
নাজমুল ইসলাম হৃদয়

জুলাই অভ্যুত্থানের দেড় বছর পর অনুষ্ঠিত হলো ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। এরপর পেরিয়ে গেছে আরও ছয় মাস। প্রথমে জুলাই অভ্যুত্থান ও পরে জাতীয় নির্বাচনের মাধ্যমে বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে বাহ্যিক দৃশ্যপট ও ক্ষমতার হাতবদল ঘটেছে সুস্পষ্টভাবে। সরকার ও প্রশাসনে এসেছে নতুন মুখ।
কিন্তু দেশের রাজনীতির মৌলিক চরিত্র, প্রাতিষ্ঠানিক শাসনব্যবস্থা, আমলাতান্ত্রিক মানসিকতা, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জবাবদিহিতা বা তৃণমূল পর্যায়ে ক্ষমতা চর্চার ধরনে কি আসলেই পরিবর্তন এসেছে? নাকি চেনা রাজনৈতিক ব্যবস্থার ভেতরে কেবল ক্ষমতার পুনর্বিন্যাস ঘটেছে?
২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে ঘটে যাওয়া ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের মূল স্লোগানই ছিল ‘রাষ্ট্র সংস্কার’ এবং একটি ‘নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্তে’র সূচনা। আন্দোলন-পরবর্তী অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়কাল, ঐতিহাসিক জুলাই সনদ ও ২০২৬ সালের জাতীয় নির্বাচন ঘিরে দেশের সর্বস্তরের মানুষের প্রত্যাশা ছিল আকাশচুম্বী। সেই জাতীয় নির্বাচনের ছয় মাস পরের বাস্তবতায় তাই স্বভাবতই প্রশ্ন উঠেছে— সেই জনআকাঙ্ক্ষার কতটা পূরণ হয়েছে?
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে যেকোনো নির্বাচনই ক্ষমতার পরিবর্তন নিয়ে আসে, কিন্তু প্রাতিষ্ঠানিক আচরণ বা রাষ্ট্র পরিচালনার দর্শনে বড় কোনো পরিবর্তন আনে না। ২০২৬ সালের নির্বাচনের পর বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতাও এই দীর্ঘদিনের দ্বিমুখী চরিত্রের মুখোমুখি দাঁড়িয়েছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও প্রাতিষ্ঠানিক গবেষকদের মতে, নির্বাচন-পরবর্তী সময়কালকে মূলত তিনটি দিক থেকে মূল্যায়ন করা যায়।
প্রথমত, সংসদীয় কার্যক্রমে বহুদলীয় উপস্থিতি নিশ্চিত হওয়া ও রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে নতুন শক্তির যুক্ত হওয়ার মধ্য দিয়ে এক ধরনের ইতিবাচক পরিবর্তন দৃশ্যমান। দ্বিতীয়ত, জোটের সমীকরণ ও ক্ষমতার ভারসাম্যে তৈরি হওয়া নতুন রূপটি মূলত একটি সংক্রান্তিকালীন অবস্থা। তৃতীয় ও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিকটি হলো প্রাতিষ্ঠানিক শাসনব্যবস্থা, যেখানে আমলাতান্ত্রিক প্রাধান্য, স্থানীয় পর্যায়ে পৃষ্ঠপোষকতার রাজনীতি ও বাজার নিয়ন্ত্রণে আগের ধারার উপস্থিতিই প্রকট।
দেশের চলমান রাজনৈতিক পরিস্থিতির মূল্যায়ন করতে গিয়ে বাংলাদেশ জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (বাংলাদেশ জাসদ) সভাপতি শরীফ নুরুল আম্বিয়া রাজনীতি ডটকমকে বলেন, ‘২০২৬ সালের জাতীয় নির্বাচনের পর গঠিত নতুন সরকারের কাজকর্ম পর্যবেক্ষণ করে রাজনীতিতে নানা ধরনের প্রশ্ন ও মিশ্র প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছে। একদিকে সরকার যেমন বেশ কিছু জনপ্রিয় কর্মসূচি হাতে নিয়েছে এবং বিদ্যমান সমস্যাগুলো মানিয়ে নেওয়া ও কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা করছে, তেমনি সংসদে নানামুখী ধোঁয়াশা তৈরির পাশাপাশি বহু অমীমাংসিত সামাজিক ও প্রশাসনিক সংকট রয়ে গেছে, যা সরকার এখনো পুরোপুরি সামলে উঠতে পারেনি।’
একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধের মতো মৌলিক ও রাজনৈতিক ইস্যুতে সরকারের অবস্থান এখনো অস্পষ্ট, যা রাজনৈতিক আদর্শিক মেরুকরণের সংকটকে গভীরতর করছে— এমনটিই মনে করছেন বর্ষীয়ান রাজনীতিবিদ শরীফ নুরুল আম্বিয়া।
অন্যদিকে আগের রাজনৈতিক সংস্কৃতিরই পুনরাবৃত্তি দেখছেন বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) সভাপতি কাজী সাজ্জাদ জহির চন্দন। রাজনীতি ডটকমকে তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশের রাজনীতিতে আসলে গুণগত কোনো পরিবর্তন আসেনি। রাজনৈতিক পরিস্থিতি পর্যালোচনা করলে মুক্তকণ্ঠে রাজনীতি করার স্বাধীনতার প্রকাশ গত ছয় মাসে দেখা যায়নি। গত ছয় মাসেও বাংলাদেশের প্রতিটি স্তরে ক্ষমতার প্রয়োগ করা ও নির্যাতন করার মতো বিষয়গুলো অব্যাহতই রয়েছে।’
সিপিবি সভাপতির সরকারকে সতর্ক করে বলেন, ‘রাষ্ট্র পরিচালনার পুরোনো ধারা অব্যাহত থাকলে সরকারের প্রোপাগান্ডা ব্যর্থ হতে বাধ্য। সেক্ষেত্রে সংকট নিরসন না হলে জনগণ আবারও রাজপথে বিকল্প পথ বেছে নিতে বাধ্য হতে পারে।’
বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে সংসদের ভেতরে সিদ্ধান্ত বদলে রাজপথের আন্দোলনের মাধ্যমে দাবি আদায়ের প্রবণতাই বেশি লক্ষ্যণীয়। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পরও সংসতের বাইরে রাজপথকে ক্ষমতার মূল ক্ষেত্র হিসেবে ব্যবহার করার পুরোনো অভ্যাস থেকে দলগুলো পুরোপুরি বের হতে পারেনি।
