মার্কিন টিআইপি রিপোর্ট: মানবপাচারে এখনো ‘টায়ার-২’তে বাংলাদেশ

মানবপাচার নির্মূলে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড পূরণে এখনো পুরোপুরি সফল হয়নি বাংলাদেশ। তবে এ ক্ষেত্রে সরকারের প্রচেষ্টা আগের তুলনায় বেড়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের ‘ট্রাফিকিং ইন পারসন্স (টিআইপি) রিপোর্টে’ বাংলাদেশের অবস্থান তুলে ধরে এসব তথ্য জানানো হয়েছে। প্রতিবেদনে বাংলাদেশকে মানবপাচার প্রতিরোধে ‘টায়ার-২’ বা দ্বিতীয় স্তরে রাখা হয়েছে।
বৃহস্পতিবার (৮ অক্টোবর) প্রকাশিত ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মানবপাচার নির্মূলে সরকারের উদ্যোগ বাড়লেও বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে এখনো ঘাটতি রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে পাচারকারীদের দোষী সাব্যস্ত করার হার কমে যাওয়া, ভুক্তভোগীদের শনাক্তকরণ ও পুনর্বাসনে সীমাবদ্ধতা এবং অভ্যন্তরীণ মানবপাচার প্রতিরোধে পর্যাপ্ত পদক্ষেপের অভাব।
মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত হয়েছে ‘ট্রাফিকিং ইন পারসন্স (টিআইপি)’ শীর্ষক প্রতিবেদনটি। এতে বলা হয়, মানবপাচারের সর্বোচ্চ ঝুঁকিতে থাকা ‘টায়ার-৩’ শ্রেণিভুক্ত ১০টি দেশে গত ২১ মাসে ৪১ হাজারের বেশি বাংলাদেশি কর্মসংস্থানের উদ্দেশ্যে গেছেন। ‘টায়ার ৩’ ভুক্ত তালিকায় স্থান পাওয়া ওই দশ দেশ হলো— কম্বোডিয়া, রাশিয়া, লাওস, কঙ্গো, বেলারুশ, সুদান, সোমালিয়া, দক্ষিণ সুদান, লিবিয়া ও ইয়েমেন।
আন্তর্জাতিকভাবে মানবপাচার প্রতিরোধ, ভুক্তভোগীদের সুরক্ষা এবং অপরাধীদের বিচারের আওতায় আনার ক্ষেত্রে বিভিন্ন দেশের অগ্রগতি মূল্যায়ন করে টিআইপি রিপোর্ট। এতে ‘টায়ার-৩’ বলতে এমন দেশগুলোকে বোঝানো হয়, যেসব দেশের সরকার মানবপাচার নির্মূলে ন্যূনতম আন্তর্জাতিক মানদণ্ড পূরণ করে না এবং তা অর্জনে পর্যাপ্ত পদক্ষেপও নেয় না।
ঝুঁকিপূর্ণ ১০ দেশে গেছেন ৪১ হাজার কর্মী
এদিকে জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এসব দেশে গেছেন মোট ৪১ হাজার ২৩১ জন বাংলাদেশি কর্মী। এ পরিস্থিতিতে বিদেশগামী কর্মীদের নিরাপত্তা, নিয়োগপ্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা এবং ঝুঁকিপূর্ণ শ্রমবাজারে কর্মী পাঠানোর ক্ষেত্রে সরকারের মূল্যায়ন নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
বিএমইটির পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে দেখা গেছে, টিআইপি রিপোর্টে ‘টায়ার-৩’ হিসেবে চিহ্নিত ১০টি দেশের মধ্যে সবচেয়ে বেশি বাংলাদেশি কর্মী গেছেন কম্বোডিয়ায়। গত ২১ মাসে দেশটিতে পাড়ি জমিয়েছেন ১৫ হাজার ৯৬৩ জন। এরপর রয়েছে রাশিয়া, যেখানে গেছেন ৭ হাজার ৭৫২ জন। লাওসে গেছেন ৭ হাজার ৫৩২ জন।
অন্য দেশগুলোর মধ্যে কঙ্গোয় ৫ হাজার ৪৩৮ জন, বেলারুশে ৩ হাজার ৪৮৪ জন, সুদানে ৪২১ জন, সোমালিয়ায় ৩৪৩ জন, লিবিয়ায় ১৭২ জন, দক্ষিণ সুদানে ৬৯ জন এবং ইয়েমেনে ৫৭ জন বাংলাদেশি কর্মসংস্থানের উদ্দেশ্যে গেছেন।
মানবপাচার প্রতিরোধে অগ্রগতি, রয়ে গেছে ঘাটতি
