সাক্ষাৎকার
সাক্ষাৎকারে প্রকৌশলী মেহেদী হাসান

প্রকাশনা শিল্পের কর সংস্কার জ্ঞানভিত্তিক অর্থনৈতিক রূপান্তরে বৈপ্লবিক ভূমিকা রাখবে

সাক্ষাৎকারে প্রকৌশলী মেহেদী হাসান

প্রকাশনা শিল্পের কর সংস্কার জ্ঞানভিত্তিক অর্থনৈতিক রূপান্তরে বৈপ্লবিক ভূমিকা রাখবে

শাহরিয়ার শরীফ

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) কাছে বাংলাদেশের শিক্ষা, সৃজনশীল প্রকাশনা শিল্প ও জ্ঞানভিত্তিক ইকোসিস্টেমের আমূল পরিবর্তনের লক্ষ্যে একগুচ্ছ বাস্তবমুখী নীতি সংস্কার প্রস্তাব পেশ করেছে দেশের শীর্ষস্থানীয় শিক্ষাবিষয়ক প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান ‘লেকচার পাবলিকেশন্স পিএলসি’ ও ‘অমিকন পাবলিশিং হাউস’। এ প্রস্তাবনার মূল লক্ষ্য— আমদানি শুল্ক যৌক্তিকীকরণ, কর অবকাশ, পাইরেসি রোধ ও মেধাভিত্তিক ডিজিটাল রূপান্তরের মাধ্যমে দেশের মানবসম্পদ উন্নয়ন ও রপ্তানি আয়ের নতুন দিগন্ত উন্মোচন করা।

এই সামগ্রিক মহাপরিকল্পনা ও ডিজিটাল নলেজ ইকোসিস্টেমের ভবিষ্যৎ নিয়ে রাজনীতি ডটকমের সঙ্গে বিস্তারিত আলাপ করেছেন অমিকন গ্রুপ ও লেকচার পাবলিকেশন্সের চেয়ারম্যান প্রকৌশলী মেহেদী হাসান। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন শাহরিয়ার শরিফ। পাঠকদের জন্য সাক্ষাৎকারটির চুম্বক অংশ তুলে ধরা হলো।

রাজনীতি ডটকম: এনবিআরের কাছে আপনারা সম্প্রতি যে প্রস্তাবনা জমা দিয়েছেন, তার মূল দর্শন বা পটভূমি কী? কেন এই মুহূর্তে এই সংস্কারগুলো প্রকাশনা শিল্পের জন্য এত বেশি জরুরি?

মেহেদী হাসান: আমরা যখন একটি উন্নত, সমৃদ্ধ ও ‘স্মার্ট বাংলাদেশ’ বা মেধাভিত্তিক অর্থনীতি গড়ে তোলার কথা বলি, তখন তার মূল ভিত্তি কিন্তু শিক্ষা ও জ্ঞান বিতরণ ব্যবস্থা। আর এই ব্যবস্থার প্রধান কারিগর হলো শিক্ষামূলক ও সৃজনশীল প্রকাশনা শিল্প। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত, আমাদের দেশের এই বিশাল শিল্পটি দীর্ঘদিন ধরে অবহেলিত এবং ট্যাক্স-ডিউটির জটিল জালে বন্দি। বর্তমানে কাঁচামালের আকাশচুম্বী দাম ও উচ্চ কর হারের কারণে বইয়ের উৎপাদন খরচ ৩০ শতাংশ থেকে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে গেছে। ফলে সাধারণ শিক্ষার্থী ও পাঠকদের বই কেনার ক্ষমতা কমছে।

আমরা এনবিআরের কাছে যে প্রস্তাবনা দিয়েছি, তা কেবল কিছু কর ছাড়ের দাবি নয়; এটি মূলত বাংলাদেশকে একটি ‘নলেজ ইকোসিস্টেম’ বা জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতিতে রূপান্তর করার একটি সামগ্রিক ব্লুপ্রিন্ট। আমরা বিশ্বাস করি, এনবিআর যদি এই সংস্কারগুলো বাস্তবায়ন করে, তবে এটি দেশের শিক্ষা, কর্মসংস্থান এবং মেধাভিত্তিক রপ্তানি খাতে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনবে।

রাজনীতি ডটকম: আপনারা কাগজ, কালি ও প্রিন্টিং যন্ত্রপাতির আমদানি শুল্ক এক অঙ্কে নামিয়ে আনার দাবি জানিয়েছেন। বর্তমান বাস্তবতায় এর প্রভাব কেমন হতে পারে?

