
ডেস্ক, রাজনীতি ডটকম

জুলাই অভ্যুত্থানের মুখে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নিলে বঙ্গভবনে কাটানো পরবর্তী দেড় বছরকে ‘দুঃসময়’ হিসেবে অভিহিত করেছেন রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন। এই সময়ের মধ্যে তাকে সব দিক থেকে যোগাযোগবিচ্ছিন্ন করে রাখা হয়েছিল বলে অভিযোগ করেছেন তিনি। বলেছেন, সাংবিধানিকভাবে তার অনুমোদনে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস দায়িত্বভার গ্রহণ করলেও কোনো বিষয়েই তিনি রাষ্ট্রপতির সঙ্গে যোগাযোগ করেননি।
এই সময়ের মধ্যে রাষ্ট্রপতিকে সরিয়ে দিতে রাজপথে আন্দোলনও হয়েছে। এ রকম ‘দুঃসময়ে’ নানা পক্ষের বিরোধিতার মধ্যেও বর্তমানে ক্ষমতাসীন বিএনপির শতভাগ সমর্থন পেয়েছেন বলে জানিয়েছেন রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন। বলেছেন, বিএনপি সবসসময় সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা অক্ষুণ্ণ রাখতে আন্তরিক ছিল।
জাতীয় দৈনিক কালের কণ্ঠকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে রাষ্ট্রপতি এসব কথা বলেছেন। কালের কণ্ঠের নির্বাহী সম্পাদক হায়দার আলী ও বিশেষ প্রতিনিধি জয়নাল আবেদীনের নেওয়া সাক্ষাৎকারটি সোমবার (২৩ ফেব্রুয়ারি) ছাপা হয়েছে।
রাষ্ট্রপতির পদত্যাগের দাবিতে বিভিন্ন দল ও সংগঠন যখন রাজপথে, সে সময়কার কথা তুলে ধরে রাষ্ট্রপতি সাক্ষাৎকারে বলেন, ‘আমি নির্দ্বিধায় বলতে পারি, ওই কঠিন সময়েও বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্ব আমার পাশে ছিলেন। তারা তখনো সংবিধানের ধারাবাহিকতা অক্ষুণ্ন রাখার বিষয়টি আমার কাছে স্পষ্ট ভাষায় ব্যক্ত করেছেন। বিশেষ করে বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে ঘিরে আমার মনের মধ্যে অনেক কৌতূহল জমা ছিল। কিন্তু আমি পর্যায়ক্রমে বুঝতে পারলাম, তিনি খুবই আন্তরিকতাপূর্ণ মানুষ। হি ওয়াজ সো কর্ডিয়াল! আমার দুঃসময়ে বিএনপির সহযোগিতা শতভাগ ছিল।’
২০২৪ সালের ২২ অক্টোবর রাষ্ট্রপতির পদত্যাগের দাবিতে বঙ্গভবন ঘেরাও করা হয়। এ প্রসঙ্গে রাষ্ট্রপতি বলেন, ‘আমাকে কতভাবে উপড়ে ফেলার চেষ্টা করা হয়েছে! কোনো পরিস্থিতিতেই আমি ভেঙে পড়িনি।... এখানে যখন ঘেরাও করল, সেনাবাহিনীর নবম ডিভিশন থেকে ফোর্স এসে তিন স্তরে নিরাপত্তা দিলো। তারপর ওই যে মেয়েটা, লাফ দিয়ে কাঁটাতারের বেড়ার ওপরে উঠে ঝাঁপ দেয়। কী আশ্চর্যের ব্যাপার! এগুলো ভাড়াটিয়া।’
রাষ্ট্রপতি বলেন, ‘ওই রাতটা আমার জন্য ছিল বিভীষিকাময়। এই যে ফ্লাইওভার, এই ফ্লাইওভার দিয়ে ওই পেছনে, ওদিকে খালি ঠেলাগাড়ি, ভ্যান, কাভার্ড ভ্যান দিয়ে চারদিকে ছিন্নমূল লোকজন আসে। গণভবনের মতো বঙ্গভবনও লুট করতে চেয়েছিল। আমরা তো ঘরেই ছিলাম। আমাদের তো আর কিছু নেই, এখান থেকে তো আমি পালাব না, তাই না? সেই অবস্থা যদি হতো, তখন একটা কথা ছিল। তিন স্তরের নিরাপত্তা দিয়ে কভার করা হয়েছে। সেনাবাহিনী খুব দৃঢ়তার সঙ্গে, আবার এপিসি দিয়ে ঠেলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নেয়।’
