বিএনপি থেকে ছাড়, তবু ভোটে ফেল তারা

শাহরিয়ার শরীফ
(ওপরের সারিতে বাঁ থেকে) সাইফুল হক, ড. রেদওয়ান, ফরিদুজ্জামান ফরহাদ; (মাঝের সারিতে বাঁ থেকে) উবায়দুল্লাহ ফারুক, জুনায়েদ আল হাবীব ও মনজুরুল ইসলাম; (নিচের সারিতে বাঁ থেকে) মনির হোসাইন কাসেমী, রাশেদ খান ও মুফতি রশীদ বিন ওয়াক্কাস। কোলাজ: রাজনীতি ডটকম

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দীর্ঘদিন ধরে যুগপৎ আন্দোলনের সঙ্গী শরিক দলগুলোর জন্য একাধিক আসনে ছাড় দিয়েছিল বিএনপি। এসব শরিক দলের নেতাদের গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশের (আরপিও) বিধিনিষেধের কারণে নিজ দলের প্রতীকে লড়তে হয়েছে। কেউ আবার নিজ দলের প্রতীকে ভরসা না পেয়ে দল বিলুপ্ত করে সরাসরি বিএনপিতে যোগ দিয়ে ভোট করেছেন ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে। কেউ কেউ দল থেকে পদত্যাগ করে ধানের শীষ নিয়ে নির্বাচন করেছেন। তবে নির্বাচনে শেষ পর্যন্ত তাদের বেশির ভাগই জয় ঘরে তুলতে পারেননি।

বিএনপির সঙ্গে আন্দোলনে থাকা সমমনা দল থেকে বিএনপিতে আসা, নিজ দলের প্রতীকে নির্বাচন করা প্রার্থীদের মধ্যে ভোটের মাঠে কে, কেমন ফলাফল করেছেন, সেটি দেখে নেওয়া যাক একনজরে।

বাংলাদেশ লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি (এলডিপি) বিলুপ্ত করে বিএনপিতে যোগ দেওয়া শাহাদাত হোসেন সেলিম জয়ী হয়েছেন। লক্ষ্মীপুর-১ আসনে লড়াই করা এই প্রার্থী পেয়েছেন ৮৬ হাজার ৮১১ ভোট। এ আসনে তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী মাহবুব আলম পেয়েছেন ৫৯ হাজার ২৬৫ ভোট। তিনি জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) যুগ্ম আহ্বায়ক এবং সাবেক তথ্য উপদেষ্টা মাহফুজ আলমের ভাই।

বাংলাদেশ জাতীয় দল বিলুপ্ত করে সৈয়দ এহসানুল হুদা কিশোরগঞ্জ-৫ আসন থেকে ধানের শীষ প্রতীকে নির্বাচন করেন। তবে শেষ রক্ষা হয়নি। নিকলী ও বাজিতপুরের এই আসনে হাঁস প্রতীকের স্বতন্ত্র প্রার্থী শেখ মজিবুর রহমান ইকবাল ৭৯ হাজার ২১০ ভোট পেয়ে জিতেছেন। আর সৈয়দ এহসানুল হুদা পেয়েছেন ৬৬ হাজার ১১৮ ভোট। এই আসনে জামায়াতের অধ্যাপক রমজান আলী পেয়েছেন ৪৪ হাজার ১৩৬ ভোট।

লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) মহাসচিবের পদ থেকে পদত্যাগ করে বিএনপিতে যোগ দিয়ে কুমিল্লা-৭ (চান্দিনা) আসনে ধানের শীষ প্রতীকে নির্বাচন করেন ড. রেদোয়ান আহমেদ। এ আসনে কলস প্রতীকে স্বতন্ত্র প্রার্থী আতিকুল আলম শাওন ৯০ হাজার ৮১৯ ভোট পেয়েছে বিজয়ী হয়েছেন। আর ড. রেদোয়ান আহমেদ ধানের শীষ প্রতীকে পেয়েছেন ৪৭ হাজার ৯২৫ ভোট।

নিজ দল এনপিপি ছেড়ে বিএনপিতে যোগ দিয়ে নড়াইল-২ আসন থেকে নির্বাচন করেন ফরিদুজ্জামান ফরহাদ। কিন্তু তিনি ভোটের মাঠে মোটেও ভালো করতে পারেননি। এ আসনে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী অ্যাডভোকেট আতাউর রহমান বাচ্চু ১ লাখ ১৮ হাজার ১৬ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হয়েছেন। ৭৭ হাজার ৪৪৫ ভোট পেয়ে দ্বিতীয় হন কলস প্রতীকের স্বতন্ত্র প্রার্থী মনিরুল ইসলাম।

খেজুর গাছের সবাই ফেল

বিএনপির থেকে আসন ছাড় পেয়ে নির্বাচন করা জমিয়াতে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশের প্রার্থীদের ভরাডুবি হয়েছে। বৃহস্পতিবার অনুষ্ঠিত ভোটে তারা সবাই প্রতিপক্ষের কাছে বিপুল ভোটের ব্যবধানে পরাজিত হয়েছেন।