এ বিষয়ে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের (চবি) জনপ্রশাসন বিভাগের সুপারনিউমারারি অধ্যাপক ড. নিজাম উদ্দিন আহমেদ রাজনীতি ডটকমকে বলেন, ‘২০২৬ সালের জাতীয় নির্বাচনের পর বাংলাদেশের রাজনীতিতে কী পরিবর্তন এসেছে— এ প্রশ্নের সোজা বাংলা উত্তর হলো— দৃশ্যমান কোনো পরিবর্তনই আসেনি। আমরা দীর্ঘদিন ধরে যে গতানুগতিক ও সাংঘর্ষিক রাজনীতির ধারা দেখে আসছি, তা থেকে বেরিয়ে আসার কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না।’
অধ্যাপক নিজাম উদ্দিন আহমেদ বিষয়টির ব্যাখা দিয়ে বলেন, “সুস্থ ও গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক চর্চা গড়ে তুলতে হলে সংসদকেই রাজনীতির মূল কেন্দ্রবিন্দু করতে হবে। কিন্তু সংসদে থেকেও রাজপথকে রাজনীতির প্রধান কেন্দ্র হিসেবে ধরে রাখতে চাইলে সেটি একসঙ্গে চলতে পারে না। রাজপথের রাজনীতি ও সংসদের রাজনীতি সাংঘর্ষিক— যেকোনো একটি বেছে নিতে হবে। দুর্ভাগ্যবশত, আমাদের দেশের সরকারি বা বিরোধী দল— সবার ভাষা একই থেকে গেছে। সংসদ সদস্য হওয়া সত্ত্বেও ‘রাজপথ ছাড়ব না’ মনোভাব থেকে আমরা বের হতে পারছি না।”
জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে সরকারি ও বিরোধী দলের মধ্যে আবশ্যকীয় রাজনৈতিক সমঝোতা ও ঐক্যমত্য এখনো তৈরি হয়নি উল্লেখ করে অধ্যাপক নিজাম বলেন, “এর মধ্যে আবার মন্ত্রিসভার অর্ধশত সদস্যের মধ্যে প্রায় ৮০ শতাংশই নতুন এবং প্রথমবার সংসদ সদস্য হওয়ায় সরকারি কর্মকাণ্ড পরিচালনায় প্রশাসনিক অনভিজ্ঞতা প্রকাশ পাচ্ছে। অন্যদিকে ঐতিহ্যগত সমঝোতার ব্যত্যয় ঘটিয়ে একমাত্র ‘পাবলিক অ্যাকাউন্টস কমিটি’ ছাড়া অন্য কোনো গুরুত্বপূর্ণ সংসদীয় কমিটির প্রধান হিসেবে বিরোধী দলকে যুক্ত করা হয়নি, যা সংঘাতের ক্ষেত্রকে প্রসারিত করছে।”
বিরোধী দল সংসদীয় রাজনীতিতে মনোযোগী হতে চাইলেও তা বাস্তবায়ন করতে না পারার পেছনে সংসদে বৈষম্যের শিকার হওয়ার অভিযোগ তুলেছে। সোমবার (২৪ আগস্ট) রাজধানীর মিন্টো রোডে জাতীয় দৈনিকের সম্পাদকদের সঙ্গে এক মতবিনিময় সভা আয়োজন করে সংসদের প্রধান বিরোধী দল বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী।
ওই সভা শেষে দলের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার সাংবাদিকদের বলেন, ‘ঐতিহ্যগত সংঘাতের রাজনীতি থেকে সরে এসে জামায়াত ও ১১-দলীয় জোট সংসদে দায়িত্বশীল ও গঠনমূলক বিরোধী দলের ভূমিকা পালন করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। কিন্তু জাতীয় সংসদে বিরোধীদলীয় সংসদ সদস্যদের ক্ষেত্রে উন্নয়ন বরাদ্দ, সংসদে কথা বলার সুযোগ, আইন প্রণয়ন ও নোটিশ গ্রহণের ক্ষেত্রে বৈষম্যমূলক আচরণ করা হচ্ছে।’
জুলাই অভ্যুত্থানের এক বছর পার করে গত বছরের ১৭ অক্টোবর জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সম্মতিতে সই হয় ‘জুলাই জাতীয় সনদ ২০২৫’। রাজনৈতিক দলগুলো এই সনদকে নতুন রাজনৈতিক কাঠামোর আইনি ও নৈতিক ভিত্তি হিসেবে অভিহিত করে। তবে জাতীয় নির্বাচনের পর ছয় মাসে এই সনদ বাস্তবায়ন হওয়ার কথা থাকলেও তা নিয়ে তীব্র অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে।
জুলাই সনদ আদেশের অধীনে অনুষ্ঠিত গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জয়যুক্ত হয়ে সনদ বাস্তবায়নের পক্ষে জনরায় মিললেও সে অনিশ্চয়তা কাটেনি। বরং নির্বাচনের পর দুই শপথের জটিলতাকে ইস্যু করে জুলাই সনদ আদেশে প্রস্তাবিত সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠনই করা যায়নি।
এখন পর্যন্ত জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পার্টিসহ (এনসিপি) বিরোধী দলগুলো সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন করেই সংবিধান সংস্কার করার পক্ষে অনড়। অন্যদিকে সরকার বলছে, তারা ‘নোট অব ডিসেন্ট’সহ যে জুলাই সনদে সই করেছে, তা অক্ষরে অক্ষরে বাস্তবায়ন করবে, তবে সেটি সংস্কার নয়, বরং সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে। কারণ সই হওয়া জুলাই সনদে সংবিধান সংস্কার পরিষদের অস্তিত্ব ছিল না, যা সরকারি দলের ভাষায় জুলাই সনদ আদেশের মাধ্যমে ‘চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে’।
এই সংকটকে গুরুতর অভিহিত করে অধ্যাপক ড. নিজাম উদ্দিন আহমেদ রাজনীতি ডটকমকে বলেন, “বর্তমানে দুটি মৌলিক বিষয়ে চরম দ্বিমত ও সাংবিধানিক সংকট তৈরি হয়েছে। প্রথমত, সংসদকে ‘সংবিধান সংস্কার পরিষদ’ হিসেবে মেনে নেওয়া বা না নেওয়া এবং দুই শপথের জটিলতা। দ্বিতীয়ত, ‘জুলাই সনদ’ ও এর ওপর প্রস্তাবিত গণভোটের আইনি ও রাজনৈতিক মীমাংসা।”
তিনি বলেন, ‘জুলাই সনদে দ্বিমত থাকা বিষয়ে বলা ছিল— যে যার অবস্থান নিয়ে জনগণের কাছে ম্যান্ডেট চাইবে। কিন্তু এখন এর ব্যাখ্যা নিয়ে জামায়াত ও বিএনপির ভিন্নমুখী অবস্থান সংকট বাড়াচ্ছে। বিষয়টি বর্তমানে আদালতে বিচারাধীন, তবে রাষ্ট্রপতির আদেশের মাধ্যমে ঘোষিত এই সংকট দ্রুত নিষ্পন্ন না হলে আমরা অবশ্যম্ভাবীভাবে বড় আকারের সাংঘর্ষিক রাজনীতি ও রাজনৈতিক অস্থিরতার দিকে ধাবিত হব।’
