
ডেস্ক, রাজনীতি ডটকম

২০১৬ সালের ২৩ জুন ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) ছাড়ার পক্ষে যুক্তরাজ্যের গণভোটের ফল প্রকাশের পর দেশ জুড়ে যে রাজনৈতিক অস্থিরতার সূচনা হয়েছিল, এক দশক পরও তার রেশ কাটেনি। অল্প ব্যবধানে জয় পাওয়া সেই গণভোট শুধু যুক্তরাজ্যের ইউরোপীয় অধ্যায়ের সমাপ্তিই ঘটায়নি, বরং এমন এক রাজনৈতিক বিভাজনের জন্ম দিয়েছিল, যা সময়ের সঙ্গে আরও গভীর হয়েছে।
ব্রেক্সিটের ১০ বছর পূর্তিতে জনমতও আগের মতো নেই। বিভিন্ন জরিপে দেখা যাচ্ছে, ‘লিভ’ বা ইইউ ছাড়ার পক্ষে ভোট দেওয়া প্রায় ২৩ শতাংশ মানুষ এখন সেই সিদ্ধান্তের জন্য অনুতপ্ত। কারও মতে, ইউরোপ সম্পর্কে তাদের দৃষ্টিভঙ্গি বদলেছে; আবার কেউ মনে করেন, ব্রেক্সিট কার্যকর করার পুরো প্রক্রিয়াটিই রাজনীতিকরা সঠিকভাবে পরিচালনা করতে পারেননি।
তবে ব্রেক্সিট সফল হয়েছে কি না— এই বিতর্কের বাইরে অর্থনীতিবিদদের কাছে একটি বিষয় এখন প্রায় প্রতিষ্ঠিত। গত এক দশকের তথ্য বিশ্লেষণ করে তারা বলছেন, ব্রেক্সিট যুক্তরাজ্যের অর্থনীতিকে উল্লেখযোগ্যভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে।
বর্তমান হিসাব অনুযায়ী, ব্রেক্সিটের কারণে যুক্তরাজ্যের মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) প্রায় ৮ শতাংশ পর্যন্ত কমে গেছে। অর্থাৎ ব্রেক্সিট না হলে একজন গড় ব্রিটিশ নাগরিক আজ যে অবস্থানে থাকতেন, তার তুলনায় তিনি এখন প্রায় ৮ শতাংশ দরিদ্র। শুধু ব্যক্তি পর্যায়েই নয়, জাতীয় অর্থনীতিতেও এর বড় প্রভাব পড়েছে।
লন্ডনের কিংস কলেজের অর্থনীতি ও জননীতি বিভাগের অধ্যাপক জোনাথন পোর্টেস বলেন, এর অর্থ হলো— সরকারের কর আদায়ও উল্লেখযোগ্য পরিমাণে কমে গেছে। আর সেই অর্থই সাধারণত স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা এবং অন্যান্য জনসেবায় ব্যয় করা হয়। তার ভাষায়, ‘অর্থনীতিবিদদের মধ্যে এখন প্রায় স্পষ্ট ঐকমত্য রয়েছে, ব্রেক্সিট যুক্তরাজ্যের অর্থনীতির উল্লেখযোগ্য ক্ষতি করেছে।’
ব্রেক্সিটের প্রকৃত অর্থনৈতিক প্রভাব নির্ণয়ের জন্য স্ট্যানফোর্ড ইউনিভার্সিটির ইনস্টিটিউট ফর ইকোনমিক পলিসি রিসার্চের গবেষকেরা দুটি আলাদা পদ্ধতি ব্যবহার করেন।
প্রথম পদ্ধতিতে গত ১০ বছরে যুক্তরাজ্যের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির হারকে অন্যান্য উন্নত দেশের সঙ্গে তুলনা করা হয়। এই বিশ্লেষণে কোভিড-১৯ মহামারি, ইউক্রেন যুদ্ধ ও মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের মতো বৈশ্বিক ধাক্কাগুলোকেও বিবেচনায় নেওয়া হয়, যেন শুধু ব্রেক্সিটের প্রভাব আলাদা করে বোঝা যায়।
