বীর প্রতীক তারামন বিবির প্রয়াণের ৭ বছর

কুড়িগ্রাম প্রতিনিধি
তারামন বিবি। ছবি: সংগৃহীত

বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধে অসামান্য বীরত্বের স্বীকৃতিস্বরূপ যে দুজন নারী মুক্তিযোদ্ধা বীর প্রতীক খেতাব পেয়েছিলেন, তারামন বিবি তাদের একজন। আজ সোমবার (১ ডিসেম্বর) তার সপ্তম মৃত্যুবার্ষিকী। ২০১৮ সালের এই দিনে কুড়িগ্রামের রাজিবপুর উপজেলা সদরের কাচারীপাড়া এলাকায় নিজ বাড়িতে মৃত্যু হয় তার। রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় তাকে কাচারীপাড়া তালতলা কবরস্থানে সমাধিস্থ করা হয়।

তারামন বিবির জন্ম ১৯৫৭ সালে, কুড়িগ্রামের চর রাজিবপুরের শংকর মাধবপুর গ্রামে। প্রকৃত নাম তারাবানু। বাবা আবদুস সোহবান, মা কুলসুম বিবি। সাত ভাইবোনের মধ্যে তিনি ছিলেন তৃতীয়।

মুক্তিযুদ্ধের সময় তারামন বিবির গ্রাম মাধবপুর ছিল ১১ নম্বর সেক্টরের অধীনে। নেতৃত্বে ছিলেন সেক্টর কমান্ডার আবু তাহের। তখন তারামনের বয়স ছিল মাত্র ১৪ বছর।

মুহিব হাবিলদার নামে স্থানীয় এক মুক্তিযোদ্ধা তারামন বিবিকে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিতে উৎসাহিত করেন। তিনি প্রথমে তার মাকে বুঝিয়ে তাকে মুক্তিযোদ্ধাদের ক্যাম্পে রান্নাবান্নার কাজে নিয়ে আসেন। রান্নাবান্না, ধোয়ামোছা, মাঝেমাঝে মুক্তিযোদ্ধাদের অস্ত্র সাফ এবং পাকিস্তানি বাহিনীর খবর সংগ্রহ করতেন তারাবানু। তার সাহস ও শক্তির পরিচয় পেয়ে মুহিব হাবিলদারই তাকে স্টেনগান চালানো শেখান।

এরপর একদিন দুপুরে সম্মুখযুদ্ধের ঘটনা। মধ্য দুপুরে সবাই খেতে বসেছে তখন, কেবল তারাবানু সুপারি গাছের ওপরে উঠে চারপাশে নজর রাখছেন। হঠাৎ তিনি পাকিস্তানিদের একটি গানবোটকে দ্রুত গতিতে এগিয়ে আসতে দেখে জানালেন কমান্ডারকে। মুহূর্তের মধ্যেই সবাই নিজ নিজ অবস্থান নিয়ে নিলেন, সন্ধ্যা পর্যন্ত চল সম্মুখযুদ্ধ। তারাবানু পাকিস্তানি হানাদারদের না দেখলে সেদিন মুক্তিযোদ্ধারা বেশ বিপদে পড়তে পারতেন।

অভিনয়েও দারুণ পারদর্শী ছিলেন তারামন বিবি। গুপ্তচর সেজে পাকিস্তানিদের ক্যাম্পে ঢুকে তথ্য নিয়ে আসতেন মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে। মাথায় চুলে জট লাগানো পাগলের বেশে কখনো পাকিস্তানিদের ক্যাম্পে ঢুকেছেন, কখনো সারা শরীরে কাদা লাগিয়ে, কখনো আবার পঙ্গুর অভিনয় করে। পাকিস্তানি ক্যাম্পের সবাই তাকে মনে করতেন মানসিক বিকারগ্রস্ত। এভাবে পাকিস্তানিদের ক্যাম্পে ঢুকে শুনতেন নানা গোপন তথ্য, জানাতেন মুক্তিযোদ্ধাদের।

এ ছাড়া মোহনগঞ্জ, তারাবর কোদালকাটি, গাইবান্ধার ফুলছড়ির বেশ কিছু যুদ্ধে পুরুষ সহযোদ্ধাদের সঙ্গে সম্মুখসমরে সরাসরি অংশ নিয়েছিলেন তারামন বিবি।