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা সতর্ক করে বলছেন, সাংবিধানিক সংস্কারের বিষয়গুলো কেবল আদালতের রায়ের ওপর ছেড়ে দিলে রাজনৈতিক উত্তেজনা প্রশমিত হবে না, এর জন্য রাজনৈতিক দূরদর্শিতা ও আন্তঃদলীয় মেধাভিত্তিক সংলাপের বিকল্প নেই।
রাজনৈতিক দলগুলোর বক্তৃতা ও ইশতেহারে পরিবর্তনের প্রতিশ্রুতি থাকলেও তৃণমূল রাজনীতির বাস্তবতা অত্যন্ত জটিল। দেশের বিভিন্ন জেলা, উপজেলা, পৌরসভা ও ইউনিয়ন পরিষদ পর্যায়ে ক্ষমতা চর্চার চিরচেনা ধরনই দৃশ্যমান বলে অভিমত বিশ্লেষকদের।
বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনেও কয়েকটি ক্ষেত্র দৃশ্যমান হয়। প্রথমত, হাট-বাজার ও গণপরিবহন স্ট্যান্ড নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে ক্ষমতা বদলের পরপরই পুরোনো রাজনৈতিক ক্যাডারদের সরিয়ে নতুন ক্ষমতাসীন বলয়ের অনুসারীদের আধিপত্য প্রতিষ্ঠার ঘটনা ঘটেছে।
দ্বিতীয়ত, স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) ও পানি উন্নয়ন বোর্ডের ইজারা ও ঠিকাদারি কাজে প্রশাসনিক নিরপেক্ষতার অভাব এবং স্থানীয় দলীয় নেতাদের সরাসরি হস্তক্ষেপের অভিযোগ উঠেছে।
তৃতীয়ত, জেলা পরিষদ, উপজেলা পরিষদ ও স্থানীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর পরিচালন পর্ষদে রাজনৈতিক মনোনীতদের বসানোর পুরোনো প্রথা অব্যাহত রয়েছে।
প্রশাসনিক ও সামাজিক স্তরে এই দলীয়করণ প্রসঙ্গে অধ্যাপক নিজাম বলেন, “বিগত সরকারগুলোর মতো বর্তমান সরকারের মধ্যেও রাষ্ট্রকে শক্তিশালী করার চেয়ে ‘সরকারকে শক্তিশালী করা’র পুরোনো ও ঐতিহ্যগত প্রবণতাই স্পষ্ট। জেলা পরিষদ, উপজেলা পরিষদ থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত সব স্তরে দলীয় লোক বসানোর প্রবণতা দেখা যাচ্ছে।’
অবশ্য স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলো নিয়ে বিপরীতমুখী যুক্তিও রয়েছে। কোনো কোনো বিশ্লেষক বলেন, সাধারণভাবে এসব প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করেন যেসব নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি, তারা রাজনৈতিক দলের নেতাই হয়ে থাকেন। নির্বাচন না হলেও প্রশাসক হিসেবে তাদেরই বসানো হয়েছে। এ ক্ষেত্রে বেশির ভাগ জায়গাতেই ওইসব প্রতিষ্ঠানের জন্য সরকারি দল তাদের সম্ভাব্য প্রার্থীদেরই পদায়ন করেছে।
নির্বাচন-পরবর্তী ছয় মাসে সবচেয়ে বড় আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু ছিল আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভূমিকা ও আমলাতন্ত্রের কর্মদক্ষতা। পুলিশ প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে রাজনীতির প্রভাবমুক্ত করার দাবি বহু বছরের হলেও মাঠপর্যায়ে তার প্রতিফলন অত্যন্ত সীমিত। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে রাজনৈতিক সহিংসতা, মব সহিংসতা ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সাফল্য না পাওয়ার সংকট।
বাংলাদেশ জাসদের সভাপতি শরীফ নুরুল আম্বিয়া অতি সম্প্রতি রংপুরের ঘটে যাওয়া চার খুনের ঘটনার প্রসঙ্গ টেনে ক্ষোভ জানিয়ে বলেন, ‘রংপুরের মর্মান্তিক ঘটনাসহ দেশ জুড়ে ঘটে চলা সহিংসতা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি তুলে ধরে। এর কারণ, সহিংসতার পুরোনো রাজনীতি থেকে উত্তরণ ঘটেনি। আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় প্রশাসনের আরও জোরালো পদক্ষেপ ও ঘটনার সুষ্ঠু তদন্তের প্রয়োজনীয়তা প্রকাশ পাচ্ছে।’
সিপিবি সভাপতি কাজী সাজ্জাদ জহির চন্দন রাজনীতি ডটকমকে বলেন, ‘সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে। এ পরিস্থিতির উন্নতি করতে সরকারের যে ভূমিকা থাকা প্রয়োজন ছিল, তা আমরা দেখতে পাচ্ছি না। আগে যা ছিল, এখন তারই এক ধরনের ধারাবাহিকতা বহাল আছে।’
রাজনীতি ও অর্থনীতির মধ্যকার ‘অশুভ আঁতাত’ ভঙ্গ করা ছিল রাজনৈতিক পরিবর্তনের অন্যতম আকাঙ্ক্ষা। কিন্তু চলমান অর্থনৈতিক ও সার্বিক বাজার পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, নিত্যপণ্যের চড়া দাম ও জ্বালানি সংকটের মতো বিষয়গুলো সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রাকে কঠোর করে তুলেছে।
অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় রাজনৈতিক প্রভাবের ধারাবাহিকতা প্রসঙ্গে সিপিবি সভাপতি কাজী সাজ্জাদ জহির চন্দন রাজনীতি ডটকমকে বলেন, ‘এক ধরনের নৈরাজ্য বিরাজ করছে। নিত্যপণ্যের দাম ক্রমাগতভাবে বাড়ছে, কিন্তু তা থেকে উদ্ধার পাওয়ার কোনো পথ নেই। ফলে জনজীবন চরম সংকটের মধ্যে পড়েছে।’
