সোহেল-স্বপ্নার মৃত্যুদণ্ডের রায়ে ট্রাইব্যুনালের পর্যবেক্ষণ

‘মামলার প্রতিটি পৃষ্ঠা ন্যায়বিচারের প্রত্যাশায় পরিপূর্ণ’

প্রতিবেদক, রাজনীতি ডটকম
আপডেট : ০৭ জুন ২০২৬, ১৫: ৫৬
মামলার প্রধান আসামি সোহেল রানা ও (ইনসেটে) শিশু রামিসা আক্তার। ফাইল ছবি

রামিসা ধর্ষণ ও হত্যার আলোচিত মামলায় আসামি সোহেল রানা ও তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তারকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন আদালত। রায় ঘোষণার সময় পর্যবেক্ষণে বিচারক বলেন, ‘শিশু ধর্ষণ ও হত্যাকাণ্ডের মামলাটি শুধু একটি ফৌজদারি বিচারিক কার্যক্রম নয়; এটি সমাজের বিবেক, মানবতা, আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থা এবং আইনের শাসনের প্রতি এক গভীর ও কঠিন পরীক্ষা। এই মামলার প্রতিটি পৃষ্ঠা বেদনা, ক্ষোভ, উদ্বেগ এবং ন্যায়বিচারের প্রত্যাশায় পরিপূর্ণ’

রোববার (৭ জুন) সকাল ১১টার দিকে ঢাকা মহানগর শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মাসরুর সালেকীন বহুল আলোচিত এই মামলার রায় ঘোষণা করেন। রায় ঘোষণার আগে দুই আসামিকে ট্রাইব্যুনালের কাঠগড়ায় হাজির করা হয়।

রায় ঘোষণার সময় বিচারক পর্যবেক্ষণে বলেন, ‘একটি নিষ্পাপ শিশুর জীবন নির্মমভাবে নিভিয়ে দেওয়ার অধিকার কারও নেই।’ট্রাইব্যুনাল বলেন, শিশুদের নিরাপত্তা, মর্যাদা ও সুরক্ষা নিশ্চিত করা একটি সভ্য ও মানবিক রাষ্ট্রের অন্যতম মৌলিক দায়িত্ব বলেও মন্তব্য করেন বিচারক।

এই ধরনের ঘটনা শুধু একটি পরিবারকে নয়, বরং সমগ্র সমাজকে গভীরভাবে আহত করে জানিয়ে রায়ের পর্যবেক্ষণে বিচারক বলেন, কোনো শিশু যৌন নির্যাতন, সহিংসতা কিংবা হত্যার মতো জঘন্য অপরাধের শিকার হলে তা শুধু একটি পরিবারকে নয়, সমগ্র সমাজকে গভীরভাবে আহত করে। একই সঙ্গে রাষ্ট্রের ন্যায়বিচার ব্যবস্থার কার্যকারিতাকেও প্রশ্নের মুখে দাঁড় করায়। দেশের প্রতিটি আদালতকে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় সঠিক দায়িত্ব পালন করতে হবে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।

ট্রাইব্যুনাল বলেন, শিশুদের প্রতি সংঘটিত সহিংসতা, যৌন নির্যাতন, শারীরিক নির্যাতন বা অন্যান্য গুরুতর অপরাধ-সংক্রান্ত প্রতিটি মামলার পেছনে থাকে একটি শিশুর অসহনীয় যন্ত্রণা এবং একটি পরিবারের দীর্ঘশ্বাস। সেই প্রেক্ষাপটে শিশুটির মামলাটি বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। কারণ, এ মামলায় তদন্ত, বিচারিক কার্যক্রম এবং সাক্ষ্য গ্রহণ প্রক্রিয়া তুলনামূলকভাবে দ্রুততার সঙ্গে সম্পন্ন হয়েছে।

