অপ্রতিমকে ঘিরে স্বপ্ন এখন কেবল স্মৃতি

কুমিল্লা প্রতিনিধি
আপডেট : ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২১: ২৪
অপ্রতিমের স্মৃতি জড়িয়ে রয়েছে বাসার প্রবেশদ্বার থেকে শুরু করে সবখানে। কোলাজ: রাজনীতি ডটকম
অপ্রতিমের স্মৃতি জড়িয়ে রয়েছে বাসার প্রবেশদ্বার থেকে শুরু করে সবখানে। কোলাজ: রাজনীতি ডটকম

দরজার বাইরে ঝোলানো কাঠের নামফলকটি এখনো আগের মতোই আছে। মা-বাবার সঙ্গে হাস্যোজ্জ্বল এক বালকের ছবি, পাশে লেখা— ‘অপ্রতিমদের বাসা। প্রযত্নে- নাহিদ ও শাহরিয়ার।’ বাইরে থেকে দেখলে বোঝার উপায় নেই, এই বাসার ভেতর এখন কতটা শোক জমে আছে।

ছবির সেই বালক ইশায়্যাত শাহরিয়ার অপ্রতিম। কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. নাহিদা বেগম ও শাহরিয়ারের একমাত্র সন্তান, সপ্তম শ্রেণির ১৩ বছর বয়সী শিক্ষার্থী। তাকে ঘিরেই ছিল বাবা-মায়ের সব স্বপ্ন, আনন্দ ও ভবিষ্যতের পরিকল্পনা। এখন সেই বাসায় অপ্রতিম নেই। আছে তার ছবি, বই-খাতা, বিছানা আর অসংখ্য স্মৃতি।

রোববার (২০ সেপ্টেম্বর) কুমিল্লার মমতাজ ভিলার ওই বাসায় গিয়ে দেখা যায়, দরজা পেরোলেই চোখে পড়ে একটি ফটোফ্রেম। সেখানে অপ্রতিমের ছোটবেলার ১৫টি ছবি সাজানো। কোথাও সে হাসছে, কোথাও মা-বাবার সঙ্গে। বয়সের সঙ্গে বদলে যাওয়া মুখের প্রতিটি ছবিই এখন পরিবারের কাছে অমূল্য স্মৃতি।

বাসার নামফলকটি অপ্রতিমের নামেই তৈরি। ছবি: রাজনীতি ডটকম
বাসার নামফলকটি অপ্রতিমের নামেই তৈরি। ছবি: রাজনীতি ডটকম

অপ্রতিমের ঘরটিও প্রায় আগের মতোই আছে। সপ্তম শ্রেণির বই-খাতা পড়ে আছে, বিছানায় রয়েছে তার ব্যবহার করা জিনিসপত্র। বইয়ের তাকে সাজানো পছন্দের বইগুলোও আছে আগের জায়গায়। শুধু বই খুলে পড়তে বসা সেই কিশোরটি নেই।

একটি কক্ষে বসে ছিলেন অপ্রতিমের মা ড. নাহিদা বেগম। একমাত্র সন্তানকে হারানোর শোকে ভেঙে পড়েছেন তিনি। স্বজনেরা তাঁকে ঘিরে ছিলেন। কেউ সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করছেন, কেউ নীরবে পাশে বসে আছেন। সন্তানের আকস্মিক মৃত্যু যেন পুরো পরিবারকে থামিয়ে দিয়েছে।

আবেগজড়িত কণ্ঠে ড. নাহিদা বেগম বলেন, “ও-ই ছিল আমাদের সব। ওকে ঘিরেই আমাদের কত স্বপ্ন ছিল, কত পরিকল্পনা ছিল। ওর হাসি, ওর কথা, ওর ছোট ছোট আবদারেই আমাদের ঘরটা ভরে থাকত। আজ সেই ঘরেই ও নেই। ওর বই-খাতা আছে, বিছানায় ওর জিনিসপত্র আছে, কিন্তু ও নেই। আমরা কীভাবে এই শূন্যতা মেনে নেব, জানি না।”