গবেষণার অন্যতম লেখক এবং ইউনিভার্সিটি অব নটিংহামের অর্থনীতির সহযোগী অধ্যাপক গ্রেগরি থওয়েটস বলেন, ‘ব্রেক্সিট গণভোটের আগে যুক্তরাজ্যের অর্থনীতি মোটামুটি ভালো অবস্থায় ছিল। কিন্তু এরপর থেকে একই ধরনের দেশগুলোর তুলনায় আমরা পিছিয়ে পড়েছি।’
তার মতে, অন্যান্য দেশের সঙ্গে তুলনা করলে দেখা যায়, ব্রেক্সিট না হলে যুক্তরাজ্যের অর্থনীতি বর্তমানের তুলনায় প্রায় ৮ শতাংশ বড় হতে পারত।
দ্বিতীয় পদ্ধতিতে গবেষকরা যুক্তরাজ্যের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম বিশ্লেষণ করেন। বিশেষ করে যেসব কোম্পানির ব্যবসা এখনো ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত, সেগুলোর পারফরম্যান্স তুলনা করা হয় এমন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে, যাদের ইউরোপীয় বাজারের ওপর নির্ভরতা তুলনামূলক কম। ফলাফল ছিল একই ধরনের।
থওয়েটস বলেন, যেসব প্রতিষ্ঠান এখনো ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে বেশি ব্যবসা করছে, তাদের পারফরম্যান্স স্পষ্টভাবেই খারাপ হয়েছে। এই হিসাব অনুযায়ীও দেখা যায়, ব্রেক্সিটের কারণে যুক্তরাজ্যের অর্থনীতি প্রায় ৬ শতাংশ ছোট হয়ে গেছে।
অর্থাৎ দুটি ভিন্ন গবেষণা পদ্ধতির ফলাফলই একই দিকে ইঙ্গিত করছে— ব্রেক্সিটের অর্থনৈতিক ক্ষতি বাস্তব এবং তা পরিসংখ্যানেও স্পষ্ট।
ব্রেক্সিটের সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়েছে যুক্তরাজ্যের পণ্য রপ্তানিতে। বিশেষ করে গাড়ি শিল্প এবং কৃষি ও খাদ্যপণ্যের ব্যবসা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কারণ ইউরোপীয় ইউনিয়ন ছাড়ার পর সীমান্তে নতুন নিয়ম, কাস্টমস প্রক্রিয়া ও অতিরিক্ত কাগজপত্রের বাধ্যবাধকতা ব্যবসাকে আগের তুলনায় অনেক বেশি সময়সাপেক্ষ ও ব্যয়বহুল করে তুলেছে। এর বাস্তব চিত্রও উঠে এসেছে ব্যবসায়ীদের অভিজ্ঞতায়।
চলতি বছরের জানুয়ারিতে যুক্তরাজ্যের পার্লামেন্টের একটি কমিটির সামনে এক লজিস্টিকস প্রতিষ্ঠানের মালিক জানান, ব্রেক্সিটের আগে ইউরোপীয় ইউনিয়নে ভেড়া বা গরুর মাংস রপ্তানি করতে একটি কাগজই যথেষ্ট ছিল। এখন একই পণ্য পাঠাতে প্রয়োজন হয় ২৬টি সরকারি সিলমোহরযুক্ত বিশাল কাগজপত্রের একটি ফাইল। তার ভাষায়, পুরো প্রক্রিয়াটি ‘নরকযন্ত্রণা’র মতো।
অবশ্য দুপক্ষের মধ্যে নতুন একটি বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে কাজ চলছে। এটি কার্যকর হলে দুগ্ধজাত পণ্য, ডিম, মাছ এবং তাজা লাল মাংসের মতো খাদ্যপণ্য রপ্তানি অনেক সহজ হতে পারে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, এই ব্যবস্থা ২০২৭ সালের গ্রীষ্ম থেকে কার্যকর হওয়ার কথা।

কিন্তু অনেক ব্যবসার জন্য সেই স্বস্তি আসবে অনেক দেরিতে। কারণ অতিরিক্ত খরচ ও প্রশাসনিক জটিলতার চাপ সামলাতে না পেরে ইতোমধ্যে বহু প্রতিষ্ঠান ব্যবসা গুটিয়ে ফেলেছে।
