আইসিইউ রোগীর ৪১ শতাংশে কাজ করছে না অ্যান্টিবায়োটিক

ডেস্ক, রাজনীতি ডটকম
আপডেট : ২৫ নভেম্বর ২০২৫, ১৩: ৩২
ছবি: সংগৃহীত

অতিরিক্ত ও ভুল ব্যবহারের কারণে অ্যান্টিবায়োটিকের কার্যকারিতা দ্রুত হ্রাস পাচ্ছে, যা জনস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক হুমকি সৃষ্টি করেছে। সরকারি একটি তথ্য অনুযায়ী, দেশের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) চিকিৎসাধীন রোগীদের ৪১ শতাংশের ক্ষেত্রে বর্তমানে কোনো অ্যান্টিবায়োটিকই কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারছে না।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া অ্যান্টিবায়োটিক সেবন এবং সম্পূর্ণ ডোজ শেষ না করার প্রবণতা এই 'অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স' বা অকার্যকারিতার প্রধান কারণ।

সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণাপ্রতিষ্ঠান আইইডিসিআর গতকাল সোমবার তাদের মহাখালী অফিসে বিশ্ব অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স (এএমআর) সচেতনতা সপ্তাহ উপলক্ষে এ তথ্য তুলে ধরে।

প্রতিষ্ঠানটির দেওয়া 'জাতীয় অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স (এএমআর) সার্ভিলেন্স' কার্যক্রমের সর্বশেষ প্রতিবেদনের তথ্য নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে। এটি বলছে, আইসিইউতে ভর্তি ১০ জনের মধ্যে ৪ জনের শরীরে অ্যান্টিবায়োটিক কাজ করছে না।

অ্যান্টিবায়োটিকের কার্যকারিতা সম্পর্কে জানার জন্য আইইডিসিআর ২০২৪ সালের জুলাই থেকে গত জুন পর্যন্ত ৯৬ হাজার ৪৭৭ জন রোগীর নমুনা পরীক্ষা করে এ প্রতিবেদন তৈরি করে। আইইডিসিআরের পরিচালক অধ্যাপক তাহমিনা শিরিন বলেন, এই প্রতিবেদন প্রকাশের মূল উদ্দেশ্য সচেতনতা বাড়ানো।

'ওয়াচ গ্রুপ' অ্যান্টিবায়োটিকের ব্যবহার গত বছর ছিল ৭৭ শতাংশ। এ বছর তা বেড়ে হয়েছে ৯১ শতাংশ। ওয়াচ গ্রুপ হলো দ্বিতীয় স্তরের অ্যান্টিবায়োটিক, যা প্রথম স্তরের ওষুধ কাজ না করলে ব্যবহার করার কথা। এই গ্রুপের ওষুধ অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স বাড়ার ঝুঁকি তৈরি করে। তাই এদের ব্যবহার কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রিত হওয়া উচিত।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) মতে, অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স তখনই ঘটে, যখন ব্যাকটেরিয়া, ভাইরাস, ফাংগাস ও পরজীবী অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল ওষুধে আর সাড়া দেয় না। ফলে সংক্রমণ নিরাময় কঠিন হয়ে পড়ে। গুরুতর অসুস্থতা, অক্ষমতা ও মৃত্যুঝুঁকি তাতে বেড়ে যায়।

স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বেশি বেশি অ্যান্টিবায়োটিক লিখে দেওয়া, রোগীদের কোর্স শেষ না করা, গবাদি পশু ও মাছে অতিরিক্ত অ্যান্টিবায়োটিকের ব্যবহার, হাসপাতালের সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ দুর্বলতা, অপর্যাপ্ত পরিচ্ছন্নতা, নতুন অ্যান্টিবায়োটিক না আসা—এসবই অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স বাড়ার কারণ।

তাদের আশঙ্কা, অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স বাড়লে রোগীর অবস্থা আরও জটিল হবে। হাসপাতালে থাকার সময়, চিকিৎসায় ব্যর্থতার হার, মৃত্যু ও চিকিৎসা ব্যয়ও বাড়বে।