বিরোধী দল হিসেবে জনগণের পক্ষে কথা বলতে গেলেও প্রশাসনিক বা রাজনৈতিক বাধা তৈরি করা হচ্ছে বলে অভিযোগ করেন সিপিবি সভাপতি। বলেন, এমন আচরণ গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার জন্য অশনিসংকেত।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর বাংলাদেশের দলীয় রাজনীতির সমীকরণ সম্পূর্ণ নতুন রূপ ধারণ করেছে। দীর্ঘদিনের প্রচলিত দ্বি-মেরুকরণের পরিবর্তে একাধিক রাজনৈতিক শক্তির উপস্থিতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে। একদিকে ক্ষমতাসীন দল রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার মূল চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করছে, অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামী ও ১১-দলীয় জোট প্রধান বিরোধী দল হিসেবে নিজেদের অবস্থান তৈরি করেছে।
জামায়াতের নেতৃত্বাধীন জোটের অংশ হলেও জুলাই অভ্যুত্থানের গর্ভ থেকে উঠে আসা জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) দেশের রাজনীতিতে নতুন মুখ হিসেবে শক্তিশালী অবস্থান করে নিয়েছে। জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ছয়টি আসনে জয়লাভ করেছে তারা। এই সামান্য উপস্থিতি নিয়েও সংসদে এরই মধ্যে তারা নিজেদের নতুন প্রজন্মের কণ্ঠস্বর হিসেবে তুলে ধরেছে।
এনসিপির ভূমিকা প্রসঙ্গে অবশ্য খুব ইতিবাচক আশা দেখছেন না ড. নিজাম উদ্দিন আহমেদ। তিনি বলেন, ‘এনসিপি নতুন শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হলেও রাজনৈতিকভাবে তা কোনো বড় পরিবর্তন আনবে বলে মনে হয় না। নীতি, আদর্শ বা কর্মসূচির দিক থেকে জামায়াতের সঙ্গে তাদের কোনো মৌলিক পার্থক্য দৃশ্যমান নয়। একটি নতুন দলের নিজস্ব অর্থনৈতিক নীতি, প্রশাসনিক দূরদৃষ্টি ও রাজনৈতিক রূপরেখা থাকা প্রয়োজন, যা কেবল আবেগ দিয়ে প্রতিস্থাপন করা যায় না। ফলে বাস্তবতার বিচারে এটি মূলত একটি সমভাবাপন্ন ধারারই এক্সটেনশন হিসেবে কাজ করছে।’
অধ্যাপক নিজাম উদ্দিন বলেন, ‘সামগ্রিকভাবে বাংলাদেশের রাজনীতি মূলত তিনটি শক্তির (বিএনপি, জামায়াত ও আওয়ামী লীগ) অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক গতিধারার মধ্যেই আবর্তিত হবে। কোনো রাজনৈতিক দলকে রাতারাতি নিশ্চিহ্ন করা সম্ভব নয়, কারণ প্রতিটি দলেরই নির্দিষ্ট সামাজিক ভিত্তি রয়েছে।’
এদিকে বাম ও প্রগতিশীল দলগুলোও রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্তের গঠনমূলক সমালোচক হিসেবে কাজ করার চেষ্টা করছে। সংসদীয় রাজনীতিতে তাদের কোনো প্রতিনিধিত্ব না থাকায় তাদের রাজপথেই নানা কর্মসূচিতে সরব থাকতে হচ্ছে। এর মধ্যে অবশ্য এসব দলকে খুব বড় কোনো কর্মসূচি নিয়ে হাজিরও হতে দেখা যায়নি।
বামপন্থি রাজনীতির দৃষ্টিকোণ থেকে প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর অতীত ও বর্তমান ভূমিকা নিয়ে সমালোচনা করে সিপিবি সভাপতি কাজী সাজ্জাদ জহির চন্দন বলেন, ‘বিরোধী ভূমিকার বৈচিত্র্য না থাকা এবং মূলধারার দলগুলোর পারস্পরিক রাজনৈতিক ব্যবহারের কারণে দেশের রাষ্ট্র ও সমাজব্যবস্থায় টেকসই ইতিবাচক পরিবর্তন আনা কঠিন হয়ে পড়ছে।’
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পরের ছয় মাসের সার্বিক গতিপ্রকৃতি বিশ্লেষণ করে বিশ্লেষকরা বলছেন, এই সময়ে ক্ষমতার হাতবদল ঘটেছে, জাতীয় সংসদে নতুন রাজনৈতিক বিন্যাস তৈরি হয়েছে এবং নীতিপ্রণেতাদের তালিকায় বহু নতুন মুখ যুক্ত হয়েছেন। কিন্তু রাষ্ট্র পরিচালনা, আমলাতান্ত্রিক মানসিকতা, স্থানীয় ক্ষমতার দাপট ও রাজনৈতিক সংস্কৃতির গভীরে প্রোথিত পুরোনো আচরণগুলোর মৌলিক বা গুণগত পরিবর্তন এখনো খুব একটা দেখা যায়নি।
তারা বলছেন, সরকার পরিবর্তনের ফলে রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণে নতুন চালক এসেছেন, কিন্তু শাসনব্যবস্থার পুরোনো প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতাগুলো দূর করা সম্ভব হয়নি।
অধ্যাপক নিজাম উদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘বাংলাদেশের রাজনীতি বর্তমানে এক গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে অবস্থান করছে। নির্বাচনোত্তর এই রূপান্তরকে টেকসই গণতান্ত্রিক সংস্কৃতিতে পরিণত করতে হলে সরকারকে অনভিজ্ঞতার সংকট কাটিয়ে উঠে প্রশাসনিক সংস্কারে মনোযোগী হতে হবে, বিরোধী দলকে সংসদে কার্যকর সুযোগ দিতে হবে এবং সাংবিধানিক বিরোধগুলো দ্রুত নিষ্পত্তি করতে হবে। তা না হলে ক্ষমতার চরিত্র অপরিবর্তিত রেখে কেবল মুখের পরিবর্তন জনগণের দীর্ঘদিনের গণতান্ত্রিক রূপান্তরের স্বপ্নকে আবারও এক অনিশ্চিত রাজনৈতিক ধাঁধায় ফেলে দেবে।’

জুলাই অভ্যুত্থানের দেড় বছর পর অনুষ্ঠিত হলো ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। এরপর পেরিয়ে গেছে আরও ছয় মাস। প্রথমে জুলাই অভ্যুত্থান ও পরে জাতীয় নির্বাচনের মাধ্যমে বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে বাহ্যিক দৃশ্যপট ও ক্ষমতার হাতবদল ঘটেছে সুস্পষ্টভাবে। সরকার ও প্রশাসনে এসেছে নতুন মুখ।
কিন্তু দেশের রাজনীতির মৌলিক চরিত্র, প্রাতিষ্ঠানিক শাসনব্যবস্থা, আমলাতান্ত্রিক মানসিকতা, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জবাবদিহিতা বা তৃণমূল পর্যায়ে ক্ষমতা চর্চার ধরনে কি আসলেই পরিবর্তন এসেছে? নাকি চেনা রাজনৈতিক ব্যবস্থার ভেতরে কেবল ক্ষমতার পুনর্বিন্যাস ঘটেছে?