মেহেদী হাসান: এটি আমাদের অন্যতম প্রধান ও অত্যন্ত যৌক্তিক দাবি। বর্তমানে কাগজ ও কালির মতো অত্যাবশ্যকীয় কাঁচামাল আমদানির ক্ষেত্রে কাস্টমস ডিউটি, ভ্যাট, এআইটি ও আরডি মিলিয়ে মোট করের বোঝা প্রায় ২৫ শতাংশ থেকে ৩৭ শতাংশ পর্যন্ত গিয়ে দাঁড়ায়। এটি একটি জ্ঞানভিত্তিক সমাজের জন্য চরম অন্তরায়। উচ্চ শুল্কের কারণে স্থানীয় প্রকাশকরা আন্তর্জাতিক মানের বই তৈরি করতে গিয়ে তীব্র আর্থিক চাপের মুখে পড়ছেন। আমাদের প্রস্তাব হলো— সব ধরনের শিক্ষা উপকরণ ও প্রিন্টিং যন্ত্রপাতির আমদানি শুল্ক মোট ৫ শতাংশ থেকে ৯ শতাংশের মধ্যে, অর্থাৎ এক অঙ্কে নামিয়ে আনা হোক।

এর ফলে সরাসরি দুটি বড় সুফল মিলবে— প্রথমত, প্রতিটি একাডেমিক ও সৃজনশীল বইয়ের খুচরা মূল্য অন্তত ২০ শতাংশ থেকে ২৫ শতাংশ কমে আসবে, যা সরাসরি দেশের কোটি কোটি শিক্ষার্থীর শিক্ষা ব্যয় হ্রাস করবে; এবং দ্বিতীয়ত, এটি সৎ ও নিয়ম মেনে চলা প্রকাশকদের একটি লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড দেবে, যার ফলে আন্ডার-ইনভয়েসিং বা মিথ্যা ঘোষণা দিয়ে কাঁচামাল আমদানির প্রবণতা শূন্যে নেমে আসবে। সরকার হয়তো সাময়িকভাবে সামান্য শুল্ক হারাবে, কিন্তু অর্থনীতিতে বৈধ ব্যবসার পরিমাণ বাড়লে দীর্ঘমেয়াদে এনবিআরের রাজস্বের পরিধি অনেক গুণ বেড়ে যাবে।

Mehedi Hasan Of Lecture Interview Photos 24-05-2026 (3)

রাজনীতি ডটকম: প্রকাশনা শিল্পকে ৫ থেকে ১০ বছরের জন্য ‘ট্যাক্স হলিডে’ বা কর অবকাশ দেওয়ার প্রস্তাব করেছেন আপনারা। একটি বাণিজ্যিক শিল্পকে কেন সরকার এই বিশেষ সুবিধা দেবে?

মেহেদী হাসান: খুব ভালো প্রশ্ন করেছেন। আমাদের বুঝতে হবে, প্রকাশনা শিল্প অন্য আট-দশটা সাধারণ বাণিজ্যিক ব্যবসার মতো নয়। এটি সরাসরি দেশের ‘হিউম্যান ক্যাপিটাল ডেভেলপমেন্ট’ বা মানবসম্পদ উন্নয়নের সঙ্গে যুক্ত। সরকার আইটি খাতকে বা তৈরি পোশাক খাতকে কিন্তু বছরের পর বছর কর অবকাশ সুবিধা দিয়ে আজকের এ অবস্থানে নিয়ে এসেছে। আইটি খাত যদি প্রযুক্তিগত অবকাঠামো তৈরি করে, তবে প্রকাশনা শিল্প তৈরি করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসহ (এআই) সেই প্রযুক্তি ব্যবহার করার মতো যোগ্য ও মেধাবী মানুষ।