ব্রিটেনের ফুড অ্যান্ড ড্রিংক ফেডারেশনের তথ্য অনুযায়ী, ব্রেক্সিট কার্যকর হওয়ার পর থেকে ইউরোপীয় ইউনিয়নে যুক্তরাজ্যের খাদ্যপণ্য রপ্তানি প্রায় এক-চতুর্থাংশ কমে গেছে।
ব্রেক্সিটের অর্থনৈতিক প্রভাব শুধু পরিসংখ্যান বা জিডিপি সংকোচনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; গত এক দশকের পরিবর্তিত বৈশ্বিক বাস্তবতায় এটি যুক্তরাজ্যের জীবনযাত্রার ব্যয়, জনসেবা এবং সামাজিক বৈষম্যের ওপরও গভীর প্রভাব ফেলেছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, ব্রেক্সিটের কারণে যুক্তরাজ্যের অর্থনীতি যে ধাক্কা খেয়েছে, তা এমন একসময়ে এসেছে যখন দেশটির এই ক্ষতি সামাল দেওয়ার সক্ষমতা তুলনামূলকভাবে দুর্বল ছিল।
গবেষণায় দেখা যাচ্ছে, ব্রেক্সিট যুক্তরাজ্যের খাদ্যদ্রব্যের মূল্যস্ফীতিতে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রেখেছে। বিশেষ করে মৌলিক খাদ্যপণ্যের দাম দ্রুত বেড়েছে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, কমলা রসের মতো সাধারণ পণ্যের দাম ১৩৪ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে গেছে, যা সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রার ওপর বড় চাপ তৈরি করেছে।
অর্থনীতিবিদ গ্রেগরি থওয়েটস বলেন, উচ্চ আয়ের মানুষ এই মূল্যবৃদ্ধি কিছুটা সামাল দিতে পারলেও নিম্ন আয়ের মানুষের ওপর এর প্রভাব অনেক বেশি। তার ভাষায়, ‘এটি নিচের স্তরের মানুষদের সবচেয়ে বেশি আঘাত করেছে, যার ফলে দরিদ্র জনগোষ্ঠী আরও বেশি চাপের মধ্যে পড়েছে।’
তবে থওয়েটস এমন সতর্কতাও দিয়েছেন, দারিদ্র্য বা খাদ্য ব্যাংকের ব্যবহার বৃদ্ধির মতো বিষয়গুলোকে শুধু ব্রেক্সিটের সঙ্গে সরাসরি এক লাইনে যুক্ত করা ঠিক নয়। কারণ এর পেছনে আরও অনেক সামাজিক ও অর্থনৈতিক কারণ কাজ করে।

অর্থনীতিবিদ জোনাথন পোর্টেস বলেন, ব্রেক্সিট যুক্তরাজ্যের একমাত্র অর্থনৈতিক সমস্যা নয়। তার মতে, অনেক ইউরোপীয় দেশের মতোই যুক্তরাজ্যের অর্থনীতিতেও বিনিয়োগের ঘাটতি, ধীর প্রবৃদ্ধি এবং উদ্ভাবনের অভাব রয়েছে। তবে তিনি স্পষ্ট করে বলেন, এই সব সমস্যার পাশাপাশি ব্রেক্সিট একটি অতিরিক্ত চাপ তৈরি করেছে।
পোর্টেসের ভাষায়, ‘ব্রেক্সিট যুক্তরাজ্যের সব সমস্যার একমাত্র কারণ নয়, কিন্তু এটি অবশ্যই অর্থনীতিকে পিছিয়ে দিয়েছে।’
ব্রেক্সিটের কারণে সৃষ্ট অর্থনৈতিক ক্ষতির একটি বড় প্রভাব পড়েছে সরকারি আয় বা কর রাজস্বের ওপর। জিডিপি কমে যাওয়ার অর্থ হলো— সরকারের কর আদায় কমে যাওয়া, যা সরাসরি স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা, অবকাঠামো ও অন্যান্য জনসেবার ওপর প্রভাব ফেলে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, এই রাজস্ব ঘাটতি যুক্তরাজ্যের ইতোমধ্যে চাপের মধ্যে থাকা জনসেবা ব্যবস্থাকে আরও দুর্বল করেছে। কারাগার ব্যবস্থা ‘গুরুতর সংকটে’, জাতীয় সড়ক অবকাঠামো ধীরে ধীরে অবনতি হচ্ছে, এবং প্রতিরক্ষা খাতেও বাজেট সংকোচনের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