২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে ঘটে যাওয়া ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের মূল স্লোগানই ছিল ‘রাষ্ট্র সংস্কার’ এবং একটি ‘নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্তে’র সূচনা। আন্দোলন-পরবর্তী অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়কাল, ঐতিহাসিক জুলাই সনদ ও ২০২৬ সালের জাতীয় নির্বাচন ঘিরে দেশের সর্বস্তরের মানুষের প্রত্যাশা ছিল আকাশচুম্বী। সেই জাতীয় নির্বাচনের ছয় মাস পরের বাস্তবতায় তাই স্বভাবতই প্রশ্ন উঠেছে— সেই জনআকাঙ্ক্ষার কতটা পূরণ হয়েছে?
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে যেকোনো নির্বাচনই ক্ষমতার পরিবর্তন নিয়ে আসে, কিন্তু প্রাতিষ্ঠানিক আচরণ বা রাষ্ট্র পরিচালনার দর্শনে বড় কোনো পরিবর্তন আনে না। ২০২৬ সালের নির্বাচনের পর বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতাও এই দীর্ঘদিনের দ্বিমুখী চরিত্রের মুখোমুখি দাঁড়িয়েছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও প্রাতিষ্ঠানিক গবেষকদের মতে, নির্বাচন-পরবর্তী সময়কালকে মূলত তিনটি দিক থেকে মূল্যায়ন করা যায়।
প্রথমত, সংসদীয় কার্যক্রমে বহুদলীয় উপস্থিতি নিশ্চিত হওয়া ও রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে নতুন শক্তির যুক্ত হওয়ার মধ্য দিয়ে এক ধরনের ইতিবাচক পরিবর্তন দৃশ্যমান। দ্বিতীয়ত, জোটের সমীকরণ ও ক্ষমতার ভারসাম্যে তৈরি হওয়া নতুন রূপটি মূলত একটি সংক্রান্তিকালীন অবস্থা। তৃতীয় ও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিকটি হলো প্রাতিষ্ঠানিক শাসনব্যবস্থা, যেখানে আমলাতান্ত্রিক প্রাধান্য, স্থানীয় পর্যায়ে পৃষ্ঠপোষকতার রাজনীতি ও বাজার নিয়ন্ত্রণে আগের ধারার উপস্থিতিই প্রকট।
দেশের চলমান রাজনৈতিক পরিস্থিতির মূল্যায়ন করতে গিয়ে বাংলাদেশ জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (বাংলাদেশ জাসদ) সভাপতি শরীফ নুরুল আম্বিয়া রাজনীতি ডটকমকে বলেন, ‘২০২৬ সালের জাতীয় নির্বাচনের পর গঠিত নতুন সরকারের কাজকর্ম পর্যবেক্ষণ করে রাজনীতিতে নানা ধরনের প্রশ্ন ও মিশ্র প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছে। একদিকে সরকার যেমন বেশ কিছু জনপ্রিয় কর্মসূচি হাতে নিয়েছে এবং বিদ্যমান সমস্যাগুলো মানিয়ে নেওয়া ও কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা করছে, তেমনি সংসদে নানামুখী ধোঁয়াশা তৈরির পাশাপাশি বহু অমীমাংসিত সামাজিক ও প্রশাসনিক সংকট রয়ে গেছে, যা সরকার এখনো পুরোপুরি সামলে উঠতে পারেনি।’
একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধের মতো মৌলিক ও রাজনৈতিক ইস্যুতে সরকারের অবস্থান এখনো অস্পষ্ট, যা রাজনৈতিক আদর্শিক মেরুকরণের সংকটকে গভীরতর করছে— এমনটিই মনে করছেন বর্ষীয়ান রাজনীতিবিদ শরীফ নুরুল আম্বিয়া।
অন্যদিকে আগের রাজনৈতিক সংস্কৃতিরই পুনরাবৃত্তি দেখছেন বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) সভাপতি কাজী সাজ্জাদ জহির চন্দন। রাজনীতি ডটকমকে তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশের রাজনীতিতে আসলে গুণগত কোনো পরিবর্তন আসেনি। রাজনৈতিক পরিস্থিতি পর্যালোচনা করলে মুক্তকণ্ঠে রাজনীতি করার স্বাধীনতার প্রকাশ গত ছয় মাসে দেখা যায়নি। গত ছয় মাসেও বাংলাদেশের প্রতিটি স্তরে ক্ষমতার প্রয়োগ করা ও নির্যাতন করার মতো বিষয়গুলো অব্যাহতই রয়েছে।’
সিপিবি সভাপতির সরকারকে সতর্ক করে বলেন, ‘রাষ্ট্র পরিচালনার পুরোনো ধারা অব্যাহত থাকলে সরকারের প্রোপাগান্ডা ব্যর্থ হতে বাধ্য। সেক্ষেত্রে সংকট নিরসন না হলে জনগণ আবারও রাজপথে বিকল্প পথ বেছে নিতে বাধ্য হতে পারে।’
বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে সংসদের ভেতরে সিদ্ধান্ত বদলে রাজপথের আন্দোলনের মাধ্যমে দাবি আদায়ের প্রবণতাই বেশি লক্ষ্যণীয়। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পরও সংসতের বাইরে রাজপথকে ক্ষমতার মূল ক্ষেত্র হিসেবে ব্যবহার করার পুরোনো অভ্যাস থেকে দলগুলো পুরোপুরি বের হতে পারেনি।
এ বিষয়ে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের (চবি) জনপ্রশাসন বিভাগের সুপারনিউমারারি অধ্যাপক ড. নিজাম উদ্দিন আহমেদ রাজনীতি ডটকমকে বলেন, ‘২০২৬ সালের জাতীয় নির্বাচনের পর বাংলাদেশের রাজনীতিতে কী পরিবর্তন এসেছে— এ প্রশ্নের সোজা বাংলা উত্তর হলো— দৃশ্যমান কোনো পরিবর্তনই আসেনি। আমরা দীর্ঘদিন ধরে যে গতানুগতিক ও সাংঘর্ষিক রাজনীতির ধারা দেখে আসছি, তা থেকে বেরিয়ে আসার কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না।’