বর্তমানে দেশের প্রকাশনা খাতের একটি বড় অংশ এখনো অনানুষ্ঠানিক বা ব্যাকডেটেড রয়ে গেছে। আমরা এ খাতকে ৫ থেকে ১০ বছরের কর অবকাশ সুবিধা দিলে বড় বড় করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলো এই শিল্পে আধুনিক প্রযুক্তি, বিশ্বমানের প্রিন্টিং ফ্যাসিলিটি ও ডিজিটাল কনটেন্ট প্ল্যাটফর্মে বড় অঙ্কের বিনিয়োগ করতে উৎসাহিত হবে। এটি শুধু মেধা চর্চাকেই বিকশিত করবে না, বরং আগামী পাঁচ বছরে এই খাতের অন্তত পাঁচ লাখ উচ্চ দক্ষতাসম্পন্ন নতুন কর্মসংস্থান (যেমন— পেশাদার এডিটর, গ্রাফিক ডিজাইনার, ডিজিটাল রাইটস স্পেশালিস্ট, ট্রান্সলেটর) তৈরি করবে। কর অবকাশের মাধ্যমে এই শিল্পটি যখন পূর্ণাঙ্গভাবে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নেবে, তখন ৫ বছর পর সরকার এই খাত থেকে বর্তমানের চেয়ে ৫০ গুণ বেশি কর আদায় করতে পারবে।

রাজনীতি ডটকম: কারখানার সক্ষমতা অনুযায়ী লাইসেন্সিং ও মান নিয়ন্ত্রণের বিষয়টি আপনাদের প্রস্তাবনায় এসেছে। এটি কীভাবে কাজ করবে?

মেহেদী হাসান: আমরা লক্ষ করেছি, বাজারে কোনো সুনির্দিষ্ট মানদণ্ড বা লাইসেন্সিং পলিসি না থাকায় যেকোনো সময় নিম্নমানের কাগজ বা ক্ষতিকর রাসায়নিকযুক্ত কালি ব্যবহার করে বই ছেপে বাজারে ছেড়ে দেওয়া হচ্ছে। বিশেষ করে শিশুদের বইয়ের ক্ষেত্রে এটি স্বাস্থ্যের জন্য চরম ঝুঁকিপূর্ণ। আমাদের প্রস্তাব হলো— প্রকাশনা ও মুদ্রণ কারখানাগুলোর অবকাঠামোগত সক্ষমতা, কারিগরি দক্ষতা ও এডিটোরিয়াল স্ট্যান্ডার্ডের ওপর ভিত্তি করে এনবিআর ও সংশ্লিষ্ট আইনি কর্তৃপক্ষ একটি ক্যাটাগরিভিত্তিক লাইসেন্সিং ব্যবস্থা চালু করুক।

প্রতিটি প্রতিষ্ঠান সক্ষমতা ও মান নিয়ন্ত্রণ টিমের আকারের ওপর ভিত্তি করে ছোট, বড় বা মাঝারি পরিসরের কাজের অর্ডার পাবে। বিশেষ করে স্টেম (সায়েন্স, টেকনোলজি, ইঞ্জিনিয়ারিং ও ম্যাথ), উচ্চশিক্ষা ও মৌলিক সৃজনশীল সাহিত্যের প্রকাশকদের জন্য ফাস্ট-ট্র্যাক অনুমোদন ও বিশেষ প্রণোদনা থাকা উচিত। এর ফলে বাজারে একটি সুস্থ প্রতিযোগিতা তৈরি হবে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে আমাদের বইয়ের গ্রহণযোগ্যতা বহুগুণ বাড়বে।

রাজনীতি ডটকম: আপনারা গবেষণা ও উন্নয়ন (আরঅ্যান্ডডি) এবং স্থানীয় লেখকদের জন্য ১৫০ শতাংশ পর্যন্ত উচ্চতর ট্যাক্স রিবেটের (ওয়েটেড ডিডাকশন) দাবি জানিয়েছেন। এর পেছনে মূল ভাবনা কী?