২০১০-এর দশকে ডেভিড ক্যামেরনের সরকারের সময় যে ‘অস্টেরিটি’ বা ব্যয় সংকোচন নীতি গ্রহণ করা হয়েছিল, তার পূর্ণ পুনরুদ্ধার এখনো হয়নি। সেই একই সরকারের আমলেই ব্রেক্সিট গণভোট অনুষ্ঠিত হয়েছিল, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, এসব সমস্যার পেছনে ব্রেক্সিট একমাত্র কারণ না হলেও, এটি সামগ্রিক আর্থিক সক্ষমতা কমিয়ে পরিস্থিতিকে আরও কঠিন করে তুলেছে।
ব্রেক্সিটের ক্ষতি কমানোর সম্ভাব্য উপায় হিসেবে বিশেষজ্ঞরা দুটি পথের কথা বলছেন— প্রথমত, ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে আরও ঘনিষ্ঠ অর্থনৈতিক সম্পর্ক গড়ে তোলা, যেন বাণিজ্য ও পরিষেবা খাতে কিছু বাধা কমে; এবং দ্বিতীয়ত, অভ্যন্তরীণ নীতি সংস্কার, বিনিয়োগ বৃদ্ধি ও উৎপাদনশীলতা উন্নয়নের মাধ্যমে অর্থনীতিকে শক্তিশালী করা।
গ্রেগরি থওয়েটস বলেন, এই ক্ষতি পুরোপুরি উলটে দেওয়া এখন প্রায় অসম্ভব, তবে কিছুটা কমানো সম্ভব। আমার পূর্বাভাস, ক্ষতির বর্তমান স্তরই আগামী দিনগুলোতে মোটামুটি একইভাবে চলতে থাকবে।
এক দশক পর ব্রেক্সিট এখন আর শুধু রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নয়— এটি যুক্তরাজ্যের অর্থনীতির কাঠামোর অংশও হয়ে উঠেছে। জিডিপি সংকোচন, বাণিজ্য বাধা, মূল্যস্ফীতি এবং জনসেবার ওপর চাপ— সব মিলিয়ে এর প্রভাব বহুমাত্রিক।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ক্ষতির ছাপ আগামী বহু বছর ধরে যুক্তরাজ্যের অর্থনীতিতে থেকে যাবে, এবং পুনরুদ্ধারের গতি নির্ভর করবে রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে ভবিষ্যৎ সম্পর্ক কতটা ঘনিষ্ঠ হয় তার ওপর।
[ফ্রান্স২৪ অবলম্বনে]

২০১৬ সালের ২৩ জুন ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) ছাড়ার পক্ষে যুক্তরাজ্যের গণভোটের ফল প্রকাশের পর দেশ জুড়ে যে রাজনৈতিক অস্থিরতার সূচনা হয়েছিল, এক দশক পরও তার রেশ কাটেনি। অল্প ব্যবধানে জয় পাওয়া সেই গণভোট শুধু যুক্তরাজ্যের ইউরোপীয় অধ্যায়ের সমাপ্তিই ঘটায়নি, বরং এমন এক রাজনৈতিক বিভাজনের জন্ম দিয়েছিল, যা সময়ের সঙ্গে আরও গভীর হয়েছে।
ব্রেক্সিটের ১০ বছর পূর্তিতে জনমতও আগের মতো নেই। বিভিন্ন জরিপে দেখা যাচ্ছে, ‘লিভ’ বা ইইউ ছাড়ার পক্ষে ভোট দেওয়া প্রায় ২৩ শতাংশ মানুষ এখন সেই সিদ্ধান্তের জন্য অনুতপ্ত। কারও মতে, ইউরোপ সম্পর্কে তাদের দৃষ্টিভঙ্গি বদলেছে; আবার কেউ মনে করেন, ব্রেক্সিট কার্যকর করার পুরো প্রক্রিয়াটিই রাজনীতিকরা সঠিকভাবে পরিচালনা করতে পারেননি।
