতি ও শোভাযাত্রার কাঠামোতে কোনো পরিবর্তন থাকছে না।

ইউনেস্কোর অমূর্ত সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের তালিকায় অবশ্য এটি এখনো ‘Mangal Shobhajatra on Pahela Baishakh’ নামেই অন্তর্ভুক্ত রয়েছে, সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে বিষয়টি ইউনেস্কোকে জানাবে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

ঢাবির চারুকলায় রঙ-তুলির ব্যস্ততা, মোটিফে ‘শান্তির পায়রা’

গত কয়েকদিন ধরেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদ ছিল উৎসবের সবচেয়ে প্রাণচঞ্চল আবহে ভরপুর। দিনরাত এক করে শিক্ষার্থীরা তৈরি করেছেন বিশাল মুখোশ, পাখি, পেঁচা, বাঘ, পালকি, ঢেঁকি ও নানা লোকজ মোটিফ। এবারের মূল প্রতীক ‘শান্তির পায়রা’। বিশ্ব জুড়ে যুদ্ধ-সংকটের প্রেক্ষাপটে এই মোটিফের মাধ্যমে শান্তির বার্তা তুলে ধরা হচ্ছে।

শোভাযাত্রার পাশাপাশি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে থাকবে যেমন খুশি তেমন সাজো, লাঠিখেলা, ধুয়া গান, বাউল পরিবেশনা, কবিতা, গম্ভীরা, গ্রামীণ ক্রীড়া, পুতুলনাচ, বায়োস্কোপ, নাগরদোলা ও মেলা। চারুকলার শিল্পীদের ভাষায়, বৈশাখ কেবল আনন্দ নয়— এটি বাংলার ঐতিহ্য, প্রতিবাদ ও মানবিকতার শিল্পভাষা।

রাজধানী জুড়ে বর্ষবরণ: বটমূল, চারুকলা, মেলা

আজ ভোর ৬টা ১৫ মিনিটে রমনার বটমূলে ছায়ানটের বর্ষবরণ শুরু হবে। সকাল ৯টায় চারুকলা থেকে বের হবে বৈশাখী শোভাযাত্রা, যা শাহবাগ, টিএসসি, দোয়েল চত্বর ঘুরে আবার চারুকলায় ফিরবে।

রাজধানীর পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয়, জেলা শহর, উপজেলা, গ্রামবাংলার হাট-মাঠেও বসবে বৈশাখী মেলা। থাকবে হালখাতা, মিষ্টিমুখ, পান্তা-ইলিশ, লোকসংগীত, ঘুড়ি উৎসব, নাগরদোলা, গরুর গাড়ি ও পালকির আয়োজন।

নববর্ষ উদযাপনকে কেন্দ্র করে এবার রাজধানীসহ সারা দেশে ফানুস উড়ানো, আতশবাজি ফোটানো, গ্যাস বেলুন ছাড়া এবং ভুভুজেলা বাজানো সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করেছে সরকার। একই সঙ্গে মুখে মুখোশ পরার ওপরও নিষেধাজ্ঞা জারি হয়েছে— তবে হাতে বহন করা যাবে।

ডিএমপির নজিরবিহীন নিরাপত্তা

উৎসব ঘিরে রাজধানীতে ব্যাপক নিরাপত্তা পরিকল্পনা নিয়েছে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি)। পুরো ঢাকা মহানগরীকে ৯টি সেক্টর ও ১৪টি সাব-সেক্টরে ভাগ করা হয়েছে। রমনা, সোহরাওয়ার্দী উদ্যান ও বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় থাকবে ১৪টি ব্যারিকেড পয়েন্ট।

প্রতিটি প্রবেশপথে আর্চওয়ে, হ্যান্ড মেটাল ডিটেক্টর, সিসিটিভি, ড্রোন, ভিডিও নজরদারি, পর্যবেক্ষণ টাওয়ার, ছাদে বিশেষ ফোর্স এবং সাদা পোশাকের টিম মোতায়েন থাকবে।

ইভটিজিং, পকেটমার ও ছিনতাই ঠেকাতে আলাদা টহল দল কাজ করবে। গুজব প্রতিরোধে জোরদার করা হয়েছে সাইবার পেট্রোলিং। এ ছাড়া সন্ধ্যা ৬টার মধ্যে সব অনুষ্ঠান শেষ করার নির্দেশনা দিয়েছে ডিএমপি।