১৯৭৩ সালে তৎকালীন সরকার তারামন বিবিকে স্বাধীনতা যুদ্ধে অসামান্য অবদানের জন্য বীর প্রতীক উপাধিতে ভূষিত করে। কিন্তু এ খবরও শুরুতে জানতে পারেননি তারামন। কারণ পুরোপুরি লোক চক্ষুর অন্তরালে চলে গিয়েছিলেন তিনি। অবশেষে ময়মনসিংহ আনন্দমোহন কলেজের অধ্যাপক গবেষক বিমল কান্তি দের মাধ্যমে ১৯৯৫ সালে খোঁজ মেলে তার।

তারামন বিবির জন্মস্থান কুড়িগ্রামের রাজীবপুরের কলেজের অধ্যাপক আবদুস সবুর ফারুকীও অধ্যাপক বিমল কান্তি দেকে সহযোগিতা করেছিলেন তারামন বিবিকে খুঁজে পেতে। মূলত খেতাবপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধাদের ওপর কাজ করতে গিয়ে তিনি দেখলেন, তারামন বিবিকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। পরে অধ্যাপক আবদুর সবুর ফারুকী ও সোলায়মান আলীর মাধ্যমে খুঁজে পাওয়া যায় তাকে।

তারামন বিবির স্বামীর নাম আব্দুল মজিদ। তাদের বিয়ের পরও স্বামী মজিদ জানতেন না যে তার স্ত্রী একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা।

তারামন বিবিকে খুঁজে পাওয়ার খবরটি ১৯৯৫ সালের নভেম্বর দৈনিক ভোরের কাগজের প্রথম পাতায় ছাপা হয়েছিল। এরপর নারীদের অধিকার নিয়ে কাজ করা কয়েকটি সংগঠন তাকে ঢাকায় নিয়ে আসে। ১৯৯৫ সালের ১৯ ডিসেম্বর তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া বীর প্রতীক সম্মাননা তুলে দেন তারামন বিবির হাতে।

১৯৭৩ সালের সরকারি গেজেট অনুযায়ী তারামন বিবির বীরত্বভূষণ নম্বর ৩৯৪। গেজেটে নাম মোছাম্মৎ তারামন বেগম। ২০১৮ সালের ১ ডিসেম্বর মৃত্যুবরণ করেন এই বীর নারী মুক্তিযোদ্ধা। বিজয়ের মাসের প্রথম দিনে এই কিংবদন্তি মুক্তিযোদ্ধার মৃত্যুবার্ষিকীতে তার প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা।

ad
ad

মাঠের রাজনীতি থেকে আরও পড়ুন

কৃষি কার্ডে সরাসরি সহায়তা পাবেন কৃষকরা: তথ্যমন্ত্রী

মন্ত্রী বলেন, নিম্নমানের বীজ কৃষি উৎপাদনের বড় অন্তরায়। পরিকল্পিতভাবে উন্নত জাতের বীজ সরবরাহ করা গেলে একই জমিতে উৎপাদন বাড়ানো সম্ভব। এতে কৃষকের আয় বাড়বে এবং খাদ্য আমদানির ওপর নির্ভরতা কমবে।

১ দিন আগে

সিরাজগঞ্জে ট্রাকের ধাক্কায় অটোভ্যান চালক নিহত

নিহতের পরিচয় শনাক্তসহ পরবর্তী আইনি প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।

১ দিন আগে

রাজশাহী জেলা আ.লীগ কার্যালয়ে ছাত্রলীগের স্লোগান, ভিডিও ভাইরাল

রাজশাহী জেলা আওয়ামী লীগের পরিত্যক্ত কার্যালয়ে গিয়ে স্লোগান দিয়েছেন নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের কয়েকজন নেতাকর্মী। এ সময় তাদের হাতে জাতীয় ও দলীয় পতাকা এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও শেখ হাসিনা-র ছবি দেখা গেছে। ঘটনাটির একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে।

২ দিন আগে

জনগণের টাকায় উন্নয়ন প্রকল্পে অনিয়ম চলবে না: এমপি মিলন

রাজশাহী-৩ (পবা-মোহনপুর) আসনের নবনির্বাচিত সংসদ সদস্য শফিকুল হক মিলন বলেছেন, জনগণের অর্থে পরিচালিত কোনো উন্নয়ন প্রকল্পে অনিয়ম বা দুর্নীতির সুযোগ রাখা হবে না। সরকারি উন্নয়ন কার্যক্রমে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করাই বর্তমান সরকারের প্রধান অগ্রাধিকার।

২ দিন আগে