তবে ব্রেক্সিট সফল হয়েছে কি না— এই বিতর্কের বাইরে অর্থনীতিবিদদের কাছে একটি বিষয় এখন প্রায় প্রতিষ্ঠিত। গত এক দশকের তথ্য বিশ্লেষণ করে তারা বলছেন, ব্রেক্সিট যুক্তরাজ্যের অর্থনীতিকে উল্লেখযোগ্যভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে।
বর্তমান হিসাব অনুযায়ী, ব্রেক্সিটের কারণে যুক্তরাজ্যের মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) প্রায় ৮ শতাংশ পর্যন্ত কমে গেছে। অর্থাৎ ব্রেক্সিট না হলে একজন গড় ব্রিটিশ নাগরিক আজ যে অবস্থানে থাকতেন, তার তুলনায় তিনি এখন প্রায় ৮ শতাংশ দরিদ্র। শুধু ব্যক্তি পর্যায়েই নয়, জাতীয় অর্থনীতিতেও এর বড় প্রভাব পড়েছে।
লন্ডনের কিংস কলেজের অর্থনীতি ও জননীতি বিভাগের অধ্যাপক জোনাথন পোর্টেস বলেন, এর অর্থ হলো— সরকারের কর আদায়ও উল্লেখযোগ্য পরিমাণে কমে গেছে। আর সেই অর্থই সাধারণত স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা এবং অন্যান্য জনসেবায় ব্যয় করা হয়। তার ভাষায়, ‘অর্থনীতিবিদদের মধ্যে এখন প্রায় স্পষ্ট ঐকমত্য রয়েছে, ব্রেক্সিট যুক্তরাজ্যের অর্থনীতির উল্লেখযোগ্য ক্ষতি করেছে।’
ব্রেক্সিটের প্রকৃত অর্থনৈতিক প্রভাব নির্ণয়ের জন্য স্ট্যানফোর্ড ইউনিভার্সিটির ইনস্টিটিউট ফর ইকোনমিক পলিসি রিসার্চের গবেষকেরা দুটি আলাদা পদ্ধতি ব্যবহার করেন।
প্রথম পদ্ধতিতে গত ১০ বছরে যুক্তরাজ্যের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির হারকে অন্যান্য উন্নত দেশের সঙ্গে তুলনা করা হয়। এই বিশ্লেষণে কোভিড-১৯ মহামারি, ইউক্রেন যুদ্ধ ও মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের মতো বৈশ্বিক ধাক্কাগুলোকেও বিবেচনায় নেওয়া হয়, যেন শুধু ব্রেক্সিটের প্রভাব আলাদা করে বোঝা যায়।
গবেষণার অন্যতম লেখক এবং ইউনিভার্সিটি অব নটিংহামের অর্থনীতির সহযোগী অধ্যাপক গ্রেগরি থওয়েটস বলেন, ‘ব্রেক্সিট গণভোটের আগে যুক্তরাজ্যের অর্থনীতি মোটামুটি ভালো অবস্থায় ছিল। কিন্তু এরপর থেকে একই ধরনের দেশগুলোর তুলনায় আমরা পিছিয়ে পড়েছি।’
তার মতে, অন্যান্য দেশের সঙ্গে তুলনা করলে দেখা যায়, ব্রেক্সিট না হলে যুক্তরাজ্যের অর্থনীতি বর্তমানের তুলনায় প্রায় ৮ শতাংশ বড় হতে পারত।
দ্বিতীয় পদ্ধতিতে গবেষকরা যুক্তরাজ্যের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম বিশ্লেষণ করেন। বিশেষ করে যেসব কোম্পানির ব্যবসা এখনো ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত, সেগুলোর পারফরম্যান্স তুলনা করা হয় এমন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে, যাদের ইউরোপীয় বাজারের ওপর নির্ভরতা তুলনামূলক কম। ফলাফল ছিল একই ধরনের।