“রাত ১২টার সময় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতা, তখনকার তথ্য উপদেষ্টা নাহিদ ইসলাম ফোন করল, ‘এ রকম একটা খবর পাওয়া গেছে, ওরা আমাদের লোক না। আমি এ বিষয়ে প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে কথা বলেছি। এগুলো সব আমরা ডিসপার্স করার চেষ্টা করছি।’ তারপর দেখি, হ্যাঁ, কিছু স্থানীয় লোক এসে ওদের নিয়ে যায়। কিন্তু কিছু লোক আবার থেকে যায়। তাদের সরাতে রাত ২টা বেজেছে।’
জুলাই অভ্যুত্থানের নেতৃত্বস্থানীয়রাই ওই সময় রাষ্ট্রপতিকে অপসারণের দাবিকে রাজপথে জোরালো করতে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। পরে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে দীর্ঘ আলোচনার পর অন্তর্বর্তী সরকার সিদ্ধান্ত নেয়, রাজনৈতিক দলগুলো চাইলে রাষ্ট্রপতিকে অপসারণ করা হবে, না চাইলে নয়।
সাক্ষাৎকারে রাষ্ট্রপতি বলেন, ‘আমি বলব যে বিএনপি ও তাদের জোটসঙ্গীরা একটা গ্রুপ হয়ে যায়। আর আরেকটা গ্রুপ হয়ে যায়, তাদের আপনারা সবাই চেনেন। তবে তারা শেষ পর্যন্ত সফল হয়নি। উদ্যোগটা ব্যর্থ হলো বিএনপি ও তাদের জোটের কারণে। একটা বৃহত্তর রাজনৈতিক দল যে স্ট্যান্ডটা নিয়েছে, সেটাকে সরকার তখন সমর্থন করতে বাধ্য হলো।’
রাষ্ট্রপতিকে অপসারণের ওই দাবি পূরণ না হওয়ায় পরবর্তী সময়ে, অন্তর্বর্তী সরকারের একদম শেষ সময় পর্যন্ত অপসারণের চেষ্টা ছিল বলে সাক্ষাৎকারে জানান রাষ্ট্রপতি। তিনি বলেন, ‘বলতে গেলে শেষ সময় পর্যন্ত তারা চেষ্টা করে গেছে— কীভাবে আমাকে উপড়ে ফেলা যায়। রাজনৈতিক পর্যায় থেকে ওই উদ্যোগটা ব্যর্থ হলে খোদ অন্তর্বর্তী সরকারের পক্ষ থেকেই নতুন করে এ বিষয়ে পদক্ষেপ নেওয়া হয়। আজ বলতে দ্বিধা নেই, একটা অসাংবিধানিক উপায়ে একজন সাবেক প্রধান বিচারপতিকে নিয়ে এসে আমার জায়গায় বসানোর চক্রান্ত করেছে অন্তর্বর্তী সরকার। এই মুভটা হয়েছে।’
“আমি বিষয়টি জেনেছি। সরকারের পক্ষ থেকে একজন উপদেষ্টা ওই বিচারপতির শরণাপন্ন হয়েছিলেন। তারা ঘণ্টাব্যাপী মিটিং করেন। তবে ওই বিচারপতি রাজি হননি। উনি সাফ বলে দিয়েছিলেন, ‘উনি রাষ্ট্রপতি, উনি সবার ঊর্ধ্বে সাংবিধানিকভাবে, সবকিছুর ওপরে। ওই জায়গায় আমি অসাংবিধানিকভাবে বসতে পারি না।’ ওই বিচারপতির দৃঢ়তার কারণে শেষ পর্যন্ত সরকারের ওই উদ্যোগও ব্যর্থ হয়।”
রাষ্ট্রপতি পদে টিকে থাকার ঘটনায় একাধিকবার বিএনপির পূর্ণ সমর্থনের কথা সাক্ষাৎকারে তুলে ধরে মো. সহাবুদ্দিন। পাশাপাশি সশস্ত্র বাহিনীর সমর্থনের কথাও তুলে ধরেন তিনি। বলেন, “তিন বাহিনী আমাকে সর্বোচ্চ সমর্থন দিয়েছে। তারা শুধু একটা কথাই বলেছে, ‘মহামান্য, আপনি হচ্ছেন সশস্ত্র বাহিনীর প্রধান। আপনার পরাজিত হওয়া মানে পুরো সশস্ত্র বাহিনীরই পরাজিত হওয়া। এটা আমরা যেকোনো মূল্যে রোধ করব।’ শেষ পর্যন্ত তারা এটা করেছে। তারা বিভিন্ন সময় আমার কাছে এসে আমাকে মনোবল দিয়েছে।”
অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস রাষ্ট্রীয় কোনো ধরনের কার্যক্রমেই সমন্বয় করেননি বলে অভিযোগ করেছেন রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন। বলেছেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় জারি করা ১৩৩টি অধ্যাদেশের কোনোটি নিয়েই তার সঙ্গে কেউ আলোচনা করেননি। সরকারপ্রধানের বিদেশ সফরের পর রাষ্ট্রপতির সঙ্গে সাক্ষাতের বিধান থাকলেও অধ্যাপক ইউনূস সেটি কখনো অনুসরণ করেননি।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ঠিক আগে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের যে শুল্ক ও বাণিজ্য চুক্তি হয়েছে, সে বিষয়েও অবগত নন বলে জানান রাষ্ট্রপতি। তিনি বলেন, ‘এ রকম রাষ্ট্রীয় একটি চুক্তি অবশ্যই আমাকে জানানো দরকার ছিল। ছোটখাটো হোক আর বড় কিছু হোক, অবশ্যই পূর্ববর্তী সরকারপ্রধানরা রাষ্ট্রপতিকে জানিয়েছেন। এটি সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা। কিন্তু তিনি (প্রধান উপদেষ্টা) তো তা করেননি। মৌখিকভাবেও জানাননি, লিখিতভাবেও জানাননি। আসেনওনি। আর এমনিতেই তো উনার আসার কথা!’
গত দেড় বছরে প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে স্বাভাবিক সম্পর্ক বা সমন্বয় ছিল না জানিয়ে রাষ্ট্রপতি বলেন, ‘উনি যে প্রধান উপদেষ্টা হলেন, সেই প্রক্রিয়ার উৎসই ছিলাম আমি। অর্থাৎ, আমার উদ্যোগেই এই সরকার গঠনের প্রক্রিয়াটি শুরু হয়। কিন্তু প্রধান উপদেষ্টা পরবর্তী সময়ে আমার সঙ্গে সেভাবে সমন্বয় করেননি। তিনি একটিবারের জন্যও আমার কাছে আসেননি। আমাকে সম্পূর্ণভাবে আড়ালে রাখার চেষ্টা করে গেছেন।’
অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে কসোভো ও কাতারে দুটি অনুষ্ঠানে যোগ দেওয়ার আমন্ত্রণ পেয়েছিলেন রাষ্ট্রপতি। তবে সেসব অনুষ্ঠানে রাষ্ট্রপতি যেতে দেওয়া হয়নি। রাষ্ট্রপতি জানান, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে চিঠি ড্রাফট করে তার কাছে পাঠানো হয়, যেখানে লেখা ছিল যে তিনি ব্যস্ততার কারণে অনুষ্ঠানে যোগ দিতে পারছেন না। এই চিঠির বিষয়ে তার সঙ্গে কোনো আলোচনা করেনি সরকার। বরং ওই চিঠি হাতে পাওয়ার পর তিনি জানতে পারেন যে এ রকম একটি দাওয়াত পেয়েছিলেন।
রাষ্ট্রপতি বলেন, ‘একজন রাষ্ট্রপতি কি এত বেশি ব্যস্ত থাকে, আমাদের সংবিধানের আলোকে? যাই হোক, পরে আমি ওই চিঠিতে একটি প্রশ্নবোধক চিহ্ন দিয়ে পাল্টা একটি চিঠি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠাই। তাতে আমি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এমন শিষ্টাচারবহির্ভূত ও ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণের তীব্র নিন্দা জানাই। ভবিষ্যতে যেন এ ধরনের অপরাধ না করা হয়, সে বিষয়ে পররাষ্ট্র উপদেষ্টাকে চিঠি দিই। ওই চিঠির জবাবে তারা নিরুত্তর ছিল। তবে এরপর আর কোনো দেশ থেকে আমন্ত্রণ এসেছিল কি না, সে বিষয়ে জানার সুযোগও হয়নি।’
