ঘুষ-অনিয়মে জর্জরিত উখিয়া সাব-রেজিস্ট্রি অফিস, ভোগান্তিতে সেবাগ্রহীতারা

সাঈদ মুহাম্মদ আনোয়ার, কক্সবাজার
আপডেট : ০৭ জানুয়ারি ২০২৬, ১২: ৫০
উখিয়া সাব-রেজিস্ট্রারের কার্যালয় (বাঁয়ে) ও সাব-রেজিস্ট্রার মোঃ মোরশেদ আলমের কক্ষের সামনের সাইনবোর্ড (ডানে)। ছবি: সংগৃহীত

কক্সবাজারের উখিয়া সাব-রেজিস্ট্রার অফিসে দীর্ঘদিন ধরে লাগামহীন দুর্নীতি, স্বেচ্ছাচারিতা ও অনিয়ম চলার অভিযোগ উঠেছে। অফিসে সিসিটিভি ক্যামেরা থাকলেও প্রবেশপথে ‘বিনা অনুমতিতে প্রবেশ নিষেধ’ সাইনবোর্ড ঝুলিয়ে সাধারণ মানুষের স্বাভাবিক প্রবেশে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করা হচ্ছে। দলিল নিবন্ধনের মতো গুরুত্বপূর্ণ সেবায় ইচ্ছাকৃত সময়ক্ষেপণ ও অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের কারণে প্রতিদিনই ভোগান্তিতে পড়ছেন সেবাগ্রহীতারা।

ভুক্তভোগী ও স্থানীয় সূত্র জানায়, এসব অনিয়মের নেপথ্যে অফিস সহকারী বেবী রাণী দে এবং তার গড়ে তোলা একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেট সক্রিয়। সিন্ডিকেটের সদস্য হিসেবে মোহরার সৃদুল দাশ ও রবিউল্লাহ রবির নাম উঠে এসেছে। অভিযোগ রয়েছে, একটি রাজনৈতিক দলের প্রভাব খাটিয়ে সাব-রেজিস্ট্রার মো. মোরশেদ আলম অনিয়মিতভাবে অফিসে উপস্থিত হন, নির্ধারিত সময়ের অনেক পরে আসেন এবং নিজের কক্ষে প্রবেশেও অনুমতির বিধান চালু করেছেন।

গোপন সূত্রে জানা গেছে, দলিল নিবন্ধনের ক্ষেত্রে সরকারি নির্ধারিত ফির বাইরে জমির ঘোষিত মূল্যের শূন্য দশমিক পাঁচ (০.৫) শতাংশ অর্থ ঘুষ হিসেবে আদায় করা হয়। ফলে এক কোটি টাকার জমি নিবন্ধনে অতিরিক্ত প্রায় ৫০ হাজার টাকা দিতে বাধ্য হন সেবাগ্রহীতারা। এ ছাড়া বিভিন্ন সেবার নামে ‘কমিশন’ ও ‘অফিস খরচ’ দেখিয়ে একটি অদৃশ্য ফি-নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা গড়ে তোলা হয়েছে, যা পুরো অফিস কার্যক্রমকে কার্যত জিম্মি করে রেখেছে বলে অভিযোগ।

একাধিক সূত্র জানায়, আদায়কৃত ঘুষের ২৫ শতাংশ নেন অফিস সহকারী বেবী রাণী দে এবং বাকি ৭৫ শতাংশ সিন্ডিকেটের সদস্য ও দালালদের মধ্যে বণ্টন করা হয়। দলিল লেখকদের মাধ্যমে এই অর্থ আদায় করা হয়, যা একটি সংঘবদ্ধ চক্রের মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে বলে স্থানীয়দের দাবি।

ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, এই চক্র ইচ্ছেমতো জমির শ্রেণি পরিবর্তন ও বাজারমূল্য কম দেখিয়ে দলিল নিবন্ধন করে সরকারকে বিপুল রাজস্ব থেকে বঞ্চিত করছে। এসব অনিয়মে বেবী রাণী দে, সৃদুল দাশ, রবিউল্লাহ রবি এবং সাব-রেজিস্ট্রার মো. মোরশেদ আলম সরাসরি জড়িত বলে অভিযোগ উঠেছে।

এ ছাড়া অভিযোগ রয়েছে, দলিলের টিপসই গ্রহণ, রশিদ লেখা, মোহরা ও কোর্ট ফি আদায়ের প্রতিটি ধাপেই নির্দিষ্ট হারে ঘুষ নেওয়া হয়। এমনকি দলিল প্রিন্টিংয়ের ক্ষেত্রেও প্রতি কাগজে অতিরিক্ত অর্থ আদায় করা হচ্ছে।

উখিয়া সাব-রেজিস্ট্রার অফিসে বর্তমানে ২০ জন দলিল লেখক কর্মরত। এদের দুই একজন ছাড়া বাকিদের পুরোপুরি জিম্মি করে রাখা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। অফিসের ‘চাহিদা’ পূরণ না হলে তাদের গেট পাস বন্ধ করে দেওয়া হয়। সাংবাদিকদের তথ্য দিলে শাস্তির মুখে পড়তে হয়— এমন অভিযোগে কয়েকজন দলিল লেখককে অফিসে যাওয়া থেকেও বিরত রাখা হয়েছে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, অফিস সহকারী ও মোহরারের মতো পদে যোগদানের পর অল্প সময়ের মধ্যেই বেবী রাণী দে বিপুল সম্পদের মালিক বনে গেছেন। এ বিষয়ে একাধিকবার ফোন করা হলেও অফিস সহকারী বেবী রাণী দে’র বক্তব্য পাওয়া যায়নি। মোহরার সৃদুল দাশের সঙ্গেও যোগাযোগ সম্ভব হয়নি। রবিউল্লাহ রবি বলেন, ‘এসব বিষয়ে আমি কোনো মন্তব্য করতে চাই না।’

