‘ইচ্ছা আছিল‌ ধান বেইচ্চা কোরবানি দিমু, হেই ইচ্ছা আর পূরণ করতাম পারলাম না’

বিজয় কর রতন, কিশোরগঞ্জ
হাওরে তলিয়ে যাওয়া জমি থেকে তুলে আনা ধান শুকানোর আপ্রাণ চেষ্টায় ব্যস্ত কৃষক। কিশোরগঞ্জের মিঠামইনে ধান হারিয়ে এসব কৃষকের ঘরে নেই ঈদের আনন্দ। ছবি: রাজনীতি ডটকম

‘আইজ ঈদ। কিন্তু মনের মইধ্যে কোনো শান্তি নাই। ইচ্ছা আছিল ঘরে ধান তুইল্লা বছরের খোড়াক রাইক্কা বাহি ধান বেইচ্চা কোরবানি দিমু। হেই ইচ্ছা আর পূরণ করতাম পারলাম না। পুলাপাইনরে ঈদের কাপড় কিইন্না দিমু ক্যামনে, খেত অহনো পানির তলে ঘুমাইতাছে।’

ঈদুল আজহার দিন যখন ঘরে ঘরে আনন্দ, তখন অশ্রুভেজা চোখে মনের আক্ষেপ আর কষ্টের কথাগুলো এভাবেই বলছিলেন মিঠামইনের বেচুরকোনা নৌপোষা হাওরের কৃষক ঘাগড়া গ্ৰামের রুবেল ও তোফাজ্জল মিয়া। কথা বলতে বলতে বারবারই কান্নায় ভেঙে পড়ছিলেন।

রুবেল ও তোফাজ্জল জানান, ‌কিছু খেতের ধান কেটেছিলেন তারা। কিন্তু সেই ধানেও ছত্রাকের আক্রমণে গোড়া পচা রোগ ধরেছে, স্থানীয়ভাবে যাকে তারা বলেন ‘গ্যারা’ রোগ। এ রোগের কারণে ধান শুকিয়ে চাল করার পর সেই চাল ভেঙে গেছে। সেই চাল দুই মাসও খেতে পারবেন কি না, তা নিয়ে সন্দিহান তারা।

হাওরের এই দুই কৃষক বলেন, ‘পরে যে কিতা খাইমু, চিন্তা কইরা পাই না। কিছু ঋণ কইরা সাত কানি খেত করছিলাম। এক কানি খেত কাটছিলাম। ছয় কানি ওই অহন পানির তলে। আত্মীয় স্বজনের বাড়ি থেইক্কা কোরবানির মাংস দিয়া গেছে। নাইলে এইবার কোরবানি ঈদের কোনো জোগার নাই আমরার ঘরে।’

কেবল রুবেল বা তোফাজ্জল নয়, মিঠামইনের এই হাওরের সব কৃষকের ঘরে ঘরে এখন হাহাকার। কৃষকদের দাবি, ৬০ হাজার কৃষকের কষ্টের ফসল বৃষ্টির পানিতে তলিয়ে গেছে। অথচ এই ধান দিয়েই তাদের সারা বছরের খোড়াক চলে তথা খাবারের ব্যবস্থা হয়। কিছু ধান বিক্রি করে অন্যান্য খরচের সংস্থান হয় তাদের। ধান তলিয়ে যাওয়ায় এবার অন্য খরচ তো দূরের কথা, নিজেদের খাওয়ার জন্যই চালের সংস্থান থাকবে না।

এই হাওরের আরেক কৃষক ইসলাম উদ্দিন আট একর জমি চাষ করেছিলেন। তারও অধিকাংশ জমি এখনো পানির নিচে। কিছু জমি থেকে ধান কেটে আনলেও তা নিয়ে বড়জোড় এক মাসের খোড়াক চলবে।