দেশ জুড়ে র‌্যাবের ৩০৮ টহল টিম

র‍্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‌্যাব) জানিয়েছে, পহেলা বৈশাখ উপলক্ষ্যে দেশব্যাপী ১৫টি ব্যাটালিয়ন দায়িত্ব পালন করবে। সার্বক্ষণিক নজরদারিতে থাকবে মোট ৩০৮টি টহল টিম, যার মধ্যে ১৮১টি পিকআপ প্যাট্রল ও ১২৭টি মোটরসাইকেল টিম।

বোম্ব ডিসপোজাল ইউনিট, ডগ স্কোয়াড, চেকপোস্ট, পর্যবেক্ষণ পোস্ট, স্পেশাল কমান্ডো ফোর্স এবং সাইবার মনিটরিং টিম প্রস্তুত রাখা হয়েছে। নারীদের নিরাপত্তা ও হয়রানি প্রতিরোধেও বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।

বৈশাখের মূল শক্তি: অসাম্প্রদায়িক মিলনমেলা

পহেলা বৈশাখের সবচেয়ে বড় শক্তি এর অসাম্প্রদায়িক চরিত্র। ধর্ম-বর্ণ-পেশা নির্বিশেষে সবাই এই উৎসবে মিলিত হয় এক অভিন্ন বাঙালি পরিচয়ে। গ্রামের মেলায় যেমন মাটির পুতুল, নাগরদোলা আর পান্তাভাতের ঘ্রাণ; তেমনি শহরের রাজপথে লাল-সাদা পোশাক, গান, মুখোশ আর শোভাযাত্রার শিল্পভাষা— সব মিলিয়ে এটি জাতির আত্মপরিচয়ের পুনরাবৃত্ত শপথ।

সম্রাট আকবরের প্রশাসনিক প্রয়োজনে শুরু হওয়া যে বর্ষপঞ্জি, তা আজ বাঙালির ইতিহাস, সংস্কৃতি, প্রতিরোধ ও মানবিকতার সবচেয়ে বড় মিলনমেলায় রূপ নিয়েছে। পহেলা বৈশাখ তাই কেবল নতুন বছর নয়; এটি বাঙালির চিরায়ত পুনর্জাগরণের দিন।

ad
ad

খবরাখবর থেকে আরও পড়ুন

হাম ও উপসর্গে আরও ১০ শিশুর প্রাণহানি

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, গত ২৪ ঘণ্টায় মারা যাওয়া ১০ শিশুর মধ্যে আটজনের মৃত্যু হয়েছে হামের উপসর্গ নিয়ে। বাকি দুই শিশুর শরীরে নিশ্চিতভাবে হামের সংক্রমণ শনাক্ত হয়েছে।

২১ ঘণ্টা আগে

চলে গেলেন সাবেক সচিব এম মুনির-উজ-জামান

মুনির-উজ-জামানের মৃত্যুতে দেশ একজন দেশপ্রেমিক ও প্রজ্ঞাবান আমলা এবং কূটনীতিককে হারাল। দীর্ঘ কর্মজীবনে দেশের প্রশাসন ও কূটনৈতিক অঙ্গনে তিনি গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে গেছেন।

১ দিন আগে

পরীক্ষার সময় বিস্ফোরিত ব্লু অরিজিনের রকেট, নাসার চন্দ্র পরিকল্পনা চাপে

ঘটনার পর জেফ বেজোস সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জানান, কোম্পানির সব কর্মী নিরাপদ আছেন এবং কেউ আহত হননি। তবে তিনি একে ‘খুব কঠিন দিন’ বলে উল্লেখ করেন।

১ দিন আগে

আদ-দ্বীনে ৬ নবজাতকের মৃত্যু: দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে আইনি নোটিশ

অভিযোগ রয়েছে, এমন সংকটময় পরিস্থিতির মধ্যেও পর্যাপ্ত জরুরি চিকিৎসা, সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ ও তাৎক্ষণিক চিকিৎসা সহায়তা নিশ্চিত করা হয়নি। দায়িত্বপ্রাপ্ত চিকিৎসা কর্মীদের উপস্থিতি ও তৎপরতা পর্যাপ্ত ছিল না এবং সংকটাপন্ন নবজাতকদের দ্রুত উন্নত চিকিৎসা বা উপযুক্ত চিকিৎসা কেন্দ্রে স্থানান্তরেও দেরি হয়।

১ দিন আগে