নতুন তথ্য কী বলছে

অ্যান্টিবায়োটিক নিয়ে এই পর্যবেক্ষণমূলক প্রতিবেদন উপস্থাপন করেন আইইডিসিআরের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা অধ্যাপক জাকির হোসেন হাবিব। ১৩টি হাসপাতালের কেস-ভিত্তিক ও ৮টি হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের ল্যাব-ভিত্তিক তথ্য নিয়ে এটি তৈরি করা হয়।

গবেষকরা ১২৩টি 'ড্রাগ-বাগ কম্বিনেশন' (অণুজীব ও ওষুধের পারস্পরিক সম্পর্ক) বিশ্লেষণ করেন। আগের বছরের সঙ্গে তুলনা করে দেখা যায়, ৭৯টির ক্ষেত্রে কার্যকারিতা কমেছে, ৩৮টির বেড়েছে, ৬টি অপরিবর্তিত আছে। এটি দেখায়, ধীরে ধীরে আরও বেশি অ্যান্টিবায়োটিক অকার্যকর হয়ে পড়ছে।

আইসিইউতে ভর্তি রোগীদের চিকিৎসায় পাঁচ ধরনের জীবাণুর বিরুদ্ধে ৭১টি অ্যান্টিবায়োটিকের কার্যকারিতা পরীক্ষা করা হয়। মাত্র ৫টি অ্যান্টিবায়োটিকের কার্যকারিতা ৮০ শতাংশের বেশি ছিল। একটির ছিল ৬০-৮০ শতাংশের মধ্যে। বাকি সবই ৬০ শতাংশের নিচে।

আরও দেখা যায়, আইইডিসিআর যত রোগীর নমুনা পরীক্ষা করেছে, তার মধ্যে ৭ শতাংশ রোগীর ক্ষেত্রে অ্যান্টিবায়োটিক-প্রতিরোধী অণুজীব প্যান-ড্রাগ-রেজিট্যান্স (পিডিআর) পাওয়া গেছে। পিডিআর হলো একটি নির্দিষ্ট রোগের জন্য ব্যবহৃত সব ধরনের ওষুধ বা অ্যান্টিবায়োটিক।

আইসিইউ রোগীদের ক্ষেত্রে এই পিডিআরের উপস্থিতি ছিল ৪১ শতাংশ। একিনেটোব্যাক্টার নামে ব্যাকটেরিয়ায় সবচেয়ে বেশি পিডিআর পাওয়া গেছে, ২৭ শতাংশ। অধ্যাপক হাবিব একে 'আইসিইউতে বড় ধরনের হুমকি' বলে উল্লেখ করেন।

মোট নমুনার ৪৬ শতাংশে মাল্টিড্রাগ-রেজিস্ট্যান্ট (এমডিআর) জীবাণু পাওয়া গেছে। আইসিইউতে এমডিআরের হার ৮৯ শতাংশ।

দেশে সর্বাধিক ব্যবহৃত অ্যান্টিবায়োটিকের মধ্যে সেফট্রিয়াক্সনের রেজিস্ট্যান্স ২০২২ সালে ছিল ৪০ দশমিক ১ শতাংশ। এ বছর তা বেড়ে হয়েছে ৫২ দশমিক ২ শতাংশ। মেরোপেনেমের রেজিস্ট্যান্স ৪৬ দশমিক ৭ শতাংশ থেকে বেড়ে হয়েছে ৭১ শতাংশ।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা অ্যান্টিবায়োটিককে তিন ভাগে ভাগ করে—অ্যাক্সেস, ওয়াচ ও রিজার্ভ। এর মধ্যে অ্যাক্সেস গ্রুপ রোগের প্রথম বা দ্বিতীয় স্তরে ব্যবহারের কথা। কিন্তু এ বছর তারও পরের ওয়াচ গ্রুপের ব্যবহার ৯১ শতাংশে পৌঁছেছে। অধ্যাপক হাবিব বলেন, 'ওয়াচ গ্রুপের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা অত্যন্ত উদ্বেগজনক।'