এর আগে গত বছরের ১৬ এপ্রিল দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) জেলা কার্যালয়ের উপপরিচালক গুলশান আনোয়ার প্রধানের নেতৃত্বে চার সদস্যের একটি এনফোর্সমেন্ট টিম উখিয়া সাব-রেজিস্ট্রার অফিসে অভিযান চালায়। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, সেই অভিযানে ঘুষ, দুর্নীতি, অনিয়ম, গ্রাহকদের সেবা বঞ্চিত করা এবং অতিরিক্ত ফি আদায়ের প্রমাণ পাওয়া গেছে।

এ বিষয়ে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক অফিসের এক কর্মচারী জানান, দুদকের অভিযানের খবর পেয়ে সাব-রেজিস্ট্রার মো. মোরশেদ আলম দ্রুত অফিসে চলে আসেন। সাধারণত তিনি সাড়ে ১১টার আগে অফিসে না এলেও সেদিন সকাল ৯টার আগেই উপস্থিত হন। এ সময় অফিসের ড্রয়ারে থাকা প্রায় তিন লাখ টাকা কৌশলে অন্যত্র সরিয়ে ফেলা হয়। এরপরও দুদক অনিয়মের একাধিক আলামত সংগ্রহ করে।

তবে অভিযোগ অস্বীকার করে সাব-রেজিস্ট্রার মো. মোরশেদ আলম বলেন, ‘অফিসে প্রবেশে কোনো অনুমতির প্রয়োজন নেই। তবে খাস কামরায় প্রবেশের জন্য অনুমতি লাগে। আমার অফিস সিসিটিভি ক্যামেরা নিয়ন্ত্রিত। এখানে অবৈধ লেনদেনের কোনো সুযোগ নেই। অভিযোগগুলো সত্য নয়।’

স্থানীয় সচেতন মহল ও ভুক্তভোগীরা বলছেন, সরকার পরিবর্তন হলেও উখিয়া সাব-রেজিস্ট্রার অফিসে এখনো দুর্নীতি ও স্বেচ্ছাচারিতা বহাল রয়েছে। দুর্নীতি যদি এতটাই ‘ওপেন সিক্রেট’ হয়, তবে প্রশাসনের নীরবতা কেন— সে প্রশ্ন তুলেছেন তারা। দ্রুত তদন্ত করে সিন্ডিকেট ভেঙে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবিও জানিয়েছেন এলাকাবাসী।

ad
ad

খবরাখবর থেকে আরও পড়ুন

জকসু নির্বাচন: ২৬ কেন্দ্রের ফলাফলে শীর্ষ তিন পদে এগিয়ে ছাত্রশিবির

এছাড়া জিএস পদে শিবির প্যানেলের আব্দুল আলিম আরিফ মোট ৩৪৮৯ ভোট ও ছাত্রদল প্যানেল থেকে খাদিজাতুল কুবরা মোট ১৩৫৩ ভোট পেয়েছেন। তাছাড়া এজিএস পদে শিবির প্যানেলের মাসুদ রানা মোট ৩০৯৩ ভোট পেয়ে এগিয়ে আছেন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ছাত্রদল প্যানেলের আতিকুর রহমান তানজিল ২৬৩৭ ভোট পেয়েছেন।

১৪ ঘণ্টা আগে

ফের বেসরকারি স্কুল-কলেজকে এমপিওভুক্তির উদ্যোগ

তিনি বলেন, নতুন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্ত হতে ১৪ থেকে ২৫ জানুয়ারি অনলাইনে আবেদন গ্রহণ করা হবে। ২০২৫ সালে জারি হওয়া স্কুল-কলেজের এমপিও নীতিমালার আলোকে নতুন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো এমপিওভুক্ত হবে।

১৪ ঘণ্টা আগে

প্রধান উপদেষ্টার বিশ্বাস— সব দল ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে প্রচার চালাবে

১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচন ও গণভোট— দুটিই বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক রূপান্তরের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে উল্লেখ করেন তিনি। বলেন, রাজনৈতিক দলগুলো জুলাই সনদে সমর্থন দিয়েছে এবং গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে তারা প্রচার চালাবে বলে তার বিশ্বাস। তিনি বলেন, “আমি মনে করি না কোনো দল ‘না’ ভোটের পক্ষে যাবে।”

১৪ ঘণ্টা আগে

‘গণভোট নিয়ে মানুষ সচেতন হলে দলগুলো সংস্কার মেনে নিতে বাধ্য হবে’

এম সাখাওয়াত হোসেন বলেন, আমরা যদি অতীতের মতো শাসন দেখতে না চাই, তাহলে গণভোটে ‘হ্যাঁ’-সূচক ভোট দেওয়ার জন্য ব্যাপক প্রচার চালাতে হবে। যখন মানুষের মধ্যে সচেতনতা গড়ে উঠবে, তখন রাজনৈতিক দলগুলো সংস্কার মেনে নিতে বাধ্য হবে।

১৬ ঘণ্টা আগে