থওয়েটস বলেন, যেসব প্রতিষ্ঠান এখনো ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে বেশি ব্যবসা করছে, তাদের পারফরম্যান্স স্পষ্টভাবেই খারাপ হয়েছে। এই হিসাব অনুযায়ীও দেখা যায়, ব্রেক্সিটের কারণে যুক্তরাজ্যের অর্থনীতি প্রায় ৬ শতাংশ ছোট হয়ে গেছে।
অর্থাৎ দুটি ভিন্ন গবেষণা পদ্ধতির ফলাফলই একই দিকে ইঙ্গিত করছে— ব্রেক্সিটের অর্থনৈতিক ক্ষতি বাস্তব এবং তা পরিসংখ্যানেও স্পষ্ট।
ব্রেক্সিটের সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়েছে যুক্তরাজ্যের পণ্য রপ্তানিতে। বিশেষ করে গাড়ি শিল্প এবং কৃষি ও খাদ্যপণ্যের ব্যবসা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কারণ ইউরোপীয় ইউনিয়ন ছাড়ার পর সীমান্তে নতুন নিয়ম, কাস্টমস প্রক্রিয়া ও অতিরিক্ত কাগজপত্রের বাধ্যবাধকতা ব্যবসাকে আগের তুলনায় অনেক বেশি সময়সাপেক্ষ ও ব্যয়বহুল করে তুলেছে। এর বাস্তব চিত্রও উঠে এসেছে ব্যবসায়ীদের অভিজ্ঞতায়।
চলতি বছরের জানুয়ারিতে যুক্তরাজ্যের পার্লামেন্টের একটি কমিটির সামনে এক লজিস্টিকস প্রতিষ্ঠানের মালিক জানান, ব্রেক্সিটের আগে ইউরোপীয় ইউনিয়নে ভেড়া বা গরুর মাংস রপ্তানি করতে একটি কাগজই যথেষ্ট ছিল। এখন একই পণ্য পাঠাতে প্রয়োজন হয় ২৬টি সরকারি সিলমোহরযুক্ত বিশাল কাগজপত্রের একটি ফাইল। তার ভাষায়, পুরো প্রক্রিয়াটি ‘নরকযন্ত্রণা’র মতো।
অবশ্য দুপক্ষের মধ্যে নতুন একটি বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে কাজ চলছে। এটি কার্যকর হলে দুগ্ধজাত পণ্য, ডিম, মাছ এবং তাজা লাল মাংসের মতো খাদ্যপণ্য রপ্তানি অনেক সহজ হতে পারে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, এই ব্যবস্থা ২০২৭ সালের গ্রীষ্ম থেকে কার্যকর হওয়ার কথা।

কিন্তু অনেক ব্যবসার জন্য সেই স্বস্তি আসবে অনেক দেরিতে। কারণ অতিরিক্ত খরচ ও প্রশাসনিক জটিলতার চাপ সামলাতে না পেরে ইতোমধ্যে বহু প্রতিষ্ঠান ব্যবসা গুটিয়ে ফেলেছে।
ব্রিটেনের ফুড অ্যান্ড ড্রিংক ফেডারেশনের তথ্য অনুযায়ী, ব্রেক্সিট কার্যকর হওয়ার পর থেকে ইউরোপীয় ইউনিয়নে যুক্তরাজ্যের খাদ্যপণ্য রপ্তানি প্রায় এক-চতুর্থাংশ কমে গেছে।
ব্রেক্সিটের অর্থনৈতিক প্রভাব শুধু পরিসংখ্যান বা জিডিপি সংকোচনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; গত এক দশকের পরিবর্তিত বৈশ্বিক বাস্তবতায় এটি যুক্তরাজ্যের জীবনযাত্রার ব্যয়, জনসেবা এবং সামাজিক বৈষম্যের ওপরও গভীর প্রভাব ফেলেছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, ব্রেক্সিটের কারণে যুক্তরাজ্যের অর্থনীতি যে ধাক্কা খেয়েছে, তা এমন একসময়ে এসেছে যখন দেশটির এই ক্ষতি সামাল দেওয়ার সক্ষমতা তুলনামূলকভাবে দুর্বল ছিল।