আইইডিসিআর পরামর্শ দিয়েছে, অ্যান্টিবায়োটিক দেওয়ার আগে অবশ্যই কালচার ও সংবেদনশীলতা পরীক্ষা করা উচিত। পাশাপাশি সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ জোরদার করতে হবে এবং ওষুধ ব্যবস্থাপনায় কঠোরতা বাড়াতে হবে।

অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের (ডিজিএইচএস) অতিরিক্ত মহাপরিচালক (পরিকল্পনা ও উন্নয়ন) অধ্যাপক শেখ ছাইদুল হক বলেন, নিজে নিজে ওষুধ খাওয়া এবং অদক্ষ চিকিৎসকের প্রেসক্রিপশনে অ্যান্টিবায়োটিক খাওয়া এখন সাধারণ চর্চায় পরিণত হয়েছে। তিনি স্বীকার করেন, অনেক নিবন্ধিত চিকিৎসকও সঠিক নিয়ম মানেন না।

ডিজিএইচএসের হাসপাতাল পরিচালক আবু হোসেন মঈনুল আহসান বলেন, হাসপাতালগুলোতে রোগীর চাপ বেশি হওয়ায় সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ কঠিন। তবে পরিস্থিতির উন্নয়নে কাজ চলছে।

ad
ad

খবরাখবর থেকে আরও পড়ুন

সাকিবসহ ১৫ জনের নামে ২৫৭ কোটি টাকা আত্মসাৎ-পাচারের মামলার তদন্ত শেষ পর্যায়ে

গত ২৭ জুলাই এ মামলার তদন্ত প্রতিবেদন আদালতে জমা দিতে বলেছিলেন ঢাকা জ্যেষ্ঠ মহানগর বিশেষ জজ শাহজাহান কবির। সে দিন দুদক প্রতিবেদন জমা দিতে না পারলে বিচারক আগামী ৩০ সেপ্টেম্বর প্রতিবেদন জমার পরবর্তী দিন নির্ধারণ করে দেন।

৭ ঘণ্টা আগে

সার্কভুক্ত দেশের শিক্ষার্থীদের ফুল-ফান্ডেড স্কলারশিপ দেবে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়

সার্কভুক্ত দেশগুলোর শিক্ষার্থীদের জন্য ফুল-ফান্ডেড স্কলারশিপ চালুর ঘোষণা দিয়েছেন জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য (ভাইস চ্যান্সেলর) অধ্যাপক ড. এ এস এম আমানুল্লাহ। তিনি বলেছেন, বিশেষ করে নেপালের শিক্ষার্থীদের জন্য জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে সম্পূর্ণ বিনা খরচে উচ্চশিক্ষার সুযোগ উন্মুক্ত করা হবে।

৮ ঘণ্টা আগে

প্রথম শ্রেণিতে ভর্তিতে লটারি, অন্য সব শ্রেণিতে পরীক্ষা: শিক্ষা মন্ত্রণালয়

আগামী শিক্ষাবর্ষ থেকে প্রথম শ্রেণিতে ভর্তিতে কোনো পরীক্ষা হবে না। এক্ষেত্রে লটারির মাধ্যমে ভর্তি কার্যক্রম পরিচালনা করা হবে। তবে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের দ্বিতীয় থেকে নবম শ্রেণিতে ভর্তি পরীক্ষা নেওয়া হবে।

৯ ঘণ্টা আগে

তনু হত্যা: সাবেক সেনাসদস্য হাফিজুরের জামিন স্থগিত, আত্মসমর্পণের নির্দেশ

কুমিল্লার কলেজছাত্রী সোহাগী জাহান তনু হত্যা মামলায় অবসরপ্রাপ্ত সেনাসদস্য হাফিজুর রহমানের হাইকোর্ট থেকে পাওয়া জামিন স্থগিত করেছেন আপিল বিভাগের চেম্বার আদালত। একই সঙ্গে তাকে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে আত্মসমর্পণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

৯ ঘণ্টা আগে