৩ শিক্ষার্থীকে দুই দফায় পেটালেন রাকসু জিএস আম্মার ও শিবির নেতারা

রাবি প্রতিনিধি
আপডেট : ২৮ জুলাই ২০২৬, ০০: ১১
বেলচা হাতে কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের দিকে তেড়ে যাচ্ছেন রাকসু জিএস সালাউদ্দিন আম্মার (বাঁয়ে), গ্রন্থাগারের পাঠকক্ষে ঢুকে এক শিক্ষার্থীকে মারধর করছেন রাকসু ও শিবির নেতারা (মাঝে) এবং গ্রন্থাগারের সামনে অ্যাম্বুলেন্স থেকে টেনে হিঁচড়ে নামিয়ে এক শিক্ষার্থীকে এলোপাতাড়ি লাথি ও মারধর করেন রাকসু ও শিবির নেতাকর্মীরা (ডানে)। ছবি: সংগৃহীত

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে (রাবি) তিন শিক্ষার্থীকে দুই দফায় পিটিয়েছেন কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (রাকসু) সাধারণ সম্পাদক (জিএস) সালাহউদ্দিন আম্মার, এজিএস এস এম সালমান সাব্বির এবং শাখা ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীরা। আজ সোমবার দুপুরে প্রক্টর দপ্তরে প্রথম দফা এবং পরে বিকেলে বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের পাঠকক্ষে দ্বিতীয় দফায় এ হামলার ঘটনা ঘটে।

এতে তিন শিক্ষার্থী আহত হয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিকেল সেন্টারে প্রাথমিক চিকিৎসা নেন। আহতরা হলেন— বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের শিক্ষার্থী আনাস, হাসিব এবং সংস্কৃত বিভাগের মাহমুদুল হাসান। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে দিনভর উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে ক্যাম্পাসে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর দপ্তর সূত্রে জানা যায়, সংস্কৃত বিভাগের এক ছাত্রীকে একই বিভাগের শিক্ষার্থী মহসিন আলম প্রেমের প্রস্তাব দেন। প্রস্তাবে রাজি না হওয়ায় ওই ছাত্রীকে ভয়ভীতি দেখানোর পাশাপাশি বিভিন্ন মুঠোফোন নম্বর থেকে কল করে বলা হয়, প্রেমের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করায় মহসিন আত্মহত্যা করেছেন। একই সঙ্গে তাকে ক্যাম্পাস ছাড়ারও হুমকি দেওয়া হয়।

এ ঘটনায় রোববার রাতে ওই ছাত্রী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক মাহবুবর রহমানের কাছে লিখিত অভিযোগ দেন। অভিযোগের পর প্রক্টর নিজ কার্যালয়ে বৈঠকে বসেন। সেখানে মহসিন আলমের পক্ষে উপস্থিত ছিলেন আনাস, হাসিব ও মাহমুদুল হাসান। অভিযোগ অস্বীকারের একপর্যায়ে তারা প্রক্টরের সঙ্গে উচ্চবাচ্য করেন।

একাধিক সূত্র জানায়, আগের দিনের ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে সোমবার দুপুরে আবারও বৈঠক ডাকেন প্রক্টর। সেখানে রাকসুর জিএস সালাহউদ্দিন আম্মার ও অন্য নেতারা আনাসকে নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের কর্মী বলে অভিযোগ করেন। এ সময় তার মুঠোফোন ঘেঁটে ছাত্রলীগের কয়েকজন নেতার সঙ্গে তোলা ছবি পাওয়া যায়। এসব দেখিয়ে সালাহউদ্দিন আম্মার ও এজিএস এস এম সালমান সাব্বির আনাসকে মারধর করেন। পরে বিষয়টি সাময়িকভাবে মীমাংসা করে সবাইকে প্রক্টর দপ্তর থেকে বের করে দেওয়া হয়।

এরপর বেলা ৩টার দিকে রাকসু ভবনের সামনে গিয়ে আনাস, হাসিব, মাহমুদুলসহ কয়েকজন রাকসুর জিএস সালাহউদ্দিন আম্মার এবং তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক বি এম নাজমুস সাকিবকে লক্ষ্য করে হামলা চালান। এতে নাজমুস সাকিব আহত হন।

এরপর আনাস, হাসিব ও মাহমুদুল বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের পাঠকক্ষের সামনে অবস্থান নেন। এ সময় রাকসু ও ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীরা সেখানে গেলে উভয় পক্ষের মধ্যে বাগ্‌বিতণ্ডা ও ইটপাটকেল নিক্ষেপের ঘটনা ঘটে। একপর্যায়ে তিন শিক্ষার্থী গ্রন্থাগারের পাঠকক্ষের ভেতরে আশ্রয় নেন।

প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে প্রক্টর পাঠকক্ষের ভেতরে প্রবেশ করেন। কিছুক্ষণ পর রাকসু ও ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীরা পাঠকক্ষে ঢুকে আনাস, হাসিব ও মাহমুদুলকে কাঠ, বাঁশ, রড, বেল্ট ও লাঠিসোঁটা দিয়ে বেধড়ক মারধর করেন। হামলা ঠেকাতে অন্য শিক্ষার্থীরা এগিয়ে এলে তাদেরও মারধরের শিকার হতে হয়।