গবেষণায় দেখা যাচ্ছে, ব্রেক্সিট যুক্তরাজ্যের খাদ্যদ্রব্যের মূল্যস্ফীতিতে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রেখেছে। বিশেষ করে মৌলিক খাদ্যপণ্যের দাম দ্রুত বেড়েছে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, কমলা রসের মতো সাধারণ পণ্যের দাম ১৩৪ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে গেছে, যা সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রার ওপর বড় চাপ তৈরি করেছে।
অর্থনীতিবিদ গ্রেগরি থওয়েটস বলেন, উচ্চ আয়ের মানুষ এই মূল্যবৃদ্ধি কিছুটা সামাল দিতে পারলেও নিম্ন আয়ের মানুষের ওপর এর প্রভাব অনেক বেশি। তার ভাষায়, ‘এটি নিচের স্তরের মানুষদের সবচেয়ে বেশি আঘাত করেছে, যার ফলে দরিদ্র জনগোষ্ঠী আরও বেশি চাপের মধ্যে পড়েছে।’
তবে থওয়েটস এমন সতর্কতাও দিয়েছেন, দারিদ্র্য বা খাদ্য ব্যাংকের ব্যবহার বৃদ্ধির মতো বিষয়গুলোকে শুধু ব্রেক্সিটের সঙ্গে সরাসরি এক লাইনে যুক্ত করা ঠিক নয়। কারণ এর পেছনে আরও অনেক সামাজিক ও অর্থনৈতিক কারণ কাজ করে।

অর্থনীতিবিদ জোনাথন পোর্টেস বলেন, ব্রেক্সিট যুক্তরাজ্যের একমাত্র অর্থনৈতিক সমস্যা নয়। তার মতে, অনেক ইউরোপীয় দেশের মতোই যুক্তরাজ্যের অর্থনীতিতেও বিনিয়োগের ঘাটতি, ধীর প্রবৃদ্ধি এবং উদ্ভাবনের অভাব রয়েছে। তবে তিনি স্পষ্ট করে বলেন, এই সব সমস্যার পাশাপাশি ব্রেক্সিট একটি অতিরিক্ত চাপ তৈরি করেছে।
পোর্টেসের ভাষায়, ‘ব্রেক্সিট যুক্তরাজ্যের সব সমস্যার একমাত্র কারণ নয়, কিন্তু এটি অবশ্যই অর্থনীতিকে পিছিয়ে দিয়েছে।’
ব্রেক্সিটের কারণে সৃষ্ট অর্থনৈতিক ক্ষতির একটি বড় প্রভাব পড়েছে সরকারি আয় বা কর রাজস্বের ওপর। জিডিপি কমে যাওয়ার অর্থ হলো— সরকারের কর আদায় কমে যাওয়া, যা সরাসরি স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা, অবকাঠামো ও অন্যান্য জনসেবার ওপর প্রভাব ফেলে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, এই রাজস্ব ঘাটতি যুক্তরাজ্যের ইতোমধ্যে চাপের মধ্যে থাকা জনসেবা ব্যবস্থাকে আরও দুর্বল করেছে। কারাগার ব্যবস্থা ‘গুরুতর সংকটে’, জাতীয় সড়ক অবকাঠামো ধীরে ধীরে অবনতি হচ্ছে, এবং প্রতিরক্ষা খাতেও বাজেট সংকোচনের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
২০১০-এর দশকে ডেভিড ক্যামেরনের সরকারের সময় যে ‘অস্টেরিটি’ বা ব্যয় সংকোচন নীতি গ্রহণ করা হয়েছিল, তার পূর্ণ পুনরুদ্ধার এখনো হয়নি। সেই একই সরকারের আমলেই ব্রেক্সিট গণভোট অনুষ্ঠিত হয়েছিল, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, এসব সমস্যার পেছনে ব্রেক্সিট একমাত্র কারণ না হলেও, এটি সামগ্রিক আর্থিক সক্ষমতা কমিয়ে পরিস্থিতিকে আরও কঠিন করে তুলেছে।
