ঐকমত্য আটকে গেল সাংবিধানিক কাউন্সিলে

প্রতিবেদক, রাজনীতি ডটকম
আপডেট : ১৯ জুন ২০২৫, ০০: ০২
বুধবার জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের বৈঠকের পর সাংবাদিকদের ব্রিফ করেন কমিশনের সহসভাপতি অধ্যাপক আলী রীয়াজ। ছবি: ফোকাস বাংলা

সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদসহ পাঁচ বিষয়ে সব দল ঐকমত্য পোষণ করলে জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের দ্বিতীয় ধাপের দ্বিতীয় দিনের বৈঠক শেষ হয়েছিল আনন্দমুখর পরিবেশে। তৃতীয় দিনে এসেই সেই ঐকমত্য আটকে গেছে ‘জাতীয় সাংবিধানিক কাউন্সিলে (এনসিসি)’।

রাষ্ট্রীয় কার্যাবলীতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা আনা এবং রাষ্ট্রীয় অঙ্গ ও প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে ভারসাম্য নিশ্চিত করতে ৯ সদস্যের একটি জাতীয় সাংবিধানিক কাউন্সিল গঠনের সুপারিশ করে সংবিধান সংস্কার কমিশন। রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, বিরোধী দলীয় নেতা, দুই সংসদীয় কক্ষের স্পিকার, প্রধান বিচারপতি, বিরোধী দল মনোনীত দুই সংসদীয় কক্ষের ডেপুটি স্পিকার, এবং প্রধানমন্ত্রী ও বিরোধী দলীয় নেতার বাইরে তাদের দল থেকে উভয় কক্ষের কোনো একজন সংসদ সদস্য এই কাউন্সিলের সদস্য থাকবেন।

বিএনপি বলছে, এনসিসি গঠন করা হলে তার ‘জবাবদিহিতা থাকবে না’ বলে এর কোনো প্রয়োজন নেই। অন্যদিকে এটি ‘স্বৈরতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান’ হয়ে গড়ে উঠবে বলে আশঙ্কার কথা জানিয়েছে গণফোরাম। বাসদ-সিপিবিও এ প্রস্তাবকে এখনই প্রয়োজনীয় মনে করছে না।

এ পরিস্থিতিতে হতাশা জানিয়েছে জাতীয় ঐকমত্য কমিশন। সাংবিধানিক কাউন্সিলের সবচেয়ে বড় সমর্থক জাতীয় নাগরিক পার্টিও (এনসিপি) একই রকমভাবে হতাশ। কেবল এই কাউন্সিল নয়, সংস্কার নিয়েই শঙ্কা জানিয়েছে তারা।

বুধবার (১৮ জুন) রাজধানীর ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে দ্বিতীয় পর্যায়ের তৃতীয় দিনের বৈঠকে বসে জাতীয় ঐকমত্য কমিশন। সকাল সাড়ে ১১টায় শুরু হয়ে আলোচনা চলে দুপুর ২টা পর্যন্ত। বিরতির পর বিকেল ৩টায় ফের সংলাপ শুরু হয়।

সাংবিধানিক কাউন্সিল বা এনসিসি প্রসঙ্গে বৈঠকের পর বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, এনসিসিকে সাংবিধানিকভাবে অনেক অনেক ক্ষমতা দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। কিন্তু এর জবাবদিহিতা নাই। যদি কর্তৃত্ব থাকে, ক্ষমতা থাকে কিন্তু জবাবদিহিতা না থাকে, এমন কোনো প্রতিষ্ঠানকে আমরা গণতান্ত্রিক দল হিসেবে সমর্থন দিতে পারি না।

রাষ্ট্রপতিকে প্রধান করে যে ৯ সদস্যের এনসিসি গঠনের প্রস্তাব করা হয়েছে, তার সঙ্গে বিএনপি একমত নয় বলে জানান সালাহউদ্দিন। বলেন, সাংবিধানিক কমিশনে নিয়োগের ক্ষেত্রে বিদ্যমান আইনগুলো সংশোধন করতে হবে, আরও শক্তিশালী করতে হবে।