পরে প্রক্টরিয়াল বডি, পুলিশ ও উপস্থিত শিক্ষার্থীরা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনেন। গুরুতর আহত মাহমুদুল হাসানকে হাসপাতালে নেওয়ার সময়ও গ্রন্থাগারের সামনে তাকে লাথি মারার পাশাপাশি টেনেহিঁচড়ে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন রাকসু ও শিবিরের নেতাকর্মীরা এ সময় তারা ‘নারায়ে তাকবির, আল্লাহু আকবার’, ‘ছাত্রলীগের ঠিকানা, এই ক্যাম্পাসে হবে না’— এমন স্লোগান দিয়ে প্রশাসন ভবনের সামনে অবস্থান নেন। সন্ধ্যা সাড়ে ৬টা পর্যন্ত নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের বিচারের দাবিতে রাকসু ও ছাত্রশিবিরের নেতারা উপাচার্যের কার্যালয়ে প্রশাসনের সঙ্গে বৈঠক করেন।

প্রক্টর অধ্যাপক মাহবুবর রহমান বলেন, শিক্ষার্থীদের দাবির মুখে ছাত্রলীগ-সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে পুলিশ আনাস ও হাসান নামের দুজনকে গ্রেপ্তার করেছে। ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও দোষীদের শাস্তির জন্য উপাচার্য দ্রুত একটি তদন্ত কমিটি গঠন করবেন। পাশাপাশি ক্যাম্পাসে সহাবস্থান ও শান্তিশৃঙ্খলা বজায় রাখতে ছাত্রশিবিরসহ অন্যরা প্রশাসনকে পূর্ণ সহযোগিতার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।

হামলার সময় কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের পাঠকক্ষে উপস্থিত ছিলেন পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের ২০১৭-১৮ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী হেলাল উদ্দীন। ঘটনার বর্ণনা দিয়ে তিনি বলেন, ‘আমরা এখানে পড়ছিলাম। তারপর তারা (ডাকসু ও শিবিরের নেতাকর্মীরা) অতর্কিতভাবে রিডিং রুমে ঢুকে পড়েন। তারা যাকে পাচ্ছিল তাকেই ছাত্রলীগ ট্যাগ দিচ্ছিল। অধ্যয়নরত শিক্ষার্থীদের দিকেও তারা উগ্র হন এবং মারধর করেন। ছাত্রলীগ হলেও কাউকে মারার অধিকার তো কারও নাই। বিচারের জন্য দেশে আইন আছে।’

ছাত্রলীগের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ অস্বীকার করে হামলার শিকার আনাস বলেন, অতীতে ছাত্রলীগের সঙ্গে যুক্ত বন্ধুদের সঙ্গে ছবি থাকলেও তিনি ছাত্রলীগের কর্মী ছিলেন না। তিনি বলেন, ‘আজকে আমাদের প্রক্টর অফিসে ডাকা হয়েছিল। সেখানে আমাকে ছাত্রলীগ ট্যাগ দেওয়া হয়। সালাউদ্দিন আম্মার লোকজন নিয়ে এসে আমাকে মারা শুরু করেন। তারপর আমাদের প্রক্টর অফিস থেকে ছেড়ে দেওয়া হয়। তারপর আমরা সেখান থেকে লাইব্রেরিতে চলে আসি। এরপর অন্য কেউ হয়তো রাকসুর সামনে তাদের সঙ্গে হাতাহাতি করে। তারপর আম্মার লোকজন নিয়ে এসে লাইব্রেরির ভেতরে ঢুকে আমাকে মারধর করেন। আমার ওপর কমপক্ষে ২০০টির বেশি আঘাত করা হয়েছে।’

ঘটনার একাধিক ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। একটি ভিডিওতে দেখা যায়, হাতে বেলচা নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের ভেতরে তেড়ে যেতে চাইছেন সালাহউদ্দিন আম্মার। এ সময় সহপাঠীরা তাকে নিবৃত্ত করার চেষ্টা করেন। আরেকটি ভিডিওতে দেখা যায়, গ্রন্থাগারের পাঠকক্ষে বড় লাঠি দিয়ে একজনকে বেধড়ক পেটাচ্ছেন তিনি।

হামলায় অংশ নেওয়ার অভিযোগের বিষয়ে সালাহউদ্দিন আম্মার বলেন, ‘আমরা নিয়ম অনুযায়ী প্রক্টরের মাধ্যমে ছাত্রলীগ কর্মী আনাসকে পুলিশের কাছে সোপর্দ করার দাবি জানিয়েছিলাম। সে অনুযায়ী প্রক্টর তাকে পুলিশের কাছে সোপর্দ করেন। কিন্তু প্রশসান ভবনের সামনে নিয়ে তাকে ছেড়ে দেওয়া হয়। এরপর তারা রাকসু ভবনে গিয়ে আমাদের ওপর অতর্কিত হামলা করে।’