রাষ্ট্রপতি মনে করেন, তাকে অন্ধকারে রাখার উদ্দেশ্য থেকেই তাকে কোথাও যেতে দেওয়া হয়নি। কেবল বিদেশে নয়, দেশেও কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তনে তাকে অংশগ্রহণ করতে দেওয়া হয়নি। এর মধ্যে গত বছরের আগস্টে বিভিন্ন দেশে অবস্থিত বাংলাদেশের দূতাবাস থেকে রাষ্ট্রপতির ছবি অপসারণের নির্দেশ দেয় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিনের কাছে মনে হয়েছিল, এটি তাকে অপসারণের প্রথম ধাপ। পরবর্তী ধাপে হয়তো তাকে সরিয়ে দেওয়া হবে।
রাষ্ট্রপতি বলেন, ‘আমি পররাষ্ট্র উপদেষ্টা বরাবর একটি চিঠি দিয়েছিলাম। আমার মনের ক্ষোভ সেই চিঠির মধ্যে বর্ণনা করেছি। তো, ওই চিঠি পেয়ে পররাষ্ট্র উপদেষ্টা একটু চুপচাপ। সাংবাদিকরা প্রশ্ন করলে বলছে, এটা অনেক বড় বিষয়। আমি এ বিষয়ে আর কথা বলতে চাই না। নীরব ছিল।’ সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা বজায় রাখতেই তিনি সবকিছু সহ্য করে গেছেন বলে জানান তিনি।
রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন জানান, এর মধ্যে ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির (ডিআরইউ) নির্বাচনের পর নতুন কমিটি তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করলে এর জের ধরে তার প্রেস সেক্রেটারি, ডেপুটি প্রেস সেক্রেটারি ও অ্যাসিস্ট্যান্ট প্রেস সেক্রেটারিসহ তিনজনকেই প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়। এরপর থেকে রাষ্ট্রপতির কোনো প্রেস উইং নেই। ফলে জাতীয় কোনো ঘটনাতেও রাষ্ট্রপতি কোনো বাণী বা বার্তা বা বিজ্ঞপ্তি দিতে পারেননি।
অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদের দেড় বছরের কথা তুলে ধরে রাষ্ট্রপতি বলেন, ‘আমি দৃঢ়চিত্তে আমার সিদ্ধান্তে অবিচল ছিলাম। যে কারণে কোনো ষড়যন্ত্রই সফল হয়নি। বিশেষ করে অসাংবিধানিক উপায়ে রাষ্ট্রপতিকে উপড়ে ফেলার অসংখ্য ছক ব্যর্থ হয়েছে। ফলে দেড় বছর বঙ্গভবনের অভিজ্ঞতা যে ভালো, তা বলা যাবে না। আমার ওপর দিয়ে যে ঝড় গেছে, এ রকম ঝড় সহ্য করার মতো ক্ষমতা অন্য কারও ছিল কি না আমি জানি না।’

জুলাই অভ্যুত্থানের মুখে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নিলে বঙ্গভবনে কাটানো পরবর্তী দেড় বছরকে ‘দুঃসময়’ হিসেবে অভিহিত করেছেন রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন। এই সময়ের মধ্যে তাকে সব দিক থেকে যোগাযোগবিচ্ছিন্ন করে রাখা হয়েছিল বলে অভিযোগ করেছেন তিনি। বলেছেন, সাংবিধানিকভাবে তার অনুমোদনে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস দায়িত্বভার গ্রহণ করলেও কোনো বিষয়েই তিনি রাষ্ট্রপতির সঙ্গে যোগাযোগ করেননি।