স্বল্প সময়ের মধ্যে তদন্ত সম্পন্ন করায় আদালত সন্তোষ প্রকাশ করে বলেন, ‘তদন্তকারী সংস্থা স্বল্প সময়ের মধ্যে তদন্ত সম্পন্ন করে আদালতে প্রতিবেদন দাখিল করেছে। একইভাবে প্রসিকিউশন গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষীদের অল্প সময়ের মধ্যে আদালতের সামনে হাজির করে বিচারকার্য দ্রুত ও কার্যকরভাবে এগিয়ে নিতে ভূমিকা রেখেছে। ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় তদন্তকারী কর্মকর্তা, প্রসিকিউশন এবং সংশ্লিষ্ট সবার আন্তরিকতা ও পেশাদারত্ব প্রশংসার দাবিদার বলেও রায়ে উল্লেখ করা হয়।’

ট্রাইব্যুনাল আরও বলেন, শিশুটির মামলার মতো দ্রুত, দক্ষ, নিরপেক্ষ ও মানসম্মত তদন্ত এবং বিচারিক কার্যক্রম ভবিষ্যতে শিশু নির্যাতন ও সহিংসতা সংক্রান্ত অন্যান্য মামলায়ও অনুসরণীয় দৃষ্টান্ত হিসেবে বিবেচিত হওয়া উচিত। ভুক্তভোগী শিশু ও তাদের পরিবার যেন অযথা দীর্ঘসূত্রতা ও অনিশ্চয়তার মধ্যে না থাকে, সে লক্ষ্যে সংশ্লিষ্ট সব কর্তৃপক্ষকে একই ধরনের নিষ্ঠা, দক্ষতা ও দায়িত্বশীলতার পরিচয় দেওয়ার প্রত্যাশা করেন বিচারক।

ট্রাইব্যুনাল বলেন, একটি ন্যায়সংগত বিচার শুধু আদালতের একক প্রচেষ্টায় সম্ভব নয়; তদন্তকারী সংস্থা, প্রসিকিউশন, ডিফেন্স, সাক্ষী এবং বিচারব্যবস্থার সব অংশীজনের সম্মিলিত দায়িত্বশীল অংশগ্রহণের মাধ্যমেই ন্যায়বিচারের লক্ষ্য অর্জিত হয়।

রায়ের পর্যবেক্ষণে বলা হয়, ‘আদালতের দায়িত্ব আবেগ দ্বারা নয়, বরং আইন, প্রমাণ ও ন্যায়বিচারের নীতিমালার আলোকে সত্য উদ্‌ঘাটন করা। সাক্ষ্য-প্রমাণ, আলামত, চিকিৎসা প্রতিবেদন, মামলার কাগজপত্র এবং সার্বিক পরিস্থিতি অত্যন্ত সতর্কতা, সংবেদনশীলতা ও বিচারিক নিরপেক্ষতার সঙ্গে পর্যালোচনা করেই এ রায় দেওয়া হয়েছে।’

প্রসঙ্গত, গত ১৯ মে দুপুরে পল্লবীর ১১ নম্বর সেকশনের বি-ব্লকের একটি ভবনের ফ্ল্যাট থেকে শিশু রামিসার লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। রামিসা পরিবারের সঙ্গে পাশের ফ্ল্যাটে থাকত। রামিসার মরদেহ উদ্ধারের পরপরই পুলিশ ওই বাসা থেকে স্বপ্নাকে আটক করে। পরে সন্ধ্যায় সোহেলকে নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা থেকে গ্রেপ্তার করা হয়।

এ ঘটনায় রামিসার বাবা আব্দুল হান্নান মোল্লা দুজনকে আসামি করে সেদিনই পল্লবী থানায় মামলা করেন। পরদিন সোহেল দোষ স্বীকার করে আদালতে জবানবন্দি দেন। পরে তাকে কারাগারে পাঠানো হয়। স্বপ্নাকেও পাঠানো হয় কারাগারে।