মেহেদী হাসান: আমরা যখন একটি ‘ডিজিটাল নলেজ ইকোসিস্টেমে’র কথা বলি, তখন তার মূল জ্বালানি কিন্তু উদ্ভাবন ও মৌলিক কন্টেন্ট। বর্তমানে আমাদের প্রকাশনা খাতে আরঅ্যান্ডডিতে বিনিয়োগ প্রায় শূন্যের কোঠায়। কোনো নতুন বই বা বিশ্বমানের পাঠ্যক্রম তৈরি করতে গেলে বছরের পর বছর গবেষণা করতে হয়, স্থানীয় বিশেষজ্ঞদের নিয়োজিত করতে হয়।

আমরা যদি এই গবেষণা, অনুবাদ, এডিটোরিয়াল উৎকর্ষ ও স্থানীয় নতুন লেখকদের রয়্যালটি প্রদানের খরচের ওপর ১৫০ শতাংশ ওয়েটেড ট্যাক্স ডিডাকশন বা রিবেট সুবিধা পাই, তবে কোম্পানিগুলো গবেষণায় বিপুল বিনিয়োগ করবে। এতে বিদেশি বইয়ের ওপর আমাদের পরনির্ভরশীলতা কমবে। আমাদের দেশের মেধাবী তরুণরা কন্টেন্ট রাইটিং ও গবেষণাকে পূর্ণাঙ্গ পেশা হিসেবে বেছে নেওয়ার সাহস পাবে। এটি প্রকারান্তরে ব্রেইন ড্রেন বা মেধা পাচার রোধে অভূতপূর্ব ভূমিকা রাখবে।

রাজনীতি ডটকম: ডিজিটাল রূপান্তর ও ই-পাবলিশিং নিয়ে আপনাদের সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা কী? পাঠকদের জন্য যদি একটু বিস্তারিত বলতেন।

মেহেদী হাসান: ভবিষ্যৎ কিন্তু সম্পূর্ণ ডিজিটাল ও হাইব্রিড। আমরা লেকচার পাবলিকেশন্স ও অমিকন গ্রুপের পক্ষ থেকে এরই মধ্যে একটি সমন্বিত ডিজিটাল নলেজ ইকোসিস্টেম তৈরির কাজ শুরু করেছি। এর মধ্যে রয়েছে ইন্টার‌্যাক্টিভ ই-বুক, অডিও বুক, লার্নিং ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম ও এআই-চালিত পারসোনালাইজড এডুকেশন প্ল্যাটফর্ম। কিন্তু এই রূপান্তরের জন্য ব্যাপক আইটি অবকাঠামো ও প্রযুক্তিগত বিনিয়োগ প্রয়োজন। এনবিআরের কাছে আমাদের অনুরোধ— ডিজিটাল প্রকাশনা প্ল্যাটফর্মের সার্ভার খরচ, সফটওয়্যার ডেভেলপমেন্ট ও ক্লাউড ম্যানেজমেন্টের ওপর যেন বিশেষ কর রেয়াত দেওয়া হয়।

আমরা যদি এই সুবিধা পাই, তাহলে প্রত্যন্ত অঞ্চলের একজন শিক্ষার্থীর কাছেও মাত্র কয়েক টাকায় স্মার্টফোনের মাধ্যমে বিশ্বমানের শিক্ষা কনটেন্ট পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হবে। জ্ঞান তখন আর কোনো নির্দিষ্ট শ্রেণির একচেটিয়া অধিকার থাকবে না, এটি হবে সার্বজনীন ও গণতান্ত্রিক।

রাজনীতি ডটকম: আপনারা প্রকাশনা খাতের জন্য একটি ‘ডেডিকেটেড রপ্তানিমুখী রেজিস্ট্রেশন’ ও ডিউটি ড্রব্যাক সুবিধার কথা বলেছেন। বাংলাদেশ থেকে বই রপ্তানির বাজার কতটা বড় বলে আপনি মনে করেন?