এই সময়ের মধ্যে রাষ্ট্রপতিকে সরিয়ে দিতে রাজপথে আন্দোলনও হয়েছে। এ রকম ‘দুঃসময়ে’ নানা পক্ষের বিরোধিতার মধ্যেও বর্তমানে ক্ষমতাসীন বিএনপির শতভাগ সমর্থন পেয়েছেন বলে জানিয়েছেন রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন। বলেছেন, বিএনপি সবসসময় সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা অক্ষুণ্ণ রাখতে আন্তরিক ছিল।
জাতীয় দৈনিক কালের কণ্ঠকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে রাষ্ট্রপতি এসব কথা বলেছেন। কালের কণ্ঠের নির্বাহী সম্পাদক হায়দার আলী ও বিশেষ প্রতিনিধি জয়নাল আবেদীনের নেওয়া সাক্ষাৎকারটি সোমবার (২৩ ফেব্রুয়ারি) ছাপা হয়েছে।
রাষ্ট্রপতির পদত্যাগের দাবিতে বিভিন্ন দল ও সংগঠন যখন রাজপথে, সে সময়কার কথা তুলে ধরে রাষ্ট্রপতি সাক্ষাৎকারে বলেন, ‘আমি নির্দ্বিধায় বলতে পারি, ওই কঠিন সময়েও বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্ব আমার পাশে ছিলেন। তারা তখনো সংবিধানের ধারাবাহিকতা অক্ষুণ্ন রাখার বিষয়টি আমার কাছে স্পষ্ট ভাষায় ব্যক্ত করেছেন। বিশেষ করে বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে ঘিরে আমার মনের মধ্যে অনেক কৌতূহল জমা ছিল। কিন্তু আমি পর্যায়ক্রমে বুঝতে পারলাম, তিনি খুবই আন্তরিকতাপূর্ণ মানুষ। হি ওয়াজ সো কর্ডিয়াল! আমার দুঃসময়ে বিএনপির সহযোগিতা শতভাগ ছিল।’
২০২৪ সালের ২২ অক্টোবর রাষ্ট্রপতির পদত্যাগের দাবিতে বঙ্গভবন ঘেরাও করা হয়। এ প্রসঙ্গে রাষ্ট্রপতি বলেন, ‘আমাকে কতভাবে উপড়ে ফেলার চেষ্টা করা হয়েছে! কোনো পরিস্থিতিতেই আমি ভেঙে পড়িনি।... এখানে যখন ঘেরাও করল, সেনাবাহিনীর নবম ডিভিশন থেকে ফোর্স এসে তিন স্তরে নিরাপত্তা দিলো। তারপর ওই যে মেয়েটা, লাফ দিয়ে কাঁটাতারের বেড়ার ওপরে উঠে ঝাঁপ দেয়। কী আশ্চর্যের ব্যাপার! এগুলো ভাড়াটিয়া।’
রাষ্ট্রপতি বলেন, ‘ওই রাতটা আমার জন্য ছিল বিভীষিকাময়। এই যে ফ্লাইওভার, এই ফ্লাইওভার দিয়ে ওই পেছনে, ওদিকে খালি ঠেলাগাড়ি, ভ্যান, কাভার্ড ভ্যান দিয়ে চারদিকে ছিন্নমূল লোকজন আসে। গণভবনের মতো বঙ্গভবনও লুট করতে চেয়েছিল। আমরা তো ঘরেই ছিলাম। আমাদের তো আর কিছু নেই, এখান থেকে তো আমি পালাব না, তাই না? সেই অবস্থা যদি হতো, তখন একটা কথা ছিল। তিন স্তরের নিরাপত্তা দিয়ে কভার করা হয়েছে। সেনাবাহিনী খুব দৃঢ়তার সঙ্গে, আবার এপিসি দিয়ে ঠেলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নেয়।’
“রাত ১২টার সময় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতা, তখনকার তথ্য উপদেষ্টা নাহিদ ইসলাম ফোন করল, ‘এ রকম একটা খবর পাওয়া গেছে, ওরা আমাদের লোক না। আমি এ বিষয়ে প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে কথা বলেছি। এগুলো সব আমরা ডিসপার্স করার চেষ্টা করছি।’ তারপর দেখি, হ্যাঁ, কিছু স্থানীয় লোক এসে ওদের নিয়ে যায়। কিন্তু কিছু লোক আবার থেকে যায়। তাদের সরাতে রাত ২টা বেজেছে।’