জমিয়ত সভাপতি উবায়দুল্লাহ ফারুক সিলেট-৫ আসনে জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোটের প্রার্থী খেলাফত মজলিস নেতা মুফতি আবুল হাসানের দেওয়াল ঘড়ি প্রতীকের কাছে হেরে গেছেন। আবুল হাসান পেয়েছেন ৪৪ হাজার ১৮১ ভোট। আর জমিয়তের উবায়দুল্লাহ ফারুক খেজুর গাছ প্রতীক নিয়ে পেয়েছেন ২০ হাজার ৬৬০ ভোট।

ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনে বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী রুমিন ফারহানার হাঁস প্রতীকের কাছে হেরে গেছেন খেজুর গাছের কাণ্ডারি জমিয়তের সহসভাপতি জুনায়েদ আল হাবীব। রুমিন ফারহানা পেয়েছেন ১ লাখ ১৭ হাজার ৪৯৫ ভোট। আর জুনায়েদ আল হাবিব পেয়েছেন ৭৯ হাজার ৯২৭ ভোট।

নীলফামারী-১ আসনে জামায়াতের প্রার্থী মাওলানা আবদুস সাত্তার দাঁড়িপাল্লা প্রতীকে ১ লাখ ৪৯ হাজার ২১৪ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হয়েছেন। এখানে বিএনপি জোট শরিক জমিয়তের মহাসচিব মনজুরুল ইসলাম খেজুর গাছ প্রতীকে পেয়েছেন ১ লাখ ১৮ হাজার ১৬০ ভোট।

নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনে জামায়াত জোটের শরিক এনসিপির প্রার্থী আবদুলাহ আল আমিন শাপলা কলি প্রতীকে ১ লাখ ৪ হাজার ৪৮২ ভোট পেয়েছেন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপি জোটের শরিক জমিয়তের মনির হোসাইন কাসেমী পেয়েছেন ৮০ হাজার ১৩৮ ভোট।

নিজ প্রতীকে লড়ে জিতলেন-হারলেন যারা

বিএনপির সমর্থনে ভোটে লড়লেও দলটির মিত্র অনেকে নিজ দলীয় প্রতীকে নির্বাচন করেছেন। এদের মধ্যে কেউ জিতেছেন। কেউ আবার হেরেছেন।

ভোলা-১ (সদর) আসনে জয়লাভ করেছেন বাংলাদেশ জাতীয় পার্টির (বিজেপি) ব্যারিস্টার আন্দালিভ রহমান পার্থ। গরুর গাড়ি প্রতীকে ১১৪টি কেন্দ্রে তিনি পেয়েছেন ১ লাখ ৪,৪৬২ ভোট। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতে ইসলামীর অধ্যক্ষ নজরুল ইসলাম দাঁড়িপাল্লা প্রতীকে পেয়েছেন ৭৩ হাজার ৭৭৩ ভোট।

ঢাকা-১২ আসনে বাংলাদেশের বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক হেরেছেন জামায়াতের কাছে। জামায়াতের প্রার্থী সাইফুল আলম দাঁড়িপাল্লা প্রতীকে ৫৩ হাজার ৭৭৩ ভোট পেয়েছেন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী বাংলাদেশের বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক ‘কোদাল’ প্রতীকে পেয়েছেন ৩০ হাজার ৯৬৩ ভোট। অর্থাৎ সাইফুল হক থেকে ২২ হাজার ১৮০ ভোট বেশি পেয়েছেন সাইফুল আলম। একই সময়ে তৃতীয় অবস্থানে থাকা স্বতন্ত্র প্রার্থী সাইফুল আলম নীরব ফুটবল প্রতীকে পেয়েছেন ২৯ হাজার ৮৬৯ ভোট।

ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৬ (বাঞ্ছারামপুর) আসনে বিএনপি–সমর্থিত প্রার্থী গণসংহতি আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়ক জোনায়েদ সাকি ৯৫ হাজার ৩৪২ ভোট পেয়ে জয়ী হয়েছেন। মাথাল প্রতীকের প্রার্থী জোনায়েদ সাকির নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী মো. মহসীন দাঁড়িপাল্লা প্রতীকে ভোট পেয়েছেন ৩৯ হাজার ৯৬৭ ভোট। নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বীর চেয়ে সাকি ৫৫ হাজার ৩৭৫ ভোট বেশি পেয়েছেন।

পটুয়াখালী-৩ (দশমিনা, গলাচিপা) আসনে গণঅধিকার পরিষদের সভাপতি নুরুল হক নূর (ট্রাক) প্রতীক নিয়ে ৯৬ হাজার ৭৬৬ ভোট পেয়ে বিজয়ী হয়েছেন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী স্বতন্ত্র প্রার্থী হাসান মামুন পেয়েছেন ৮০ হাজার ৫৭৬ ভোট।