তিনি আরও বলেন, ‘দুই বছর ধরে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছে। প্রশাসন থেকে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। রাকসু প্রতিনিধিদের ওপর হামলা করা হলে সাধারণ শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা করা হবে না, এর নিশ্চয়তা কী? এর দায় কে নেবে? সেই জায়গা থেকে আমরা এখানে এসেছি।’

মারধরে ছাত্রশিবিরের অংশগ্রহণের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রশিবিরের সাধারণ সম্পাদক মেহেদী হাসান। তিনি বলেন, হামলার খবর পেয়ে তারা ঘটনাস্থলে গিয়ে উত্তেজনাকর পরিস্থিতি দেখতে পান।

তবে ভিডিও ফুটেজে শিবির-সমর্থিত প্যানেলের নির্বাচিত রাকসু নেতা সালমান সাব্বির, ইমরান লস্কর, বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রশিবিরের প্রচার ও মিডিয়া সম্পাদক মেহেদী সজীব, ক্যাম্পাস মনিটরিং কো-অর্ডিনেটর ফজলে রাব্বি মোহাম্মদ ফাহিম রেজাসহ অনেককে মারধরে অংশ নিতে দেখা গেছে। এ বিষয়ে জানতে চাইলে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি ছাত্রশিবিরের সাধারণ সম্পাদক।

বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের সভাপতি সুলতান আহমেদ রাহী বলেন, একটি ব্যক্তিগত বিরোধকে রাজনৈতিক রূপ দিয়ে গ্রন্থাগারের মতো জায়গায় হামলা চালানো হয়েছে। তিনি ঘটনার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান।

বিশ্ববিদ্যালয়ের সহ-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক আব্দুল আলীম বলেন, ‘দিনব্যাপী যে ঘটনাটি ঘটেছে, সেটি অত্যন্ত নিন্দনীয়। তারা এখন পুলিশ, প্রশাসন, প্রক্টরিয়াল বডির সঙ্গে সভায় বসেছে। দ্রুত সময়ের ভেতর এ ঘটনা তদন্ত করতে একটি কমিটি গঠন করা হবে। দোষীদের বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন অনুযায়ী শাস্তি দেওয়া হবে।’

ad
ad

খবরাখবর থেকে আরও পড়ুন

নিজেদের ছোট না ভেবে গড়ে তোলো— নতুন কুঁড়ি স্পোর্টসের সমাপনীতে প্রধানমন্ত্রী

নতুন কুঁড়ি স্পোর্টসে অংশ নেওয়া বিজয়ী ও অংশগ্রহণকারী সব ক্ষুদে ক্রীড়াবিদকে অভিনন্দন জানান প্রধানমন্ত্রী। একই সঙ্গে তাদের খেলাধুলায় উৎসাহ দেওয়ার জন্য অভিভাবকদের প্রতিও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।

৬ ঘণ্টা আগে

স্বাধীন গণমাধ্যমের জন্য নীতিমালা প্রণয়নে সম্পাদকদের সহযোগিতা চাইলেন প্রধানমন্ত্রী

সোমবার (২৭ জুলাই) সচিবালয়ে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে ন্যাশনাল এডিটরস কাউন্সিলের নেতাদের সঙ্গে বৈঠককালে প্রধানমন্ত্রী এ আহ্বান জানান। প্রধানমন্ত্রীর উপপ্রেস সচিব মো. সুজাউদ্দৌলা (সুজন মাহমুদ) এ তথ্য জানিয়েছেন।

৬ ঘণ্টা আগে

আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি না হলে বিনিয়োগ আর্কষণ সম্ভব নয়: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, যেকোনো দেশের টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং শিল্পায়নের মূল ভিত্তি হলো শক্তিশালী আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি। বিনিয়োগকারীরা তাদের পুঁজি খাটাতে চান নিরাপদ ও অনুকূল পরিবেশে। যদি জানমালের নিরাপত্তা নিয়ে সামান্যতম শঙ্কাও থাকে, তবে বিদেশি বিনিয়োগ তো দূরের কথা, দেশীয় উদ্যোক্তারাও বিনিয

৭ ঘণ্টা আগে

এইচএসসিতে এআই ব্যবহার করে নকল, পরীক্ষার্থী বহিষ্কার

সোমবার (২৭ জুলাই) চট্টগ্রামের সরকারি হাজী মুহাম্মদ মহসিন কলেজ কেন্দ্রে এই ঘটনা ঘটে। বহিষ্কৃত শিক্ষার্থী নগরের একটি কলেজের মানবিক বিভাগের শিক্ষার্থী। এ দিন পৌরনীতি ও সুশাসন প্রথম পত্র, জীববিজ্ঞান (তত্ত্বীয়) প্রথম পত্র, ব্যবসায় সংগঠন ও ব্যবস্থাপনা প্রথম পত্র এবং খাদ্য ও পুষ্টি প্রথম পত্রের পরীক্ষা অনু

৮ ঘণ্টা আগে