‘সাইবার সুরক্ষা আইনের দায়সারা সংশোধন সরকারের জন্য আত্মঘাতী হতে পারে’

প্রতিবেদক, রাজনীতি ডটকম
রোববার সাইবার সুরক্ষা আইনের প্রস্তাবিত সংশোধনী নিয়ে আয়োজিত গোলটেবিল বৈঠকে বক্তব্য রাখেন টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান (বাঁয়ে) ও দৈনিক মানবজমিনের প্রধান সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরী। ছবি: সংগৃহীত
রোববার সাইবার সুরক্ষা আইনের প্রস্তাবিত সংশোধনী নিয়ে আয়োজিত গোলটেবিল বৈঠকে বক্তব্য রাখেন টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান (বাঁয়ে) ও দৈনিক মানবজমিনের প্রধান সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরী। ছবি: সংগৃহীত

প্রস্তাবিত সাইবার সুরক্ষা (সংশোধন) আইনে ক্ষমতাকে আরও কুক্ষিগত করার বিষয়টি প্রাধান্য পেয়েছে বলে মনে করছেন ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান।

তিনি বলেন, প্রস্তাবিত এই আইনে প্রাধান্য পেয়েছে কীভাবে ক্ষমতাকে আরও কুক্ষিগত করা যায়, কীভাবে বাকস্বাধীনতাকে নিয়ন্ত্রণের মধ্যে রাখা যায়। প্রস্তাবিত আইনটি সরকারের জন্যই বুমেরাং হবে। আত্মঘাতী হবে। সরকারের উচিত এই অবস্থান থেকে সরে আসা।

রোববার (১৮ অক্টোবর) সকালে রাজধানীর ধানমন্ডিতে টিআইবি কার্যালয়ে প্রস্তাবিত সাইবার সুরক্ষা (সংশোধন) আইন নিয়ে আয়োজিত এক গোলটেবিল বৈঠকে তিনি এ কথা বলেন। টিআইবি, ব্র্যাক, ব্লাস্ট, মহিলা পরিষদসহ মোট ১৯টি সংগঠন এ বৈঠক আয়োজন করে।

বৈঠকে বক্তারা জনগণের সুরক্ষা বিশেষ করে নারী ও শিশুদের সুরক্ষায় আইনটি সংশোধনের গুরুত্ব তুলে ধরে বলেন, এই সুরক্ষা দিতে গিয়ে বিষয়টি যেন অতিমাত্রায় বিতর্কিত না হয়ে পড়ে এবং অন্যের বাকস্বাধীনতা ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা যেন ক্ষুন্ণ না হয়।

প্রস্তাবিত আইনে সাংবাদিকদের হাত-পা বেঁধে ফেলার সুযোগ রাখা হয়েছে এবং এ কারণে ভবিষ্যতে সরকারকেই ক্ষতির মুখে পড়তে হতে পারে বলে সতর্ক করেছেন সংবাদপত্র মালিকদের সংগঠন নিউজপেপার্স ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (নোয়াব) সভাপতি ও মানবজমিনের প্রধান সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরীও।

তিনি বলেন, ক্ষমতাসীন সরকাররা সমালোচনার বিরুদ্ধে আইন করতে চায়, কিন্তু ক্ষমতা হারানোর পর তারাই অন্যায়ের শিকার হয়। দয়া করে আমাদের হাতটা আবার বাঁধবেন না। হাত বেঁধে দিলে আপনার ক্ষতি হবে। আপনার জন্য কিন্তু আমি আর লিখতে পারব না। আপনাকে একদিন আমাদের কাছে আবার আসতে হবে।

প্রস্তাবিত আইনে ব্যক্তির অপরাধের জন্য সংবাদপত্র বা অনলাইন সংবাদমাধ্যম বন্ধ করে দেওয়ার সুযোগ রাখা নিয়ে প্রশ্ন তুলে মতিউর রহমান চৌধুরী বলেন, একজন শরিফুজ্জামান পিন্টুর কারণে তো রাজনীতি ডটকম বন্ধ হতে পারে না। আমার অপরাধের জন্য তো মানবজমিন বন্ধ হতে পারে না। ব্যক্তির জন্য প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দেবে— এটা তো সরকারের উদ্দেশ্য থাকার কথা নয়।

রোববার টিআইবি কার্যালয়ে সাইবার সুরক্ষা আইনের প্রস্তাবিত সংশোধনী নিয়ে আয়োজিত গোলটেবিল বৈঠকে অংশগ্রহণকারীদের একাংশ। ছবি: ব্লাস্ট
রোববার টিআইবি কার্যালয়ে সাইবার সুরক্ষা আইনের প্রস্তাবিত সংশোধনী নিয়ে আয়োজিত গোলটেবিল বৈঠকে অংশগ্রহণকারীদের একাংশ। ছবি: ব্লাস্ট

সামাজিক মাধ্যমের সঙ্গে কাজ করতে হবে

সরকারের পক্ষ থেকে সাইবার সুরক্ষা আইন সংশোধনের পেছনে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অপতথ্য বা ভুয়া তথ্য রোধকে অন্যতম কারণ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। গোলটেবিল বৈঠকে অংশগ্রহণকারীরা এ বিষয়ে বরং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলোর সঙ্গেই প্রত্যক্ষভাবে কাজ করার আহ্বান জানান।