ধানের শীষ নিয়েও ববি ছাড়া সবাই ফেল

ঢাকা-১৩ আসনে বিএনপি প্রার্থী করেছিল এনডিএম ছেড়ে বিএনপিতে যোগ দেওয়া ববি হাজ্জাজকে। বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের মামুনুল হককে পরাজিত করে তিনি জয় পেয়েছেন। এ ছাড়া আর যারা ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে নির্বাচন করেছেন, তারা কেউ জয়ের দেখা পাননি।

ঢাকা-১৩ আসনে ববি হাজ্জাজ বিজয়ী হয়েছেন ৮৮ হাজার ৩৮৭টি ভোট পেয়ে। প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতে ইসলামী সমর্থিত ১১–দলীয় ঐক্যের প্রার্থী মামুনুল হক পেয়েছেন ৮৬ হাজার ৬৭টি। মামুনুল হকের চেয়ে ২ হাজার ৩২০ ভোট বেশি পেয়েছেন তিনি।

ঝিনাইদহ-৪ (সদর) আসনে গণঅধিকার পরিষদ ছেড়ে বিএনপিতে যাওয়া রাশেদ খান তার আসনে তৃতীয় হয়েছেন। এ আসনে জামায়াতের প্রার্থী আবু তালিব পেয়েছেন ১ লাখ ৪ হাজার ৩১ ভোট। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী স্বতন্ত্র প্রার্থী সাইফুল ইসলাম ফিরোজ কাপ পিরিচ প্রতীক নিয়ে পেয়েছেন ৭৫ হাজার ৭৫০ ভোট। বিএনপির ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা রাশেদ খান পেয়েছেন ৫৫ হাজার ৬৭০ ভোট।

যশোর-২ (মনিরামপুর) আসন থেকে নির্বাচন করছেন জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশের একাংশের সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব মুফতি রশীদ বিন ওয়াক্কাস। তিনি প্রয়াত সাবেক এমপি মুফতি মুহাম্মদ ওয়াক্কাসের ছেলে। নিবন্ধন না থাকায় ধানের শীষ নির্বাচন করলেও এই আসনে জিতেছেন জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী ডা. মোসলেহ উদ্দিন ফরিদ। তিনি পেয়েছেন ১ লাখ ৭১ হাজার ৯৯১। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপির সাবিরা সুলতানা পেয়েছেন ১ লাখ ৪৬ হাজার ৩২২ ভোট। তিনি বিজয়ী ফরিদের চেয়ে ২৫ হাজার ৬৬৯ ভোট কম পেয়েছেন। এ আসনে জমিয়তের প্রার্থীর ভরাডুবি হয়েছে।

ad
ad

রাজনীতি থেকে আরও পড়ুন

দেশে থেকেই পরিবর্তনের লড়াই চালানোর ঘোষণা তাসনিম জারার

তিনি বলেন, রাজনৈতিক সংস্কৃতির ইতিবাচক পরিবর্তনের জন্যই আমার পথচলা শুরু। এটি কোনো একক নির্বাচনী লড়াই নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক ও রাজনৈতিক আন্দোলনের অংশ। জনগণের সক্রিয় অংশগ্রহণ ও সচেতন নাগরিকত্বের চর্চাই ভবিষ্যৎ রাজনীতির ভিত্তি হওয়া উচিত বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

৫ ঘণ্টা আগে

বৈঠকে বসেছে জামায়াতের কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এখন পর্যন্ত বেসরকারিভাবে ২৯৭টি আসনের চূড়ান্ত ফলাফল প্রকাশ করেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। এর মধ্যে বিএনপি এককভাবে ২০৯ আসনে এবং বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ৬৮ আসনে বিজয়ী হয়েছে। ১১ দলীয় জোট থেকে আরো কয়েকজন প্রার্থী জয়লাভ করেছেন।

৫ ঘণ্টা আগে

জনগণের আস্থাই আমার বিজয়ের শক্তি : হাসনাত আব্দুল্লাহ

হাসনাত আব্দুল্লাহ বলেন, এই নির্বাচন ছিল আমার বিরুদ্ধে একটি বৃহৎ রাজনৈতিক ও প্রভাবশালী গোষ্ঠীর লড়াই। কিন্তু আমার পাশে ছিল সাধারণ মানুষ। তাদের সমর্থন ও আস্থার কারণেই আমি বিজয়ী হয়েছি।

৫ ঘণ্টা আগে

তারেক রহমানকে ফুলের শুভেচ্ছা জানালেন মির্জা ফখরুল

উল্লেখ্য, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঘোষিত ফলে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) ও তাদের জোটের প্রার্থীরা ২১৩টি আসনে জয় পেয়েছে। অন্যদিকে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোট পেয়েছে ৭৭টি আসন।

৬ ঘণ্টা আগে