ব্রেক্সিটের ক্ষতি কমানোর সম্ভাব্য উপায় হিসেবে বিশেষজ্ঞরা দুটি পথের কথা বলছেন— প্রথমত, ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে আরও ঘনিষ্ঠ অর্থনৈতিক সম্পর্ক গড়ে তোলা, যেন বাণিজ্য ও পরিষেবা খাতে কিছু বাধা কমে; এবং দ্বিতীয়ত, অভ্যন্তরীণ নীতি সংস্কার, বিনিয়োগ বৃদ্ধি ও উৎপাদনশীলতা উন্নয়নের মাধ্যমে অর্থনীতিকে শক্তিশালী করা।
গ্রেগরি থওয়েটস বলেন, এই ক্ষতি পুরোপুরি উলটে দেওয়া এখন প্রায় অসম্ভব, তবে কিছুটা কমানো সম্ভব। আমার পূর্বাভাস, ক্ষতির বর্তমান স্তরই আগামী দিনগুলোতে মোটামুটি একইভাবে চলতে থাকবে।
এক দশক পর ব্রেক্সিট এখন আর শুধু রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নয়— এটি যুক্তরাজ্যের অর্থনীতির কাঠামোর অংশও হয়ে উঠেছে। জিডিপি সংকোচন, বাণিজ্য বাধা, মূল্যস্ফীতি এবং জনসেবার ওপর চাপ— সব মিলিয়ে এর প্রভাব বহুমাত্রিক।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ক্ষতির ছাপ আগামী বহু বছর ধরে যুক্তরাজ্যের অর্থনীতিতে থেকে যাবে, এবং পুনরুদ্ধারের গতি নির্ভর করবে রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে ভবিষ্যৎ সম্পর্ক কতটা ঘনিষ্ঠ হয় তার ওপর।
[ফ্রান্স২৪ অবলম্বনে]

নূর নবী বলেন, আগামী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে অংশীজনদের সঙ্গে আলোচনার ভিত্তিতে সৎ, যোগ্য, অভিজ্ঞ ও পেশাদার ব্যক্তিদের সমন্বয়ে ইসলামী ব্যাংকের স্বাধীন ও পূর্ণাঙ্গ পরিচালনা পর্ষদ গঠন করতে হবে। একই সঙ্গে ২০১৭ সালে যেসব শেয়ারহোল্ডারের মালিকানা কেড়ে নেওয়া হয়েছিল, তা ফিরিয়ে দেওয়ার দাবি জানান তিনি।
২ দিন আগে
অর্থনীতি নানামুখী চাপে থাকায় এবং ব্যবসা-বাণিজ্য পরিস্থিতিরও তেমন ‘উন্নতি না মেলায়’ আগামী দুই বছর সময় ‘কঠিন’ যাবে বলে সতর্ক করেছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। তবে ব্যবসায় চাঙ্গা ভাব না এলেও এবং অর্থনীতি স্থিতিশীল না হওয়া সত্ত্বেও চলতি অর্থবছরের তুলনায় প্রায় ১৯ শতাংশ সরকারি ব্যয় বৃদ্ধির বাজেট
২ দিন আগে
বার্তা সংস্থা রয়টার্সের খবরে বলা হয়, গ্রিনিচ মান সময় (জিএমটি) ০৬টা ৩৩মিনিট নাগাদ আন্তর্জাতিক বাজারে বেঞ্চমার্ক ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেল প্রতি ১ দশমিক ৬৮ ডলার বা ২ দশমিক ০৯ শতাংশ কমে ৭৮ দশমিক ৮৯ ডলারে নেমে আসে। অথচ আজ দিনের শুরুতে লেনদেনের শুরুতে এই দাম বেড়ে ব্যারেল প্রতি ৮২ দশমিক ৩০ ডলারে পৌঁছেছি
২ দিন আগে
প্রধানমন্ত্রীর এ সফর ঘিরে সরকার ও ব্যবসায়ী মহলের প্রত্যাশা— দীর্ঘদিনের শ্রমবাজারকেন্দ্রিক বাংলাদেশ-মালয়েশিয়া সম্পর্ক এবার বাণিজ্য, বিনিয়োগ, জ্বালানি, শিক্ষা, হালাল অর্থনীতি ও প্রযুক্তি সহযোগিতার মতো নতুন ক্ষেত্রে আরও বিস্তৃত হবে।
৩ দিন আগে