কান্নাজড়িত কণ্ঠে ইসলাম উদ্দিন বলেন, ‘একমাত্র এই বছরওই কোরবানি দিতে পারলাম না। আল্লা আমারে তৌফিক দেন নাই। আমি মেম্বার ছিলাম। ভাইস চেয়ারম্যান নির্বাচন কইরা লক্ষ লক্ষ টাকা নষ্ট করেছি। অথচ আইজ ঈদের দিন আমার পরিবারে কোনো আনন্দ নাই। পুলাপাইন সবুর মাইন্না বইয়া রইছে।’

কৃষকরা জানান, মার্চের শেষ দিকে উজান থেকে নেমে আসতে থাকে পাহাড়ি ঢল, সেই সঙ্গে ছিল অতি বৃষ্টি। এতে কিশোরগঞ্জের ইটনা, মিঠামইন ও অষ্টগ্ৰামের ৫৫টি হাওরে জলাবদ্ধতা তৈরি হয়। তখন ধান পাকা শুরু হয়ে গেছে। কোনো কোনো জমির ধান কাটার উপযোগী হয়ে উঠলেও বৃষ্টির কারণে সঠিকভাবে ধান ঘরে তুলতে পারেননি কৃষকরা। এপ্রিলের মাঝামাঝি সময়ের টানা ভারী বৃষ্টিতে পুরো হাওরের নিচু জায়গার জমি তলিয়ে যেতে শুরু করে।‌ ডুবে যায় কৃষকের কষ্টের ফসল।

মিঠামইনের ঢাকীর হাওরের কৃষক মজিবুর রহমান বলেন, ‘ধান তুইল্লা পরিবার লইয়া ঈদ করার কথা। অহন ধান হারাইয়া চিন্তায় পড়ছি সারা বছর কেমনে চলমু।’

কিশোরগঞ্জের বিভিন্ন হাওরে এখনো পানিতে তলিয়ে আছে ধান। ছবি: রাজনীতি ডটকম
কিশোরগঞ্জের বিভিন্ন হাওরে এখনো পানিতে তলিয়ে আছে ধান। ছবি: রাজনীতি ডটকম

সরকারি হিসাবই বলছে, এসব হাওরের ১৩ হাজার হেক্টর জমির ধান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তবে কৃষকের দাবি, প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত জমির পরিমাণ ২০ হাজার হেক্টরের বেশি। ফলে অতি বৃষ্টি আর আগাম বন্যার কবলে পড়ে এলাকার প্রায় ৫০ হাজার কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন বলে তথ্য দিয়েছে জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর।

হাওরের কৃষির এ বিপর্যয়ে সরকার ঘোষণা দিয়েছিল, ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের সহায়তা করা হবে। পরে অধিদপ্তর ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকা করলে প্রশাসন সে তালিকা যাচাই-বাছাই করে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ে পাঠায়। ঈদের আগের দিন গতকাল বুধবার (২৭ মে) অষ্টগ্রামে সংসদ সদস্য বীর মুক্তিযোদ্ধা অ্যাডভোকেট ফজলুর রহমান সে তালিকা অনুযায়ী ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের হাতে নগদ অর্থ ও ত্রাণ সামগ্রী তুলে দেন। এ সময় তিনি জানান, পর্যায়ক্রমে অন্যান্য ক্ষতিগ্রস্ত উপজেলাতেও কৃষকদের সহায়তা দেওয়া হবে।

পানিতে ধান হারিয়ে সারা বছরের জন্য দুশ্চিন্তা সঙ্গী হলেও সরকারের এই সহায়তা কিছুটা হলেও কৃষকদের সাময়িক স্বস্তি দিচ্ছে। ঢাকীর হাওরের কৃষক আলামিন সরকার বলেন, ‘ঈদ আমরার কপালে নাই। ধানই নাই, কোরবানি দিমু কইত্তে! কোরবানির টেহা থাহন লাগবো তো। ক্ষতির টেহা (ক্ষতিপূরণ হিসেবে সরকারি সহায়তা) পাইলে ও তো কিছুডা জান বাঁচলো।’