বিএনপির চেয়ে এক ধাপ এগিয়ে গণফোরাম সাংবিধানিক কাউন্সিল সরাসরি স্বৈরতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে উঠবে বলে নিজেদের অবস্থান জানিয়েছে। দলটির সাধারণ সম্পাদক মিজানুর রহমান বলেন, বাংলাদেশ সরকারের তিনটি অঙ্গ রয়েছে— বিচার বিভাগ, নির্বাহী বিভাগ ও আইন সভা। এই তিনটিকে একত্রিত করে যদি এনসিসি গঠন করা হলে যে সরকার হবে তা সরকারের ওপরে আরেকটি সরকার হবে।

মিজানুর রহমান আরও বলেন, আগে রাজা নিজে আইন করতেন, সেই আইনে রাজা বিচার করতেন। আজ যদি সরকারের বাইরে এ ধরনের এনসিসি গঠন করা হয়, তারা যে সিদ্ধান্ত নেবে, আমি একজন সাধারণ নাগরিক হিসাবে যদি সংক্ষুব্ধ হই তাহলে বিচার পাব না। কারণ হলো সেখানে প্রধান বিচারপতি সই করবেন।

Briefing After National Consensus Committee Meeting With Political Parties 18-06-2025 (2)

বুধবার জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের বৈঠকের পর সাংবাদিকদের ব্রিফ করেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমেদ। ছবি: ফোকাস বাংলা

গণফোরামের সাধারণ সম্পাদক আরও বলেন, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার কথা বলা হয়েছে। কিন্তু যেখানে জাতীয় সংসদের স্পিকার থাকবেন, প্রধানমন্ত্রী ও বিরোধী দলীয় নেতা থাকবেন, সেটাকে স্বৈরতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানে পরিণত করার অপচেষ্টা করা হবে— এটা আমরা বলেছি। কোনো জনসাধারণ সংক্ষুব্ধ হলে সে যাবে আদালতে, কিন্তু যেখানে প্রধান বিচারপতি সই করবেন সেখানে আদালতেও যেতে পারবেন না।

সিপিবির সাধারণ সম্পাদক রুহিন হোসেন প্রিন্স বলেন, আমরা আমূল পরিবর্তন চাই। কিন্তু ইচ্ছা করলেই আমরা আমূল পরিবর্তন করতে পারবো না। সাংবিধানিক কাউন্সিলসহ যে ত্রুটির মধ্য দিয়ে একক কর্তৃত্ববাদী ক্ষমতা গড়ে ওঠে, আমরা বলেছি সেটা ভাঙার জন্য। এনসিসি নিয়ে নীতিগতভাবে আমাদের দ্বিমত নেই। কিন্তু এই মুহূর্তে এর প্রয়োজন দেখছি না।

এদিকে এনসিসি নিয়ে দলগুলো একমত না হওয়ায় হতাশা জানিয়েছে এনসিপি, যারা শুরু থেকেই এই প্রতিষ্ঠানের পক্ষে জোরালোভাবে অবস্থান নিয়েছিল। দলের আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম বলেন, আমরা মৌলিক সংস্কারের যে রূপরেখা ঐকমত্য কমিশনকে দিয়েছিলাম তার মধ্যে এনসিসি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল। আমরা রাজনৈতিক দলগুলোকে অনুরোধ করেছিলাম জাতির স্বার্থে আমরা যেন এনসিসি নিয়ে ঐকমত্যে আসতে পারি। কিন্তু খুবই হতাশার কথা যে আমরা ঐকমত্যে আসতে পারিনি।

Briefing After National Consensus Committee Meeting With Political Parties 18-06-2025 (3)

বুধবার জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের বৈঠকের পর সাংবাদিকদের ব্রিফ করেন এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম। ছবি: ফোকাস বাংলা