এ ঘটনার মাত্র পাঁচ দিনের মাথায় ২৪ মে দুপুরে সোহেল ও স্বপ্নার বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র জমা দেন তদন্ত কর্মকর্তা। পরে ঢাকা মহানগর শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মাসরুর সালেকীন সেদিনই আসামিদের উপস্থিতিতে অভিযোগপত্র গ্রহণ করেন। তিনি অভিযোগ গঠনের শুনানির জন্য দিন রাখেন ১ জুন।

সেদিন আসামিদের অব্যাহতির আবেদন নাকচ করে বিচারক আসামি সোহেল রানা ও স্বপ্না আক্তারের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরুর আদেশ দেন। সাক্ষ্যগ্রহণের জন্য ২ জুন দিন রাখা হয়। সেদিন ১৭ জনের মধ্যে ১৬ জনের সাক্ষ্য নেওয়া হয়। পরদিন ৩ জুন আসামিদের আত্মপক্ষ শুনানিতে বিচারক আসামিদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ ও ১৬ জনের সাক্ষ্য পড়ে শোনান। স্বপ্না নিজেকে নির্দোষ দাবি করেন। সোহেল রানাও নিজেকে নির্দোষ দাবি করে ক্ষমা চান।

আত্মপক্ষ শুনানি শেষে ৪ জুন যুক্তিতর্ক উপস্থাপনের পর রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে দাবি করে সর্বোচ্চ সাজা মৃত্যুদণ্ড চান। আসামিপক্ষে রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবী আসামিদের লঘুদণ্ড প্রার্থনা করেন। যুক্তিতর্ক শেষে বিচারক রায় ঘোষণার জন্য আজ দিন ঠিক করে দেন।

রাজনীতি/আরআইআর

ad
ad

খবরাখবর থেকে আরও পড়ুন

সরকারের ১০০ দিনে ‘কিছু’ উদ্যোগ ইতিবাচক, সুশাসন নিয়ে ‘উদ্বেগ’ টিআইবির

সংবাদ সম্মেলনে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান অভিযোগ করেন, সরকারের কিছু পদক্ষেপ নির্বাচনী অঙ্গীকারের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। বিশেষ করে সিটি করপোরেশন ও ৪২টি জেলা পরিষদে দলীয় বিবেচনায় প্রশাসক নিয়োগের মাধ্যমে সরকার প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে ব্যর্থ হয়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।

২ ঘণ্টা আগে

রামিসা হত্যা: সোহেল-স্বপ্নার মৃত্যুদণ্ড, পর্যালোচনায় যা বললেন আদালত

আলোচিত এই মামলার ১৯ দিনের মাথায় আজ রোববার (৭ জুন) রায় ঘোষণা করলেন আদালত। রায়ে মৃত্যুদণ্ডের পাশাপাশি সোহেলকে পাঁচ লাখ টাকা এবং স্বপ্নাকে দুই লাখ টাকা অর্থদণ্ড দেওয়া হয়। এই জরিমানার টাকা রামিসার আইনগত উত্তরাধিকার পাবে।

৩ ঘণ্টা আগে

দক্ষ ও কর্মমুখী শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলার ওপর গুরুত্বারোপ প্রধানমন্ত্রীর

রোববার (৭ জুন) সকালে বাংলাদেশ চীন-মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় আয়োজিত 'কর্মমুখী ও টেকনিক্যাল শিক্ষা বিষয়ে শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ’ কার্যক্রমের উদ্বোধন অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে এ কথা বলেন।

৩ ঘণ্টা আগে

মৃত্যুদণ্ডের রায়ে সন্তুষ্ট রামিসার বাবা, দ্রুত কার্যকরের দাবি

আদালতের রায়ে তিনি সন্তুষ্ট এবং ন্যায়বিচার পেয়েছেন বলে মনে করেন। এ সময় তিনি দ্রুত রায় কার্যকরেরও দাবি জানান।

৩ ঘণ্টা আগে