অপ্রতিমের বাবা শাহরিয়ার ও পরিবারের অন্য সদস্যদের অবস্থাও একই। ঘরের প্রতিটি কোণে সন্তানের স্মৃতি, অথচ সেই স্মৃতির মানুষটিই নেই।

ঘরের দেয়ালে ফ্রেম জুড়ে অপ্রতিমের ছবি, যা এখন কেবলই স্মৃতি। ছবি: রাজনীতি ডটকম
ঘরের দেয়ালে ফ্রেম জুড়ে অপ্রতিমের ছবি, যা এখন কেবলই স্মৃতি। ছবি: রাজনীতি ডটকম

বৃহস্পতিবারও ছিল হাসি-আড্ডা

অপ্রতিমের বন্ধুদের কাছে বৃহস্পতিবারের দিনটি এখন কেবল স্মৃতি। সেদিনও এক বন্ধুর সঙ্গে ফুটবল খেলেছিল সে। সেই বন্ধু গোলকিপার ছিল। তাকে দেখে অপ্রতিম বলেছিল, জন্মদিনে তাকে গোলকিপিংয়ের গ্লাভস উপহার দেবে।

অপ্রতিমের ঘনিষ্ঠ এক বন্ধু বলেন, “বৃহস্পতিবার আমরা সবাই ফুটবল খেলছিলাম। আমি গোলকিপার ছিলাম। অপ্রতিম বলেছিল, আমার জন্মদিনে আমাকে গোলকিপারের গ্লাভস গিফট করবে। পরদিন শুক্রবার সকালে আমরা জানতে পারি, ওকে পাওয়া যাচ্ছে না। বৃহস্পতিবারও যে ছেলেটা আমাদের সঙ্গে খেলেছে, পরদিন তাকে আর খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না—এটা এখনো বিশ্বাস করতে কষ্ট হয়।”

শুক্রবার অপ্রতিম নিখোঁজ হওয়ার খবর ছড়িয়ে পড়ার পর স্বজন ও বন্ধুরা তাকে খুঁজতে শুরু করেন। পুলিশকেও বিষয়টি জানানো হয়। কিন্তু পরদিন দুপুরে আসে তার মরদেহ উদ্ধারের খবর।

ওই বন্ধু বলেন, “আমরা এমন একটি দেশে বসবাস করছি, যেখানে নিরাপত্তা নিয়ে আমাদের ভরসা করার জায়গা খুব কম। আমার ভাই নিখোঁজ ছিল, পুলিশকে জানানো হলেও তাকে খুঁজে বের করা যায়নি। পরদিন দুপুরে তার লাশ পাওয়া গেছে। আমরা চাই, আমার ভাইয়ের খুনিদের দ্রুত আইনের আওতায় এনে উপযুক্ত বিচার করা হোক।”

‘খুব সহজ-সরল ছিল অপ্রতিম’

বন্ধুদের কাছে অপ্রতিম শুধু সহপাঠী বা খেলার সঙ্গী ছিল না, ছিল হাসি-আড্ডার আপনজন। তার স্বভাবের কথা বলতে গিয়ে এক বন্ধু বলেন, “খুবই ভালো মানুষ ছিল অপ্রতিম। তার মধ্যে কখনো হিংসা-বিদ্বেষ দেখিনি। সে কখনো কারও সঙ্গে উঁচু গলায় কথা বলত না। খুবই সহজ-সরল একজন মানুষ ছিল। তার এমন নির্মম মৃত্যু আমরা কখনো আশা করিনি।”