টিআইবির নির্বাহী পরিচালক বলেন, বিশ্বের যেসব দেশ অপতথ্য নিয়ন্ত্রণে সফল হয়েছে, তারা মেটার অ্যালগরিদমের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করেই অগ্রগতি অর্জন করেছে। সামাজিক মাধ্যমে অপতথ্য ও ভুয়া খবর ছড়ানোর পেছনে প্ল্যাটফর্মগুলোর বিপুল আর্থিক মুনাফার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

ড. ইফতেখারুজ্জামান আরও বলেন, ব্যবসা বাড়ানোর স্বার্থে মেটা সংঘাত ও সহিংসতামূলক বক্তব্যকে বেশি প্রচার করে, অথচ ধর্মনিরপেক্ষ বা যৌক্তিক আলোচনাকে সেন্সর করে। রাজনৈতিক ক্ষমতা ও প্রযুক্তি ব্যবসার অশুভ আঁতাতের ফলে নাগরিকদের মৌলিক অধিকার ক্ষুণ্ন হচ্ছে। প্ল্যাটফর্মের জবাবদিহিতা নিশ্চিত না করে সাধারণ নাগরিকদের ওপর আইন চাপিয়ে দেওয়া কোনো টেকসই সমাধান নয়।

মানবজমিনের প্রধান সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরীও সাইবার অপরাধ মোকাবিলায় আইনের প্রয়োজন আছে বলে স্বীকার করেন। তবে এ ক্ষেত্রে সরকারের সমালোচনা ও সাইবার অপরাধকে আলাদা হিসেবে বিবেচনা করার পক্ষে মত দেন তিনি।

মতিউর রহমান বলেন, সব সরকারই বর্তমান নিয়ে চিন্তা করে, ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তা করে না। বাংলাদেশের অভিজ্ঞতা কিন্তু খুব তিক্ত। আমি নিজে ভিকটিম হয়েছি। যার আইন করেছেন, তারা ধরা পড়েছেন আরও বেশি। একটি গণতান্ত্রিক সমাজে সরকারের সমালোচনা হবেই। সরকারের সমালোচনা আর সাইবার অপরাধকে আলাদা করতে না পারলে কিন্তু বিপদ থাকবে।

সাংবাদিকদের বিচারের ক্ষেত্রে ভ্রাম্যমাণ আদালতকে ক্ষমতা দেওয়ারও বিরোধিতা করেন মতিউর রহমান চৌধুরী। বলেন, ভেজাল ওষুধ যারা তৈরি করেন, তাদের ধরার জন্য যে ভ্রাম্যমাণ আদালতকে ব্যবহার করা হয়, সেই আদালতের কাছে আপনি সাংবাদিকের বিচারের ক্ষমতা দিচ্ছেন! এইটা কী করে একটা গণতান্ত্রিক সমাজে চিন্তা করা যেতে পারে?

রাজনৈতিকভাবে বিভক্ত সমাজে অস্পষ্ট আইনি বিধানের অপপ্রয়োগের আশঙ্কার কথা তুলে ধরে বৈঠকে বক্তারা বলেন, সাইবার অপরাধ দমনের জন্য আইনে অপরাধের সুনির্দিষ্ট সংজ্ঞা থাকা অপরিহার্য। প্রস্তাবিত আইনে ‘মানহানি’, ‘হেয়প্রতিপন্ন করা’, ‘বুলিং’, ‘গুজব’ ও ‘অপতথ্য’-এর মতো শব্দের ব্যাপক বা অস্পষ্ট প্রয়োগ বৈধ মতপ্রকাশকে অপরাধ হিসেবে বিবেচনার ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

প্রস্তাবিত আইনে গুজব, অপতথ্য, জাতীয় নিরাপত্তা, জনশৃঙ্খলা, মানহানি কিংবা রাষ্ট্রের জন্য অপমানজনক বলে বিবেচিত তথ্য ব্লক বা অপসারণের ক্ষমতা প্রয়োগের ক্ষেত্রে নির্বাহী বিভাগের ব্যাপক বিবেচনামূলক ক্ষমতার ঝুঁকি রয়েছে বৈঠকে অভিমত তুলে ধরেন বক্তারা।

তারা বলেন, নাগরিকরা অনলাইনে কী দেখতে বা বলতে পারবেন, তা নির্ধারণে একতরফা ও অস্পষ্ট ক্ষমতা থাকলে এর অপব্যবহার রোধ করা কঠিন হতে পারে। এ কারণে তথ্য ব্লকের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা, লিখিত কারণ, বিচারিক অনুমোদন এবং কার্যকর প্রতিকারের ব্যবস্থা অপরিহার্য।