জুলাই অভ্যুত্থানের নেতৃত্বস্থানীয়রাই ওই সময় রাষ্ট্রপতিকে অপসারণের দাবিকে রাজপথে জোরালো করতে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। পরে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে দীর্ঘ আলোচনার পর অন্তর্বর্তী সরকার সিদ্ধান্ত নেয়, রাজনৈতিক দলগুলো চাইলে রাষ্ট্রপতিকে অপসারণ করা হবে, না চাইলে নয়।
সাক্ষাৎকারে রাষ্ট্রপতি বলেন, ‘আমি বলব যে বিএনপি ও তাদের জোটসঙ্গীরা একটা গ্রুপ হয়ে যায়। আর আরেকটা গ্রুপ হয়ে যায়, তাদের আপনারা সবাই চেনেন। তবে তারা শেষ পর্যন্ত সফল হয়নি। উদ্যোগটা ব্যর্থ হলো বিএনপি ও তাদের জোটের কারণে। একটা বৃহত্তর রাজনৈতিক দল যে স্ট্যান্ডটা নিয়েছে, সেটাকে সরকার তখন সমর্থন করতে বাধ্য হলো।’
রাষ্ট্রপতিকে অপসারণের ওই দাবি পূরণ না হওয়ায় পরবর্তী সময়ে, অন্তর্বর্তী সরকারের একদম শেষ সময় পর্যন্ত অপসারণের চেষ্টা ছিল বলে সাক্ষাৎকারে জানান রাষ্ট্রপতি। তিনি বলেন, ‘বলতে গেলে শেষ সময় পর্যন্ত তারা চেষ্টা করে গেছে— কীভাবে আমাকে উপড়ে ফেলা যায়। রাজনৈতিক পর্যায় থেকে ওই উদ্যোগটা ব্যর্থ হলে খোদ অন্তর্বর্তী সরকারের পক্ষ থেকেই নতুন করে এ বিষয়ে পদক্ষেপ নেওয়া হয়। আজ বলতে দ্বিধা নেই, একটা অসাংবিধানিক উপায়ে একজন সাবেক প্রধান বিচারপতিকে নিয়ে এসে আমার জায়গায় বসানোর চক্রান্ত করেছে অন্তর্বর্তী সরকার। এই মুভটা হয়েছে।’
“আমি বিষয়টি জেনেছি। সরকারের পক্ষ থেকে একজন উপদেষ্টা ওই বিচারপতির শরণাপন্ন হয়েছিলেন। তারা ঘণ্টাব্যাপী মিটিং করেন। তবে ওই বিচারপতি রাজি হননি। উনি সাফ বলে দিয়েছিলেন, ‘উনি রাষ্ট্রপতি, উনি সবার ঊর্ধ্বে সাংবিধানিকভাবে, সবকিছুর ওপরে। ওই জায়গায় আমি অসাংবিধানিকভাবে বসতে পারি না।’ ওই বিচারপতির দৃঢ়তার কারণে শেষ পর্যন্ত সরকারের ওই উদ্যোগও ব্যর্থ হয়।”
রাষ্ট্রপতি পদে টিকে থাকার ঘটনায় একাধিকবার বিএনপির পূর্ণ সমর্থনের কথা সাক্ষাৎকারে তুলে ধরে মো. সহাবুদ্দিন। পাশাপাশি সশস্ত্র বাহিনীর সমর্থনের কথাও তুলে ধরেন তিনি। বলেন, “তিন বাহিনী আমাকে সর্বোচ্চ সমর্থন দিয়েছে। তারা শুধু একটা কথাই বলেছে, ‘মহামান্য, আপনি হচ্ছেন সশস্ত্র বাহিনীর প্রধান। আপনার পরাজিত হওয়া মানে পুরো সশস্ত্র বাহিনীরই পরাজিত হওয়া। এটা আমরা যেকোনো মূল্যে রোধ করব।’ শেষ পর্যন্ত তারা এটা করেছে। তারা বিভিন্ন সময় আমার কাছে এসে আমাকে মনোবল দিয়েছে।”
অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস রাষ্ট্রীয় কোনো ধরনের কার্যক্রমেই সমন্বয় করেননি বলে অভিযোগ করেছেন রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন। বলেছেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় জারি করা ১৩৩টি অধ্যাদেশের কোনোটি নিয়েই তার সঙ্গে কেউ আলোচনা করেননি। সরকারপ্রধানের বিদেশ সফরের পর রাষ্ট্রপতির সঙ্গে সাক্ষাতের বিধান থাকলেও অধ্যাপক ইউনূস সেটি কখনো অনুসরণ করেননি।