মেহেদী হাসান: অনেকেই হয়তো জানেন না, আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলা ও ইংরেজি বইয়ের এক বিশাল ও অনাবিষ্কৃত বাজার রয়েছে। বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা প্রায় ৩০ কোটি বাংলাভাষী মানুষের পাশাপাশি আমাদের একাডেমিক ও কারিগরি বইগুলোর জন্য মধ্যপ্রাচ্য, আফ্রিকা ও দক্ষিণ এশিয়ায় ব্যাপক চাহিদা তৈরি করা সম্ভব। কিন্তু বর্তমানে বই রপ্তানির প্রক্রিয়াটি অত্যন্ত জটিল এবং কোনো ডিউটি ড্রব্যাক সুবিধা নেই।

আমাদের প্রস্তাব হলো— তৈরি পোশাক শিল্পের মতো প্রকাশনা খাতেও একটি বিশেষ ‘রপ্তানিমুখী রেজিস্ট্রেশন’ ক্যাটাগরি চালু করা হোক। এর মাধ্যমে প্রকাশকরা বন্ডেড ওয়ারহাউজ সুবিধার মতো শুল্কমুক্ত কাঁচামাল আমদানির সুযোগ পাবেন এবং রপ্তানি মূল্যের ওপর ট্যাক্স রিবেট পাবেন। কঠোর অডিটের মাধ্যমে এটি নিশ্চিত করা হবে, যেন এই কাঁচামাল খোলাবাজারে চলে না আসে। আমরা সরকারি এই সুবিধা পেলে আগামী তিন বছরের মধ্যে বাংলাদেশ থেকে প্রতি বছর অন্তত ৫০ মিলিয়ন ডলারের মেধাভিত্তিক বই ও ডিজিটাল লাইসেন্স রপ্তানি করা সম্ভব, যা আমাদের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে একটি সম্পূর্ণ নতুন ও মর্যাদাপূর্ণ উৎস যোগ করবে।

Mehedi Hasan Of Lecture Interview Photos 24-05-2026 (2)

রাজনীতি ডটকম: বইয়ের পাইরেসি বা অবৈধ নকল প্রকাশনা শিল্পের একটি ক্যানসার। এটি দমনে আপনারা ট্যাক্স পলিসিকে কীভাবে কাজে লাগানোর প্রস্তাব করছেন?

মেহেদী হাসান: পাইরেসি আসলেই এই শিল্পের পিঠ ভেঙে দিচ্ছে। বৈধ প্রকাশকরা যেখানে কর দিচ্ছেন, লেখকদের রয়্যালটি দিচ্ছেন, সেখানে পাইরেটরা কোনো ট্যাক্স না দিয়ে সস্তায় বই নকল করে বাজার সয়লাব করে দিচ্ছে। এতে সরকার প্রতি বছর শত শত কোটি টাকার রাজস্ব হারাচ্ছে। আমরা আইন প্রয়োগের পাশাপাশি ট্যাক্স ইনসেনটিভের মাধ্যমে এটি সমাধান করতে চাই।

আমাদের প্রস্তাব— যেসব প্রকাশক তাদের বইয়ের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে উন্নত প্রযুক্তির কিউআর কোড, হলোগ্রাম বা ডিজিটাল রাইটস ম্যানেজমেন্ট (ডিআরএম) সফটওয়্যার ব্যবহার করবেন, তাদের সেই প্রযুক্তির বিনিয়োগের ওপর অতিরিক্ত কর ছাড় বা রিবেট দেওয়া হোক। একই সঙ্গে সরকার একটি সুনির্দিষ্ট গাইডলাইনের মাধ্যমে অত্যাবশ্যকীয় পাঠ্যপুস্তকের প্রফিট মার্জিন মনিটর করতে পারে, যেন সাধারণ ক্রেতারা ন্যায্য মূল্যে আসল বই পান।

এ ছাড়া বৈধ ব্যবসায়ীদের অগ্রিম আয়কর (এআইটি) রিফান্ড প্রক্রিয়াটি সম্পূর্ণ ডিজিটাল ও সহজতর করা দরকার, যেন সৎ ব্যবসায়ীদের লিকুইডিটি বা নগদ টাকার সংকটে পড়তে না হয়। কমপ্লায়েন্সকে যদি আমরা পুরস্কৃত করতে পারি, তবে পাইরেসি এমনিতেই বিলুপ্ত হয়ে যাবে।

রাজনীতি ডটকম: অমিকন গ্রুপের মতো বৃহৎ ও বহুমুখী গ্রুপগুলোর জন্য আপনারা গ্রুপ-লেভেল কনসোলিডেটেড অ্যাসেসমেন্টের প্রস্তাব করেছেন। এটি কীভাবে সামগ্রিক অর্থনৈতিক উন্নয়নে সাহায্য করবে?