টিআইবি, ব্র্যাক, ব্লাস্ট ও মহিলা পরিষদসহ ১৯টি সংগঠন যৌথভাবে এ গোলটেবিল বৈঠক আয়োজন করে। ছবি: ব্লাস্ট
টিআইবি, ব্র্যাক, ব্লাস্ট ও মহিলা পরিষদসহ ১৯টি সংগঠন যৌথভাবে এ গোলটেবিল বৈঠক আয়োজন করে। ছবি: ব্লাস্ট

প্রস্তাবিত আইনে বিদ্যমান আইনের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সুরক্ষা বাদ দেওয়ার বিষয়টি বিশেষভাবে পুনর্বিবেচনার আহ্বান জানান বক্তারা।

  • বিদ্যমান আইনে ব্লক করা কনটেন্টের তথ্য জনসম্মুখে প্রকাশের সুযোগ রয়েছে। প্রস্তাবিত আইনে এ ব্যবস্থা বাদ দেওয়া হলে তথ্য ব্লকের সিদ্ধান্ত ও তার পরিধি সম্পর্কে জনসাধারণের জানার সুযোগ কমে যেতে পারে;
  • বিদ্যমান আইনে তথ্য ব্লক করার তিন দিনের মধ্যে ট্রাইব্যুনালের অনুমতি নেওয়ার বিধান রয়েছে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে অনুমতি না পাওয়া গেলে কিংবা ট্রাইব্যুনাল অনুমতি না দিলে ব্লক করা তথ্য স্বয়ংক্রিয়ভাবে অবমুক্ত করার ব্যবস্থাও রয়েছে। প্রস্তাবিত আইনে এ সুরক্ষা বাদ দিয়ে ব্লক করার পর সংক্ষুব্ধ ব্যক্তিকে সংশ্লিষ্ট এজেন্সি বা আদালতে আবেদন করার সুযোগ দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে আদালত সরকারপক্ষকে শুনানির সুযোগ দিয়ে আবেদন নিষ্পত্তি করবে। এই পরিবর্তনের ফলে তথ্য ব্লকের পর বিচারিক তদারকি পাওয়ার দায়িত্ব ও উদ্যোগ মূলত সংক্ষুব্ধ ব্যক্তির ওপর বর্তাতে পারে। অথচ তথ্য ব্লকের ফলে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান অনেক সময় সিদ্ধান্তটির কারণ, আইনি ভিত্তি কিংবা প্রতিকারের উপায় সম্পর্কেও পর্যাপ্ত তথ্য নাও পেতে পারে;
  • সংক্ষুব্ধ ব্যক্তির সংজ্ঞায় সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি, তার আইনি প্রতিনিধি বা পরিবারের সদস্যের পাশাপাশি অন্য কোনো স্বার্থসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকেও অন্তর্ভুক্ত করার প্রস্তাব রয়েছে। এ সংজ্ঞা অতিরিক্ত বিস্তৃত হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির সরাসরি অভিযোগ ছাড়াই তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে তথ্য ব্লক বা অপসারণের আবেদন করার সুযোগ তৈরি হতে পারে। এর ফলে রাজনৈতিক বা ব্যবসায়িক স্বার্থে অন্যের বক্তব্য নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। প্রভাবশালী ব্যক্তি নিজে সামনে না এসে স্বার্থসংশ্লিষ্ট অন্যদের মাধ্যমে এ ধরনের প্রক্রিয়া শুরু করতে পারেন;
  • তথ্য ব্লকের প্রক্রিয়ায় তথ্য মন্ত্রণালয়কে যুক্ত করা এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বাইরেও সরকার কর্তৃক ক্ষমতাপ্রাপ্ত অন্যান্য সংস্থা বা বাহিনীকে তথ্য ব্লকের ক্ষমতা দেওয়ার প্রস্তাব নির্বাহী ক্ষমতার পরিধি আরও বাড়াতে পারে। এ ক্ষেত্রে ক্ষমতার সুনির্দিষ্ট সীমা, সিদ্ধান্ত গ্রহণের মানদণ্ড এবং স্বাধীন পর্যালোচনার ব্যবস্থা থাকা জরুরি।

গোলটেবিল বৈঠকে প্রস্তাবিত আইনের খসড়ার বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন টেক গ্লোবাল ইনস্টিটিউটের প্রধান ফৌজিয়া আফরোজ ও সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ও ব্লাস্টের উপদেষ্টা প্রিয়া আহসান চৌধুরী।

বৈঠকে ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের (ডিইউজে) সভাপতি শহিদুল ইসলাম, ডেইলি ওয়াদার সম্পাদক শফিকুল আলম, অনলাইন এডিটরস ফোরামের আহ্বায়ক ও রাজনীতি ডটকমের সম্পাদক শরিফুজ্জামান পিন্টু, ইন্ডিপেন্ডেন্ট টেলিভিশনের প্রধান বার্তা সম্পাদক মোস্তফা আকমল, আরটিভির বার্তা প্রধান ইলিয়াস হোসেন, এবি নিউজ টুয়েন্টিফোর বিডির সম্পাদক শাহীন চৌধুরীসহ অন্যরা বক্তব‍্য রাখেন।

Ad
ad
Ad 300x250

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

Ad 300x250
ad
Advertisement