গুমের পেছনে মূলত রাজনৈতিক উদ্দেশ্য ছিল: চূড়ান্ত প্রতিবেদনে কমিশন

প্রতিবেদক, রাজনীতি ডটকম
আপডেট : ০৪ জানুয়ারি ২০২৬, ২২: ৪৫

প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে চূড়ান্ত প্রতিবেদন জমা দিয়েছে গুম সংক্রান্ত কমিশন অব ইনকোয়ারি। কমিশনের সদস্যরা জানিয়েছেন, বলপূর্বক গুমের পেছনে মূলত রাজনৈতিক উদ্দেশ্য ছিল। বলে জানিয়েছেন। তারা বলেন, আমরা যে ডেটা পেয়েছি তা দিয়ে প্রমাণিত যে এটি পলিটিক্যালি মোটিভিটেড ক্রাইম।

রোববার (৪ জানুয়ারি) বিকেলে রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় প্রতিবেদন জমা দেয় কমিশন। এ সময় কমিশনের সভাপতি বিচারপতি মইনুল ইসলাম চৌধুরী, সদস্য বিচারপতি মো. ফরিদ আহমেদ শিবলী, নূর খান লিটন, নাবিলা ইদ্রিস ও সাজ্জাদ হোসেনসহ উপদেষ্টা আদিলুর রহমান খান ও প্রধান উপদেষ্টার মুখ্য সচিব সিরাজউদ্দিন মিয়া উপস্থিত ছিলেন।

কমিশনের বরাত দিয়ে প্রধান উপদেষ্টার উপপ্রেস সচিব আবুল কালাম আজাদ মজুমদার জানান, মোট ১ হাজার ৯১৩টি অভিযোগ গুম তদন্ত কমিশনে জমা পড়ে। এর মধ্যে যাচাই বাছাই শেষে ১ হাজার৫৬৯টি অভিযোগ সংজ্ঞা অনুযায়ী গুম হিসেবে বিবেচিত হয়েছে। এর মধ্যে ২৮৭টি অভিযোগ ‘মিসিং অ্যান্ড ডেড’ ক্যাটাগরিতে পড়েছে।

গুম কমিশনের পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদনটি দেখুন এখানে—

এখনো অনেকে অভিযোগ নিয়ে আসছেন জানিয়ে কমিশন সদস্য নাবিলা ইদ্রিস বলেন, ‘গুমের সংখ্যা চার থেকে ছয় হাজার হতে পারে। গুমের শিকার ব্যক্তিদের অনেকের সঙ্গে যোগাযোগ করলে তাদের মাধ্যমে আরও ভিক্টিমের খোঁজ পাওয়া যায় যারা আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেননি, আমাদের সম্পর্কে জানেন না কিংবা অন্য দেশে চলে গেছেন। এমন অনেকেই আছে যাদের সঙ্গে আমরা নিজ থেকে যোগাযোগ করলেও তারা অনরেকর্ড কথা বলতে রাজি হননি।’

প্রতিবেদন থেকে কমিশন জানায়, গুমের শিকার ব্যক্তিদের মধ্যে যারা জীবিত ফিরেছেন তাদের মধ্যে ৭৫ শতাংশ জামায়াত-শিবিরের নেতাকর্মী, ২২ শতাংশ বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মী। যারা এখনো নিখোঁজ তাদের মধ্যে ৬৮ শতাংশ বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মী ও ২২ শতাংশ জামায়াত-শিবিরের নেতাকর্মী।

হাই প্রোফাইল গুমের ঘটনায় তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, শেখ হাসিনার প্রতিরক্ষাবিষয়ক উপদেষ্টা মেজর জেনারেল (অব.) তারিক আহমেদ সিদ্দিক, তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান সরাসরি সম্পৃক্ত ছিল বলে প্রমাণ পাওয়া গেছে। এই মামলার মধ্যে উল্লেখযোগ্য বিএনপি নেতা ইলিয়াস আলী, হুম্মাম কাদের চৌধুরী, সালাহউদ্দিন আহমদ, চৌধুরী আলম, জামায়াত নেতা সাবেক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আবদুল্লাহিল আমান আযমী, ব্যারিস্টার মীর আহমদ বিন কাসেম, সাবেক রাষ্ট্রদূত মারুফ জামান।

কমিশনের সদস্যরা জানান, সাবেক প্রধানমন্ত্রী নিজে অনেকগুলো গুমের ক্ষেত্রে সরাসরি নির্দেশদাতা। তাছাড়া গুমের শিকার ব্যক্তিদের ভারতে রেন্ডিশনের (আইনি প্রক্রিয়া ছাড়াই গোপনে হস্তান্তর) যে তথ্য পাওয়া গেছে তাতে করে এটি স্পষ্ট হয় যে সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায়ের নির্দেশেই এগুলো হয়েছে।

অক্লান্ত পরিশ্রম ও দৃঢ় মনোবলের জন্য গুম তদন্ত কমিশনের সদস্যদের ধন্যবাদ জানিয়েছেন প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস। তিনি বলেন, এটি একটি ঐতিহাসিক কাজ। জাতির পক্ষ থেকে আমি এই কমিশনের সবাইকে ধন্যবাদ জানাচ্ছি। আপনারা যে ঘটনা বর্ণনা করলেন, পৈশাচিক বলে যে শব্দ আছে বাংলায়, এককথায় বললে এই ঘটনাগুলোকে সেই শব্দ দিয়েই বর্ণনা করা যায়। এই নৃশংস ঘটনার মধ্যদিয়ে যারা গিয়েছেন, আপনারাও তাদের সঙ্গে কথা বলার মধ্যদিয়ে, তাদের অভিজ্ঞতার মধ্যদিয়ে সেই নৃশংস ঘটনাগুলো দেখেছেন। দৃঢ় মনোবল ছাড়া এ কাজ সম্পন্ন করা যেতো না।