নাহিদ ইসলাম আরও বলেন, সার্বিকভাবে আজকের দিনটা আমাদের জন্য হতাশার। আশা করেছিলাম এনসিসির বিষয়ে একটা নীতিগত সিদ্ধান্তে আসতে পারব, সেটা হয়নি। যারা বিরোধিতা করেছেন, তারা যেন একটা প্রস্তাব দেয়। না হলে এই যে গণঅভ্যুত্থান-সংস্কার, এগুলো ব্যর্থ হবে। এই রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো আগের নিয়মেই চলবে— আজকের আলোচনার পর সে ধরনের শঙ্কা-সংশয় তৈরি হয়েছে।

বৈঠক শেষে ঐকমত্য কমিশনের সহসভাপতি আলী রীয়াজ বলেন, জাতীয় সাংবিধানিক কাউন্সিল (এনসিসি) অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল। আমরা চেয়েছিলাম, জাতির স্বার্থে আমরা যেন এনসিসি নিয়ে ঐকমত্যে আসতে পারি। কিন্তু খুবই হতাশাজনক, আমরা ঐকমত্যে আসতে পারিনি।

আলী রীয়াজের সভাপতিত্বে বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন কমিশনের সদস্য বিচারপতি মো. এমদাদুল হক, বদিউল আলম মজুমদার, আইয়ুব মিয়া, ইফতেখারুজ্জামান ও সফর রাজ হোসেন এবং প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী (ঐকমত্য) মনির হায়দার।

ad
ad

রাজনীতি থেকে আরও পড়ুন

বিভিন্ন গোষ্ঠী ‘মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে’, প্রতিহতের আহ্বান মির্জা ফখরুলের

বিভিন্ন গোষ্ঠী ‘আবার মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে’ উল্লেখ করে তাদের প্রতিহত করার আহ্বান জানিয়ছেন স্থানীয় সরকারমন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তিনি বলেছেন, ‘বাংলাদেশে আমরা সবসময় সবকিছু সোজা পথে পাই না। আজকে আবার বিভিন্নভাবে বিভিন্ন গোষ্ঠী মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে। তারা বিভিন্নভাবে সমস্যা তৈরি করছেন, আইনশৃঙ্খলা পর

৪ দিন আগে

বিশ্বকাপে কোন দলকে সমর্থন— জবাবে যা বললেন প্রধানমন্ত্রী

সাংবাদিকদের সঙ্গে এ মতবিনিময় সভায় দেশের সমসাময়িক রাজনৈতিক পরিস্থিতি, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা এবং সরকারের ভবিষ্যৎ কর্মপরিকল্পনাসহ বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়। তবে অনুষ্ঠান শেষে বিশ্বকাপ ফুটবল নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর সংক্ষিপ্ত মন্তব্য সাংবাদিকদের মধ্যে বেশ আগ্রহ ও হাস্যরসের জন্ম দেয়।

৪ দিন আগে

‘জিয়াউর রহমান আর ১০ বছর বাঁচলে বাংলাদেশ অনন্য দেশ হতো’

বিএনপির মহাসচিব বলেন, দুর্ভিক্ষপীড়িত একটি রাষ্ট্রকে টেনে তুলেছিলেন শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান। দেশে স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব রক্ষা এবং গণতন্ত্রকে নিজস্ব প্রক্রিয়ায় চলতে দেওয়ার লক্ষ্য ছিল তার। তিনি আরও ১০ বছর বেঁচে থাকলে আজকে বাংলাদেশ একটি অনন্য দেশ হিসেবে গড়ে উঠতো এবং সমাজে এতো নেতিবাচকতা তৈরি হতো না

৬ দিন আগে

সরকার স্বস্তি দিতে চায়, বিরোধীদল ছড়াচ্ছে বিভ্রান্তি: প্রধানমন্ত্রী

প্রধানমন্ত্রী বলেন, বর্তমান সরকার বাজেটের মাধ্যমে জনগণকে স্বস্তি দিতে চাইলেও বিরোধীদল তা মানছে না; তবে ভোটের কালি শুকানোর আগেই সরকার নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন শুরু করেছে।

৮ দিন আগে