টিআইপি রিপোর্টে বলা হয়েছে, আগের মূল্যায়নের তুলনায় বাংলাদেশ সরকার মানবপাচার প্রতিরোধে সামগ্রিক প্রচেষ্টা বাড়িয়েছে। এ ক্ষেত্রে আইনি কাঠামো শক্তিশালী করতে ‘মানবপাচার ও অভিবাসী পাচার প্রতিরোধ ও দমন অধ্যাদেশ ২০২৬’ জারি, তদন্ত ও বিচারপ্রক্রিয়া জোরদার, অপরাধ ও ভুক্তভোগী শনাক্তকরণের নির্দেশিকা হালনাগাদ এবং সুরক্ষা সেবায় ভুক্তভোগীদের পাঠানোর সমন্বয় বাড়াতে ডিজিটাল ন্যাশনাল রেফারেল মেকানিজম (এনআরএম) পরীক্ষামূলকভাবে চালুর বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে।
এ ছাড়া অভিবাসী শ্রমিকদের মানবপাচারের ঝুঁকি কমাতে সুরক্ষামূলক ব্যবস্থাও জোরদার করেছে সরকার। তবে এসব উদ্যোগ সত্ত্বেও কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে ন্যূনতম মানদণ্ড পূরণ করা সম্ভব হয়নি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, আগের তুলনায় কমসংখ্যক মানবপাচারকারীকে দোষী সাব্যস্ত করা হয়েছে। অভ্যন্তরীণ মানবপাচার দমনে পর্যাপ্ত পদক্ষেপের অভাবও রয়েছে। পাশাপাশি পাচারের শিকার মানুষের শনাক্তকরণ, সুরক্ষা ও পুনর্বাসন কার্যক্রমে ঘাটতি রয়ে গেছে। বিশেষ করে রোহিঙ্গা শরণার্থী এবং দেশে ফিরে আসা বাংলাদেশি অভিবাসী শ্রমিকদের ক্ষেত্রে এসব সীমাবদ্ধতার কথা তুলে ধরা হয়েছে।
নিয়োগ ফি ও শ্রমিক সুরক্ষা নিয়ে উদ্বেগ
বিদেশে কর্মী নিয়োগের ক্ষেত্রে শ্রমিকদের কাছ থেকে নিয়োগ ফি নেওয়ার সুযোগ এখনো বহাল থাকাকে মানবপাচারের ঝুঁকি বাড়ানোর অন্যতম কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে মার্কিন প্রতিবেদনটি। এ ধরনের ব্যয়ের কারণে অনেক অভিবাসী শ্রমিক ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়েন, যা তাদের শোষণ ও পাচারের ঝুঁকিতে ফেলতে পারে।
এ ছাড়া দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ও পশ্চিম এশিয়াসহ বিভিন্ন গন্তব্য দেশে বাংলাদেশি কর্মীদের নিরাপত্তা পর্যবেক্ষণ এবং তাদের সুরক্ষায় দূতাবাসগুলোর ভূমিকা আরও জোরদার করার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরা হয়েছে।
প্রতিবেদনে রোহিঙ্গা শিবিরগুলোতে মানবপাচারকারী চক্রের তৎপরতা এবং লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতার শিকার ব্যক্তিদের পুনর্বাসনে পর্যাপ্ত সুরক্ষার অভাবের বিষয়টিও উল্লেখ করা হয়েছে।
যেসব সুপারিশ করা হয়েছে
মানবপাচার প্রতিরোধে বাংলাদেশকে কয়েকটি পদক্ষেপ নেওয়ার সুপারিশ করেছে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর। এর মধ্যে রয়েছে শ্রমিকদের কাছ থেকে নেওয়া নিয়োগ ফি বাতিল, রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোর ওপর কঠোর নজরদারি, পাচারের শিকার ব্যক্তিদের দ্রুত শনাক্তকরণ এবং তাদের পর্যাপ্ত আইনি ও মানসিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা।
পাশাপাশি মানবপাচার-সংক্রান্ত ট্রাইব্যুনালগুলোর কার্যকারিতা বাড়ানোর ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। প্রতিবেদনের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, আইনি উদ্যোগের পাশাপাশি ভুক্তভোগীদের সুরক্ষা, অপরাধীদের বিচার এবং বিদেশগামী শ্রমিকদের নিয়োগপ্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ হয়ে রয়েছে।





