প্রধান উপদেষ্টা বলেন, বাংলাদেশের সব প্রতিষ্ঠানকে দুমড়ে-মুচড়ে দিয়ে গণতন্ত্রের লেবাস পরে মানুষের ওপর কী পৈশাচিক আচরণ করা যেতে পারে সেটার ডকুমেন্টেশন এই রিপোর্ট। মানুষ কত নিচে নামতে পারে, কত পৈশাচিক হতে পারে, কত বিভৎস হতে পারে- এইটা তার ডকুমেন্টেশন। যারা এই ভয়ংকর ঘটনা ঘটিয়েছে তারা আমাদের মতোই মানুষ। নৃশংসতম ঘটনা ঘটিয়ে তারা সমাজে স্বাভাবিক জীবনযাপন করছে। জাতি হিসেবে এই ধরনের নৃশংসতা থেকে আমাদের চিরতরে বের হয়ে আসতে হবে। এই নৃশংসতা যেন আর ফিরতে না পারে সেই প্রতিকারের পথ খুঁজে বের করতে হবে।

রিপোর্টগুলো সহজ ভাষায় মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন প্রধান উপদেষ্টা। এছাড়া কমিশনকে প্রয়োজনীয় সুপারিশমালা ও ভবিষ্যতের করণীয় পেশ করার বিষয়েও নির্দেশ দেন তিনি।

এছাড়া, আয়নাঘরের পাশাপাশি যেসব জায়গায় বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড ও লাশ গুমের ঘটনা ঘটেছে সে জায়গাগুলো ম্যাপিং করতে নির্দেশনা দিয়েছেন প্রধান উপদেষ্টা।

কমিশন জানায়, তদন্ত অনুযায়ী বরিশালের বলেশ্বর নদীতে সবচেয়ে বেশি হত্যাকাণ্ড ও লাশের গুমের ঘটনা ঘটেছে। শত শত গুমের শিকার ব্যক্তিকে হত্যা করে এই নদীতে ফেলে দেওয়া হয়েছে। এছাড়া বুড়িগঙ্গা নদী ও মুন্সিগঞ্জেও লাশ গুম করে ফেলার প্রমাণ তদন্তে পাওয়া গেছে।

প্রধান উপদেষ্টাকে বিশেষভাবে ধন্যবাদ জানান গুম তদন্ত কমিশনের সদস্যরা। প্রধান উপদেষ্টার দৃঢ় অবস্থান ছাড়া এ কাজ সম্পন্ন হতো না উল্লেখ করে তারা বলেন, আপনি দৃঢ় ছিলেন বলেই আমরা পেরেছি। আপনি সবসময় আমাদের যা কিছু প্রয়োজন ছিল সেই সহায়তা দিয়েছেন। আপনিই আমাদের মনোবল দৃঢ় করেছেন।

জাতীয় মানবাধিকার কমিশন পুর্নগঠন করে এই কাজগুলো এগিয়ে নিয়ে যেতে তারা প্রধান উপদেষ্টার কাছে আহ্বান জানান এবং ভিকটিমদের সুরক্ষা নিশ্চিতের ব্যাপারে সরকারকে ব্যবস্থা নিতে অনুরোধ করেন।

ad
ad

খবরাখবর থেকে আরও পড়ুন

রাবিতে ভর্তি পরীক্ষা শুক্রবার শুরু, তিন ইউনিটে পৌনে ৩ লাখ পরীক্ষার্থী

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি) ২০২৫-২৬ শিক্ষাবর্ষের স্নাতক প্রথম বর্ষের ভর্তি পরীক্ষা শুক্রবার (১৬ জানুয়ারি) শুরু হচ্ছে। জালিয়াতি ও প্রক্সি রোধে কঠোর অবস্থানের পাশাপাশি পরীক্ষার্থীদের সহায়তায় ব্যাপক প্রস্তুতি গ্রহণ করেছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন।

১২ ঘণ্টা আগে

এসএসসি পরীক্ষা শুরু ২১ এপ্রিল

চলতি বছরের মাধ্যমিক স্কুল সার্টিফিকেট (এসএসসি) ও সমমানের পরীক্ষার সময়সূচি প্রকাশ করেছে ঢাকা মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ড। সূচি অনুযায়ী পরীক্ষা শুরু হবে আগামী ২১ এপ্রিল।

১২ ঘণ্টা আগে

জুলাই গণঅভ্যুত্থানের দায়মুক্তি আইন অনুমোদন

আসিফ নজরুল বলেন, জুলাই-আগস্টে অভ্যুত্থানকারীদের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা থাকলে, তা প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত নিয়েছে অন্তর্বর্তী সরকার। এমনকি নতুন কোনো মামলা করা যাবে না বলেও জানান তিনি।

১৩ ঘণ্টা আগে

পরিবর্তন, সংস্কার চাইলে হ্যাঁ ভোট দিন: তথ্য উপদেষ্টা

তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান বলেছেন, আমাদের অবস্থানটা স্পষ্ট। আমরা মানুষকে বলব, যদি পরিবর্তন চান, সংস্কার চান, তাহলে গণভোটে অংশগ্রহণ করুন এবং হ্যাঁ ভোট দিন।

১৩ ঘণ্টা আগে