মিঠামইন উপজেলা বিএনপির সভাপতি অ্যাডভোকেট জাহিদুল আলম জাহাঙ্গীর বলেন, ‘হাওরে ঈদের আনন্দ থাকার কথা। কোরবানির ঈদ একটি বড় উৎসব। কিন্তু এ বছর প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে ঈদের আনন্দ ম্লান হয়ে গেছে। কৃষকদের ঘরে ঘরে আনন্দের বদলে হাহাকার। ক্ষতিগ্রস্ত প্রত্যেক পরিবারে চলছে আহাজারি ও নিরবতা। সরকার সহায়তা দিয়ে কিছুটা হলেও ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছে।’

কিশোরগঞ্জ জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক ডা. সাদিকুর রহমান বলেন, ‘জেলায় মোট ৫০ হাজার কৃষকের ক্ষতি হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকা মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। ঈদের পরে পর্যায়ক্রমে ক্ষতিগ্রস্ত উপজেলাগুলোতে সরকারি সহায়তা পৌঁছে যাবে।’

অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, এ বছর চলতি মৌসুমে জেলায় ১৮ হাজার ৩৩০ টন ধান সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। আর চাল সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ২৩ হাজার ৩২৪ টন। কৃষকরা বলছেন, হাওরে ধান তলিয়ে যাওয়া এ লক্ষ্যমাত্রার খুব সামান্যই এবার হয়তো পূরণ হতে পারে।

ad
ad

মাঠের রাজনীতি থেকে আরও পড়ুন

ঢাকা দক্ষিণ সিটিতে কোরবানির জন্য নির্ধারিত স্থান ৩৫৭টি

মাহবুবুর রহমান আরও বলেন, এরই মধ্যে ঈদের দিন কোরবানি শুরুর পর আট ঘণ্টার মধ্যে শহর থেকে বর্জ্য অপসারণের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। সে অনুযায়ী আমরা পরিকল্পনা নিয়েছি। নগরবাসীর কাছে আমাদের অনুরোধ, তারা যেন নির্ধারিত স্থানেই কোরবানি দেন।

১ দিন আগে

বগুড়ায় দাঁড়িয়ে থাকা বাসে ট্রাকের ধাক্কা, নিহত ২

বগুড়ার কাহালুতে চাকা পাংচার হয়ে রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা একটি বাসকে পেছন থেকে ট্রাক ধাক্কা দিলে দুইজন নিহত হয়েছেন। এ ঘটনায় আহত হয়েছেন আরও অন্তত চারজন।

১ দিন আগে

সৌদির সঙ্গে মিল রেখে পুঠিয়ায় ঈদের নামাজ

সারাদেশে যখন পবিত্র ঈদুল আজহা উদযাপনের প্রস্তুতি চলছে আগামীকাল বৃহস্পতিবারকে কেন্দ্র করে, ঠিক তখনই সৌদি আরবের সঙ্গে মিল রেখে রাজশাহীর পুঠিয়া উপজেলায় আগাম ঈদের নামাজ আদায় করেছেন কয়েকজন মুসল্লি।

১ দিন আগে

বড়লেখায় জমে উঠেছে কোরবানির পশুর হাট, সবার দৃষ্টি ‘নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী’তে

হাটে ক্রেতা-বিক্রেতাদের আগ্রহ ও আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছে বিশাল আকৃতির এক দেশি ষাঁড়, যার নাম রাখা হয়েছে ‘নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী’। প্রায় ২৮ মণ ওজনের এই গরু দেখতে হাটে ভিড় জমাচ্ছে উৎসুক মানুষ। খামারির দাবি, সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক উপায়ে লালন-পালন করা হয়েছে ষাঁড়টি। এর দাম হাঁকা হচ্ছে ৮ লাখ টাকা।

১ দিন আগে