আরেক বন্ধু বলেন, “অপ্রতিম সবসময় হাসিখুশি ছিল। সবার সঙ্গে মিশত। ওর নিখোঁজের খবর পাওয়ার পর থেকেই আমরা ভেঙে পড়েছিলাম। পরে যখন ওর মরদেহ উদ্ধারের খবর শুনি, বিশ্বাসই হচ্ছিল না। কিছুতেই মানতে পারছি না, ও আমাদের ছেড়ে চলে গেছে।”

তাকে সাজানো অপ্রতিমের বই-খাতা। আর সেগুলো ব্যবহার করবে না কেউ। ছবি: রাজনীতি ডটকম
তাকে সাজানো অপ্রতিমের বই-খাতা। আর সেগুলো ব্যবহার করবে না কেউ। ছবি: রাজনীতি ডটকম

হত্যার বিচার চান বন্ধুরা

অপ্রতিমের মৃত্যুর ঘটনায় ক্ষোভ ও বিচারের দাবিতে রোববার কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভ মিছিল করেন। সেখানে অপ্রতিমের বন্ধুরাও তার হত্যার বিচার দাবি করেন।

বিক্ষোভে অংশ নেওয়া এক বন্ধু বলেন, “যারা অপ্রতিমকে হত্যা করেছে, আমরা তাদের কঠিন থেকে কঠিনতর শাস্তি চাই। আমরা চাই, প্রশাসন তাদের দ্রুত আইনের আওতায় আনুক এবং অপ্রতিম যেন উপযুক্ত বিচার পায়।”

আরেক বন্ধু বলেন, “যে মানুষটি অপ্রতিমের সঙ্গে এমন নির্মম আচরণ করেছে, আমরা তার সর্বোচ্চ শাস্তি চাই। প্রশাসনের কাছে আমাদের একটাই দাবি—অপ্রতিমের হত্যার সুষ্ঠু তদন্ত ও উপযুক্ত বিচার নিশ্চিত করা হোক।”

বন্ধুদের কথায় বারবার ফিরে আসে সেই বৃহস্পতিবারের ফুটবল মাঠ। কয়েক ঘণ্টা আগেও যে কিশোর বন্ধুর জন্মদিনে গ্লাভস উপহার দেওয়ার কথা বলছিল, এখন সেই বন্ধুর কাছে অপ্রতিমের ছবিই স্মৃতি। একটি ফুটবল, গ্লাভস দেওয়ার প্রতিশ্রুতি আর কয়েকটি হাসিমুখের ছবি—এসবই এখন তাকে মনে রাখার অবলম্বন।

থেমে গেছে পরিবারের সব স্বপ্ন

অপ্রতিম ছিল বাবা-মায়ের একমাত্র সন্তান। তার বেড়ে ওঠার প্রতিটি ধাপের সঙ্গে জড়িয়ে ছিল পরিবারের ভবিষ্যতের স্বপ্ন। পড়াশোনা, পছন্দের বই, স্কুল ও বন্ধুদের ঘিরে ছিল মা-বাবার নানা পরিকল্পনা।

সেই স্বপ্নগুলো এখন পড়ে আছে অপ্রতিমের ঘরের বইয়ের তাকে, ছবির ফ্রেমে আর দরজার বাইরে ঝোলানো কাঠের নামফলকে।

শুক্রবার দুপুরের পর বাসা থেকে আইফোন নিয়ে বের হওয়ার পর নিখোঁজ হয় অপ্রতিম। পরে শনিবার দুপুরে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের দক্ষিণ গেটের পাশে বিনোদন পার্ক ‘ম্যাজিক প্যারাডাইস’ সংলগ্ন দক্ষিণ সানন্দা এলাকার জঙ্গল থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়।

বাইরে থেকে ‘অপ্রতিমদের বাসা’ লেখা নামফলকটি এখনো আগের মতোই আছে। ছবির সেই হাস্যোজ্জ্বল বালকটিও সেখানে আছে। শুধু সে আর কোনোদিন দরজা খুলে ঘরে ফিরবে না।

Ad
ad
Ad 300x250

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

Ad 300x250
ad
Advertisement