মেহেদী হাসান: আমাদের দেশে অনেক বড় গ্রুপ অব কোম্পানিজ রয়েছে, যারা মূল বাণিজ্যিক ব্যবসার পাশাপাশি দেশপ্রেম থেকে শিক্ষামূলক বা সামাজিক সেবামূলক প্রকাশনা সংস্থায় বড় বিনিয়োগ করছে।

আমাদের প্রস্তাব— যদি কোনো গ্রুপ সামগ্রিকভাবে তার বিভিন্ন অঙ্গপ্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে জাতীয় কর্মসংস্থান, স্থানীয় কনটেন্ট তৈরি ও রপ্তানির লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করে, তবে তাদের প্রকাশনা খাতের ট্যাক্স হলিডে বা ইনসেনটিভগুলো গ্রুপ পর্যায়ে সমন্বিতভাবে মূল্যায়ন করা উচিত। এটি বড় করপোরেটগুলোকে শিক্ষা ও সংস্কৃতি খাতে তাদের সিএসআর ফান্ডের বাইরে গিয়ে সরাসরি টেকসই বাণিজ্যিক বিনিয়োগ করতে উৎসাহিত করবে। এর ফলে সহযোগী শিল্প, যেমন— কাগজ শিল্প, লজিস্টিকস ও এডুকেশনাল সার্ভিস খাতও একসঙ্গে উন্নত হবে।

রাজনীতি ডটকম: সাক্ষাৎকারের শেষ পর্যায়ে জানতে চাই, এনবিআর ও সরকারের প্রতি আপনার চূড়ান্ত বার্তা বা প্রত্যাশা কী?

মেহেদী হাসান: আমি অত্যন্ত আশাবাদী মানুষ। প্রধানমন্ত্রী ঘোষিত ‘স্মার্ট বাংলাদেশ ২০৪১’ ভিশনের মূল চালিকাশক্তি জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতি, ডিজিটাল রূপান্তর ও মানবসম্পদের গুণগত উন্নয়ন। আজকের বিশ্বে যেখানে ডেটা সেন্টার, এআই-চালিত কনটেন্ট জেনারেশন, ও ডিজিটাল নলেজ ডিস্ট্রিবিউশন এক নতুন অর্থনৈতিক অবকাঠামো গড়ে তুলছে, সেখানে বাংলাদেশের প্রকাশনা শিল্পও নীতিগত সহায়তা ও কর কাঠামোগত প্রণোদনা পেলে দ্রুতই স্মার্ট বাংলাদেশের শক্তিশালী সহায়ক স্তম্ভে পরিণত হতে পারে। বিশেষ করে শিক্ষা, গবেষণা ও জ্ঞানভিত্তিক কনটেন্ট উৎপাদনে প্রকাশনা শিল্পকে উৎসাহিত করা হলে তা ভবিষ্যতের এআই-সহায়ক শিক্ষাব্যবস্থা ও ডিজিটাল লার্নিং ইকোসিস্টেমের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত হয়ে দেশের মানবসম্পদ উন্নয়নে বহুগুণ প্রভাব ফেলবে।

এ বাস্তবতায় আমরা অত্যন্ত বিনীতভাবে এনবিআরের চেয়ারম্যান ও সদস্যদের প্রতি আহ্বান জানাই, প্রকাশনা শিল্পকে কেবল স্বল্পমেয়াদি রাজস্ব আহরণের খাত হিসেবে না দেখে একটি কৌশলগত জ্ঞান-উৎপাদন ও মানবসম্পদ উন্নয়ন খাত হিসেবে পুনর্মূল্যায়ন করা হোক। কারণ একটি জাতির বই, গবেষণা, শিক্ষাসামগ্রী ও প্রকাশনা কার্যক্রমই তার মেধা অর্থনীতির ভিত্তি তৈরি করে।