অধ্যাপক নিজাম উদ্দিন আহমেদ বিষয়টির ব্যাখা দিয়ে বলেন, “সুস্থ ও গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক চর্চা গড়ে তুলতে হলে সংসদকেই রাজনীতির মূল কেন্দ্রবিন্দু করতে হবে। কিন্তু সংসদে থেকেও রাজপথকে রাজনীতির প্রধান কেন্দ্র হিসেবে ধরে রাখতে চাইলে সেটি একসঙ্গে চলতে পারে না। রাজপথের রাজনীতি ও সংসদের রাজনীতি সাংঘর্ষিক— যেকোনো একটি বেছে নিতে হবে। দুর্ভাগ্যবশত, আমাদের দেশের সরকারি বা বিরোধী দল— সবার ভাষা একই থেকে গেছে। সংসদ সদস্য হওয়া সত্ত্বেও ‘রাজপথ ছাড়ব না’ মনোভাব থেকে আমরা বের হতে পারছি না।”
জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে সরকারি ও বিরোধী দলের মধ্যে আবশ্যকীয় রাজনৈতিক সমঝোতা ও ঐক্যমত্য এখনো তৈরি হয়নি উল্লেখ করে অধ্যাপক নিজাম বলেন, “এর মধ্যে আবার মন্ত্রিসভার অর্ধশত সদস্যের মধ্যে প্রায় ৮০ শতাংশই নতুন এবং প্রথমবার সংসদ সদস্য হওয়ায় সরকারি কর্মকাণ্ড পরিচালনায় প্রশাসনিক অনভিজ্ঞতা প্রকাশ পাচ্ছে। অন্যদিকে ঐতিহ্যগত সমঝোতার ব্যত্যয় ঘটিয়ে একমাত্র ‘পাবলিক অ্যাকাউন্টস কমিটি’ ছাড়া অন্য কোনো গুরুত্বপূর্ণ সংসদীয় কমিটির প্রধান হিসেবে বিরোধী দলকে যুক্ত করা হয়নি, যা সংঘাতের ক্ষেত্রকে প্রসারিত করছে।”
বিরোধী দল সংসদীয় রাজনীতিতে মনোযোগী হতে চাইলেও তা বাস্তবায়ন করতে না পারার পেছনে সংসদে বৈষম্যের শিকার হওয়ার অভিযোগ তুলেছে। সোমবার (২৪ আগস্ট) রাজধানীর মিন্টো রোডে জাতীয় দৈনিকের সম্পাদকদের সঙ্গে এক মতবিনিময় সভা আয়োজন করে সংসদের প্রধান বিরোধী দল বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী।
ওই সভা শেষে দলের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার সাংবাদিকদের বলেন, ‘ঐতিহ্যগত সংঘাতের রাজনীতি থেকে সরে এসে জামায়াত ও ১১-দলীয় জোট সংসদে দায়িত্বশীল ও গঠনমূলক বিরোধী দলের ভূমিকা পালন করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। কিন্তু জাতীয় সংসদে বিরোধীদলীয় সংসদ সদস্যদের ক্ষেত্রে উন্নয়ন বরাদ্দ, সংসদে কথা বলার সুযোগ, আইন প্রণয়ন ও নোটিশ গ্রহণের ক্ষেত্রে বৈষম্যমূলক আচরণ করা হচ্ছে।’
জুলাই অভ্যুত্থানের এক বছর পার করে গত বছরের ১৭ অক্টোবর জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সম্মতিতে সই হয় ‘জুলাই জাতীয় সনদ ২০২৫’। রাজনৈতিক দলগুলো এই সনদকে নতুন রাজনৈতিক কাঠামোর আইনি ও নৈতিক ভিত্তি হিসেবে অভিহিত করে। তবে জাতীয় নির্বাচনের পর ছয় মাসে এই সনদ বাস্তবায়ন হওয়ার কথা থাকলেও তা নিয়ে তীব্র অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে।
জুলাই সনদ আদেশের অধীনে অনুষ্ঠিত গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জয়যুক্ত হয়ে সনদ বাস্তবায়নের পক্ষে জনরায় মিললেও সে অনিশ্চয়তা কাটেনি। বরং নির্বাচনের পর দুই শপথের জটিলতাকে ইস্যু করে জুলাই সনদ আদেশে প্রস্তাবিত সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠনই করা যায়নি।
এখন পর্যন্ত জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পার্টিসহ (এনসিপি) বিরোধী দলগুলো সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন করেই সংবিধান সংস্কার করার পক্ষে অনড়। অন্যদিকে সরকার বলছে, তারা ‘নোট অব ডিসেন্ট’সহ যে জুলাই সনদে সই করেছে, তা অক্ষরে অক্ষরে বাস্তবায়ন করবে, তবে সেটি সংস্কার নয়, বরং সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে। কারণ সই হওয়া জুলাই সনদে সংবিধান সংস্কার পরিষদের অস্তিত্ব ছিল না, যা সরকারি দলের ভাষায় জুলাই সনদ আদেশের মাধ্যমে ‘চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে’।
এই সংকটকে গুরুতর অভিহিত করে অধ্যাপক ড. নিজাম উদ্দিন আহমেদ রাজনীতি ডটকমকে বলেন, “বর্তমানে দুটি মৌলিক বিষয়ে চরম দ্বিমত ও সাংবিধানিক সংকট তৈরি হয়েছে। প্রথমত, সংসদকে ‘সংবিধান সংস্কার পরিষদ’ হিসেবে মেনে নেওয়া বা না নেওয়া এবং দুই শপথের জটিলতা। দ্বিতীয়ত, ‘জুলাই সনদ’ ও এর ওপর প্রস্তাবিত গণভোটের আইনি ও রাজনৈতিক মীমাংসা।”
তিনি বলেন, ‘জুলাই সনদে দ্বিমত থাকা বিষয়ে বলা ছিল— যে যার অবস্থান নিয়ে জনগণের কাছে ম্যান্ডেট চাইবে। কিন্তু এখন এর ব্যাখ্যা নিয়ে জামায়াত ও বিএনপির ভিন্নমুখী অবস্থান সংকট বাড়াচ্ছে। বিষয়টি বর্তমানে আদালতে বিচারাধীন, তবে রাষ্ট্রপতির আদেশের মাধ্যমে ঘোষিত এই সংকট দ্রুত নিষ্পন্ন না হলে আমরা অবশ্যম্ভাবীভাবে বড় আকারের সাংঘর্ষিক রাজনীতি ও রাজনৈতিক অস্থিরতার দিকে ধাবিত হব।’
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা সতর্ক করে বলছেন, সাংবিধানিক সংস্কারের বিষয়গুলো কেবল আদালতের রায়ের ওপর ছেড়ে দিলে রাজনৈতিক উত্তেজনা প্রশমিত হবে না, এর জন্য রাজনৈতিক দূরদর্শিতা ও আন্তঃদলীয় মেধাভিত্তিক সংলাপের বিকল্প নেই।
রাজনৈতিক দলগুলোর বক্তৃতা ও ইশতেহারে পরিবর্তনের প্রতিশ্রুতি থাকলেও তৃণমূল রাজনীতির বাস্তবতা অত্যন্ত জটিল। দেশের বিভিন্ন জেলা, উপজেলা, পৌরসভা ও ইউনিয়ন পরিষদ পর্যায়ে ক্ষমতা চর্চার চিরচেনা ধরনই দৃশ্যমান বলে অভিমত বিশ্লেষকদের।
বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনেও কয়েকটি ক্ষেত্র দৃশ্যমান হয়। প্রথমত, হাট-বাজার ও গণপরিবহন স্ট্যান্ড নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে ক্ষমতা বদলের পরপরই পুরোনো রাজনৈতিক ক্যাডারদের সরিয়ে নতুন ক্ষমতাসীন বলয়ের অনুসারীদের আধিপত্য প্রতিষ্ঠার ঘটনা ঘটেছে।
দ্বিতীয়ত, স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) ও পানি উন্নয়ন বোর্ডের ইজারা ও ঠিকাদারি কাজে প্রশাসনিক নিরপেক্ষতার অভাব এবং স্থানীয় দলীয় নেতাদের সরাসরি হস্তক্ষেপের অভিযোগ উঠেছে।
তৃতীয়ত, জেলা পরিষদ, উপজেলা পরিষদ ও স্থানীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর পরিচালন পর্ষদে রাজনৈতিক মনোনীতদের বসানোর পুরোনো প্রথা অব্যাহত রয়েছে।
প্রশাসনিক ও সামাজিক স্তরে এই দলীয়করণ প্রসঙ্গে অধ্যাপক নিজাম বলেন, “বিগত সরকারগুলোর মতো বর্তমান সরকারের মধ্যেও রাষ্ট্রকে শক্তিশালী করার চেয়ে ‘সরকারকে শক্তিশালী করা’র পুরোনো ও ঐতিহ্যগত প্রবণতাই স্পষ্ট। জেলা পরিষদ, উপজেলা পরিষদ থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত সব স্তরে দলীয় লোক বসানোর প্রবণতা দেখা যাচ্ছে।’
অবশ্য স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলো নিয়ে বিপরীতমুখী যুক্তিও রয়েছে। কোনো কোনো বিশ্লেষক বলেন, সাধারণভাবে এসব প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করেন যেসব নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি, তারা রাজনৈতিক দলের নেতাই হয়ে থাকেন। নির্বাচন না হলেও প্রশাসক হিসেবে তাদেরই বসানো হয়েছে। এ ক্ষেত্রে বেশির ভাগ জায়গাতেই ওইসব প্রতিষ্ঠানের জন্য সরকারি দল তাদের সম্ভাব্য প্রার্থীদেরই পদায়ন করেছে।
নির্বাচন-পরবর্তী ছয় মাসে সবচেয়ে বড় আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু ছিল আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভূমিকা ও আমলাতন্ত্রের কর্মদক্ষতা। পুলিশ প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে রাজনীতির প্রভাবমুক্ত করার দাবি বহু বছরের হলেও মাঠপর্যায়ে তার প্রতিফলন অত্যন্ত সীমিত। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে রাজনৈতিক সহিংসতা, মব সহিংসতা ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সাফল্য না পাওয়ার সংকট।
বাংলাদেশ জাসদের সভাপতি শরীফ নুরুল আম্বিয়া অতি সম্প্রতি রংপুরের ঘটে যাওয়া চার খুনের ঘটনার প্রসঙ্গ টেনে ক্ষোভ জানিয়ে বলেন, ‘রংপুরের মর্মান্তিক ঘটনাসহ দেশ জুড়ে ঘটে চলা সহিংসতা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি তুলে ধরে। এর কারণ, সহিংসতার পুরোনো রাজনীতি থেকে উত্তরণ ঘটেনি। আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় প্রশাসনের আরও জোরালো পদক্ষেপ ও ঘটনার সুষ্ঠু তদন্তের প্রয়োজনীয়তা প্রকাশ পাচ্ছে।’
সিপিবি সভাপতি কাজী সাজ্জাদ জহির চন্দন রাজনীতি ডটকমকে বলেন, ‘সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে। এ পরিস্থিতির উন্নতি করতে সরকারের যে ভূমিকা থাকা প্রয়োজন ছিল, তা আমরা দেখতে পাচ্ছি না। আগে যা ছিল, এখন তারই এক ধরনের ধারাবাহিকতা বহাল আছে।’
রাজনীতি ও অর্থনীতির মধ্যকার ‘অশুভ আঁতাত’ ভঙ্গ করা ছিল রাজনৈতিক পরিবর্তনের অন্যতম আকাঙ্ক্ষা। কিন্তু চলমান অর্থনৈতিক ও সার্বিক বাজার পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, নিত্যপণ্যের চড়া দাম ও জ্বালানি সংকটের মতো বিষয়গুলো সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রাকে কঠোর করে তুলেছে।
অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় রাজনৈতিক প্রভাবের ধারাবাহিকতা প্রসঙ্গে সিপিবি সভাপতি কাজী সাজ্জাদ জহির চন্দন রাজনীতি ডটকমকে বলেন, ‘এক ধরনের নৈরাজ্য বিরাজ করছে। নিত্যপণ্যের দাম ক্রমাগতভাবে বাড়ছে, কিন্তু তা থেকে উদ্ধার পাওয়ার কোনো পথ নেই। ফলে জনজীবন চরম সংকটের মধ্যে পড়েছে।’
বিরোধী দল হিসেবে জনগণের পক্ষে কথা বলতে গেলেও প্রশাসনিক বা রাজনৈতিক বাধা তৈরি করা হচ্ছে বলে অভিযোগ করেন সিপিবি সভাপতি। বলেন, এমন আচরণ গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার জন্য অশনিসংকেত।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর বাংলাদেশের দলীয় রাজনীতির সমীকরণ সম্পূর্ণ নতুন রূপ ধারণ করেছে। দীর্ঘদিনের প্রচলিত দ্বি-মেরুকরণের পরিবর্তে একাধিক রাজনৈতিক শক্তির উপস্থিতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে। একদিকে ক্ষমতাসীন দল রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার মূল চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করছে, অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামী ও ১১-দলীয় জোট প্রধান বিরোধী দল হিসেবে নিজেদের অবস্থান তৈরি করেছে।