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ঠিক আগে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের যে শুল্ক ও বাণিজ্য চুক্তি হয়েছে, সে বিষয়েও অবগত নন বলে জানান রাষ্ট্রপতি। তিনি বলেন, ‘এ রকম রাষ্ট্রীয় একটি চুক্তি অবশ্যই আমাকে জানানো দরকার ছিল। ছোটখাটো হোক আর বড় কিছু হোক, অবশ্যই পূর্ববর্তী সরকারপ্রধানরা রাষ্ট্রপতিকে জানিয়েছেন। এটি সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা। কিন্তু তিনি (প্রধান উপদেষ্টা) তো তা করেননি। মৌখিকভাবেও জানাননি, লিখিতভাবেও জানাননি। আসেনওনি। আর এমনিতেই তো উনার আসার কথা!’
গত দেড় বছরে প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে স্বাভাবিক সম্পর্ক বা সমন্বয় ছিল না জানিয়ে রাষ্ট্রপতি বলেন, ‘উনি যে প্রধান উপদেষ্টা হলেন, সেই প্রক্রিয়ার উৎসই ছিলাম আমি। অর্থাৎ, আমার উদ্যোগেই এই সরকার গঠনের প্রক্রিয়াটি শুরু হয়। কিন্তু প্রধান উপদেষ্টা পরবর্তী সময়ে আমার সঙ্গে সেভাবে সমন্বয় করেননি। তিনি একটিবারের জন্যও আমার কাছে আসেননি। আমাকে সম্পূর্ণভাবে আড়ালে রাখার চেষ্টা করে গেছেন।’
অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে কসোভো ও কাতারে দুটি অনুষ্ঠানে যোগ দেওয়ার আমন্ত্রণ পেয়েছিলেন রাষ্ট্রপতি। তবে সেসব অনুষ্ঠানে রাষ্ট্রপতি যেতে দেওয়া হয়নি। রাষ্ট্রপতি জানান, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে চিঠি ড্রাফট করে তার কাছে পাঠানো হয়, যেখানে লেখা ছিল যে তিনি ব্যস্ততার কারণে অনুষ্ঠানে যোগ দিতে পারছেন না। এই চিঠির বিষয়ে তার সঙ্গে কোনো আলোচনা করেনি সরকার। বরং ওই চিঠি হাতে পাওয়ার পর তিনি জানতে পারেন যে এ রকম একটি দাওয়াত পেয়েছিলেন।
রাষ্ট্রপতি বলেন, ‘একজন রাষ্ট্রপতি কি এত বেশি ব্যস্ত থাকে, আমাদের সংবিধানের আলোকে? যাই হোক, পরে আমি ওই চিঠিতে একটি প্রশ্নবোধক চিহ্ন দিয়ে পাল্টা একটি চিঠি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠাই। তাতে আমি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এমন শিষ্টাচারবহির্ভূত ও ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণের তীব্র নিন্দা জানাই। ভবিষ্যতে যেন এ ধরনের অপরাধ না করা হয়, সে বিষয়ে পররাষ্ট্র উপদেষ্টাকে চিঠি দিই। ওই চিঠির জবাবে তারা নিরুত্তর ছিল। তবে এরপর আর কোনো দেশ থেকে আমন্ত্রণ এসেছিল কি না, সে বিষয়ে জানার সুযোগও হয়নি।’
রাষ্ট্রপতি মনে করেন, তাকে অন্ধকারে রাখার উদ্দেশ্য থেকেই তাকে কোথাও যেতে দেওয়া হয়নি। কেবল বিদেশে নয়, দেশেও কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তনে তাকে অংশগ্রহণ করতে দেওয়া হয়নি। এর মধ্যে গত বছরের আগস্টে বিভিন্ন দেশে অবস্থিত বাংলাদেশের দূতাবাস থেকে রাষ্ট্রপতির ছবি অপসারণের নির্দেশ দেয় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিনের কাছে মনে হয়েছিল, এটি তাকে অপসারণের প্রথম ধাপ। পরবর্তী ধাপে হয়তো তাকে সরিয়ে দেওয়া হবে।