তাই একটি টেকসই ও জ্ঞাননির্ভর অর্থনীতির স্বার্থে প্রকাশনা শিল্পকে নীতিগতভাবে সহায়তা প্রদান এবং কর কাঠামোতে সহনশীল দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করা হলে তা শুধু শিল্পটির বিকাশ নয়, বরং সমগ্র দেশের মেধাভিত্তিক অর্থনৈতিক রূপান্তরের জন্য একটি দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ হিসেবে বিবেচিত হবে।

রাজনীতি ডটকম: সময় দেওয়ার জন‍্য আপনাকে ধন‍্যবাদ।

মেহেদী হাসান: পাঠক ও রাজনীতি ডটকম সংশ্লিষ্টদেরও ধন‍্যবাদ।

ad
ad

মতামত থেকে আরও পড়ুন

পশ্চিমবঙ্গে তৃণমূলকে হটিয়ে বিজেপি— নির্বাচনি ফলাফলের কাটাছেঁড়া

তৃণমূল নেতা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ভোট ব্যাংক ছিল মূলত সংখ্যালঘু ও নারী ভোট। ফলাফলে দেখা গেছে, যে তৃণমূলের ৮০ জন জয়ী প্রার্থীর মধ্যে ৩২ জন মুসলিম, যা ঠিক ঠিক ৪০ শতাংশ। এ ছাড়া অন্যান্য দলের আরও ছয়টি আসনে মুসলিম প্রার্থী জয়ী হয়েছেন। তাহলে কংগ্রেস, সিপিএম ও বিশেষত নওসাদ সিদ্দিকির ইন্ডিয়ান সেকুলার ফ্রন্ট

৫ দিন আগে

মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে বেজে উঠেছে পুরোদস্তুর এক মহাযুদ্ধের দামামা

চলমান এই স্নায়ুযুদ্ধ যদি সত্যি সত্যি আগামী সপ্তাহে পূর্ণাঙ্গ সামরিক সংঘাতে রূপ নেয়, তবে তার মাশুল শুধু মধ্যপ্রাচ্যকে নয়, বরং পুরো বিশ্বকে দিতে হবে। হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ আর পারমাণবিক কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে শুরু হওয়া এই সংঘাত কূটনৈতিক টেবিলে সমাধান হবে, নাকি বিশ্বকে এক নতুন অর্থনৈতিক মন্দা ও তৃতীয়

৭ দিন আগে

বাংলাদেশ-ভারতের স্বার্থে ফারাক্কা ভেঙে দেওয়া প্রয়োজন

ফারাক্কা বাঁধ চালুর ৫২ বছর পর আজ স্বয়ং ভারতীয় রাজনীতিবিদরা যখন এটি ভেঙে দেওয়ার দাবি জানাচ্ছেন, তখন ফারাক্কা বাঁধ যে কতটা ক্ষতিকর প্রকল্প তা বুঝতে আর কারও বাকি থাকার কথা নয়। ভারতীয় রাজনীতিবিদদের এই দাবির প্রেক্ষিতে ফারাক্কা বাঁধের অপ্রয়োজনীয়তা সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়েছে।

৮ দিন আগে

ব্রহ্মপুত্র ও গঙ্গা ঘিরে দক্ষিণ এশিয়ায় জলসম্পদের ভূরাজনীতি

এই পুরো ব্যবস্থার সবচেয়ে সংবেদনশীল অংশ বাংলাদেশ। কারণ দেশের ৮০ শতাংশের বেশি নদীপ্রবাহ আন্তঃরাষ্ট্রীয় উৎস থেকে আসে। কৃষি উৎপাদন সম্পূর্ণভাবে মৌসুমি পানির ওপর নির্ভরশীল। নদীভাঙন ও লবণাক্ততা এরই মধ্যে বড় সংকটে পরিণত হয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে প্রবাহ আরও অনিশ্চিত হয়ে উঠছে।

৯ দিন আগে