জামায়াতের নেতৃত্বাধীন জোটের অংশ হলেও জুলাই অভ্যুত্থানের গর্ভ থেকে উঠে আসা জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) দেশের রাজনীতিতে নতুন মুখ হিসেবে শক্তিশালী অবস্থান করে নিয়েছে। জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ছয়টি আসনে জয়লাভ করেছে তারা। এই সামান্য উপস্থিতি নিয়েও সংসদে এরই মধ্যে তারা নিজেদের নতুন প্রজন্মের কণ্ঠস্বর হিসেবে তুলে ধরেছে।
এনসিপির ভূমিকা প্রসঙ্গে অবশ্য খুব ইতিবাচক আশা দেখছেন না ড. নিজাম উদ্দিন আহমেদ। তিনি বলেন, ‘এনসিপি নতুন শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হলেও রাজনৈতিকভাবে তা কোনো বড় পরিবর্তন আনবে বলে মনে হয় না। নীতি, আদর্শ বা কর্মসূচির দিক থেকে জামায়াতের সঙ্গে তাদের কোনো মৌলিক পার্থক্য দৃশ্যমান নয়। একটি নতুন দলের নিজস্ব অর্থনৈতিক নীতি, প্রশাসনিক দূরদৃষ্টি ও রাজনৈতিক রূপরেখা থাকা প্রয়োজন, যা কেবল আবেগ দিয়ে প্রতিস্থাপন করা যায় না। ফলে বাস্তবতার বিচারে এটি মূলত একটি সমভাবাপন্ন ধারারই এক্সটেনশন হিসেবে কাজ করছে।’
অধ্যাপক নিজাম উদ্দিন বলেন, ‘সামগ্রিকভাবে বাংলাদেশের রাজনীতি মূলত তিনটি শক্তির (বিএনপি, জামায়াত ও আওয়ামী লীগ) অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক গতিধারার মধ্যেই আবর্তিত হবে। কোনো রাজনৈতিক দলকে রাতারাতি নিশ্চিহ্ন করা সম্ভব নয়, কারণ প্রতিটি দলেরই নির্দিষ্ট সামাজিক ভিত্তি রয়েছে।’
এদিকে বাম ও প্রগতিশীল দলগুলোও রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্তের গঠনমূলক সমালোচক হিসেবে কাজ করার চেষ্টা করছে। সংসদীয় রাজনীতিতে তাদের কোনো প্রতিনিধিত্ব না থাকায় তাদের রাজপথেই নানা কর্মসূচিতে সরব থাকতে হচ্ছে। এর মধ্যে অবশ্য এসব দলকে খুব বড় কোনো কর্মসূচি নিয়ে হাজিরও হতে দেখা যায়নি।
বামপন্থি রাজনীতির দৃষ্টিকোণ থেকে প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর অতীত ও বর্তমান ভূমিকা নিয়ে সমালোচনা করে সিপিবি সভাপতি কাজী সাজ্জাদ জহির চন্দন বলেন, ‘বিরোধী ভূমিকার বৈচিত্র্য না থাকা এবং মূলধারার দলগুলোর পারস্পরিক রাজনৈতিক ব্যবহারের কারণে দেশের রাষ্ট্র ও সমাজব্যবস্থায় টেকসই ইতিবাচক পরিবর্তন আনা কঠিন হয়ে পড়ছে।’
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পরের ছয় মাসের সার্বিক গতিপ্রকৃতি বিশ্লেষণ করে বিশ্লেষকরা বলছেন, এই সময়ে ক্ষমতার হাতবদল ঘটেছে, জাতীয় সংসদে নতুন রাজনৈতিক বিন্যাস তৈরি হয়েছে এবং নীতিপ্রণেতাদের তালিকায় বহু নতুন মুখ যুক্ত হয়েছেন। কিন্তু রাষ্ট্র পরিচালনা, আমলাতান্ত্রিক মানসিকতা, স্থানীয় ক্ষমতার দাপট ও রাজনৈতিক সংস্কৃতির গভীরে প্রোথিত পুরোনো আচরণগুলোর মৌলিক বা গুণগত পরিবর্তন এখনো খুব একটা দেখা যায়নি।
তারা বলছেন, সরকার পরিবর্তনের ফলে রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণে নতুন চালক এসেছেন, কিন্তু শাসনব্যবস্থার পুরোনো প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতাগুলো দূর করা সম্ভব হয়নি।
অধ্যাপক নিজাম উদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘বাংলাদেশের রাজনীতি বর্তমানে এক গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে অবস্থান করছে। নির্বাচনোত্তর এই রূপান্তরকে টেকসই গণতান্ত্রিক সংস্কৃতিতে পরিণত করতে হলে সরকারকে অনভিজ্ঞতার সংকট কাটিয়ে উঠে প্রশাসনিক সংস্কারে মনোযোগী হতে হবে, বিরোধী দলকে সংসদে কার্যকর সুযোগ দিতে হবে এবং সাংবিধানিক বিরোধগুলো দ্রুত নিষ্পত্তি করতে হবে। তা না হলে ক্ষমতার চরিত্র অপরিবর্তিত রেখে কেবল মুখের পরিবর্তন জনগণের দীর্ঘদিনের গণতান্ত্রিক রূপান্তরের স্বপ্নকে আবারও এক অনিশ্চিত রাজনৈতিক ধাঁধায় ফেলে দেবে।’

জবাবে প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘আমি তো সিটিজেন নিয়ে আছি, আপনি বলেন নেটিজেন! মানে কোন নেটিজেন? আমি তো সিটিজেন নিয়ে আছি, কাজ করি। আপনি বলেন নেটিজেন! তো মানে কোন নিউজপেপার? কার এত জ্বালা, যে কাজ করতে দেবে না, হ্যাঁ?’
২ দিন আগে
রুহুল কবির রিজভী আরও বলেন, ‘দলের মধ্যে শৃঙ্খলা রক্ষা করাই আমার মূল দায়িত্ব। দলের নাম ব্যবহার করে কেউ অনৈতিক কাজে জড়ালে এবং শৃঙ্খলা পরিপন্থি কাজ করলে তার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
২ দিন আগে
বিএনপি সরকার জনগণকে যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল তার কোনোটিই রক্ষা করতে পারেনি। সরকার গ্যাস ও জ্বালানি সংকট, দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতিসহ মোটা দাগে ২৯টি ক্ষেত্রে চরম অব্যবস্থাপনার পরিচয় দিয়েছে।
২ দিন আগে
মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারে বাংলাদেশ থেকে কর্মী নিয়োগের ক্ষেত্রে নতুন ‘সিন্ডিকেটে’র আশঙ্কার কথা জানিয়েছে সংসদের বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। দলগুলো বলছে, সরকারের একটি অসাধু চক্র দেশের স্বার্থবিরোধী কর্মকাণ্ডে লিপ্ত হয়েছে। কোনো ধরনের সিন্ডিকেট গড়ে ওঠার সুযোগ যেন তৈরি না হয়, সে
২ দিন আগে