রাষ্ট্রপতি বলেন, ‘আমি পররাষ্ট্র উপদেষ্টা বরাবর একটি চিঠি দিয়েছিলাম। আমার মনের ক্ষোভ সেই চিঠির মধ্যে বর্ণনা করেছি। তো, ওই চিঠি পেয়ে পররাষ্ট্র উপদেষ্টা একটু চুপচাপ। সাংবাদিকরা প্রশ্ন করলে বলছে, এটা অনেক বড় বিষয়। আমি এ বিষয়ে আর কথা বলতে চাই না। নীরব ছিল।’ সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা বজায় রাখতেই তিনি সবকিছু সহ্য করে গেছেন বলে জানান তিনি।
রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন জানান, এর মধ্যে ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির (ডিআরইউ) নির্বাচনের পর নতুন কমিটি তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করলে এর জের ধরে তার প্রেস সেক্রেটারি, ডেপুটি প্রেস সেক্রেটারি ও অ্যাসিস্ট্যান্ট প্রেস সেক্রেটারিসহ তিনজনকেই প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়। এরপর থেকে রাষ্ট্রপতির কোনো প্রেস উইং নেই। ফলে জাতীয় কোনো ঘটনাতেও রাষ্ট্রপতি কোনো বাণী বা বার্তা বা বিজ্ঞপ্তি দিতে পারেননি।
অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদের দেড় বছরের কথা তুলে ধরে রাষ্ট্রপতি বলেন, ‘আমি দৃঢ়চিত্তে আমার সিদ্ধান্তে অবিচল ছিলাম। যে কারণে কোনো ষড়যন্ত্রই সফল হয়নি। বিশেষ করে অসাংবিধানিক উপায়ে রাষ্ট্রপতিকে উপড়ে ফেলার অসংখ্য ছক ব্যর্থ হয়েছে। ফলে দেড় বছর বঙ্গভবনের অভিজ্ঞতা যে ভালো, তা বলা যাবে না। আমার ওপর দিয়ে যে ঝড় গেছে, এ রকম ঝড় সহ্য করার মতো ক্ষমতা অন্য কারও ছিল কি না আমি জানি না।’

মির্জা ফখরুল বলেন, ‘স্থানীয় সরকার নির্বাচনে কতগুলো নিয়ম-কানুন আছে। সিটি করপোরেশন যেগুলো, তার মধ্যে কতগুলোর মেয়াদ আছে, কতগুলোর মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে। সবগুলোকে এক জায়গায় নিয়ে এসে আমরা সরকারের তরফ থেকে একটা সঠিক সময়ে নির্বাচনগুলোর ব্যবস্থা করব। নিঃসন্দেহে এই নির্বাচনকে প্রাধান্য দেওয়া হবে।’
১ ঘণ্টা আগে
স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রী এবং বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর জানালেন, এসব কার্যালয় খোলার বিষয়ে সরকারের সায় নেই। সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগ বিষয়টি দেখবে।
২ ঘণ্টা আগে
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান প্রথমবারের মতো ঢাকা সেনানিবাসে অবস্থিত সশস্ত্র বাহিনী বিভাগে অফিস করেছেন। আজ সোমবার (২৩ ফেব্রুয়ারি) সকাল ৯টায় প্রধানমন্ত্রী তার অফিসে পৌঁছান।
২ ঘণ্টা আগে
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটরের পদ থেকে মোহাম্মদ তাজুল ইসলামকে সরিয়ে নতুন চিফ প্রসিকিউটর হিসেবে আইনজীবী মো. আমিনুল ইসলামকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।
৩ ঘণ্টা আগে